স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিল আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীরা। সড়ক নির্মাণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, দুর্যোগ মোকাবিলা কিংবা জলবায়ু অভিযোজন—প্রায় সব ক্ষেত্রেই বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং অন্যান্য বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন দেশের অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার অন্যতম ভিত্তি ছিল এই বহুপক্ষীয় সহায়তা ব্যবস্থা। তবে বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতায় সেই কাঠামো এখন বড় ধরনের রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উন্নয়ন অর্থায়নের প্রচলিত ধারা, অর্থের উৎস এবং অগ্রাধিকার—সবকিছুতেই আসছে পরিবর্তন।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) বহুপক্ষীয় উন্নয়ন অর্থায়ন প্রতিবেদন ২০২৬ বলছে, এটি কেবল অর্থ সংকটের বিষয় নয়; বরং বৈশ্বিক উন্নয়ন অর্থায়নের কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশটি স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পথে রয়েছে। একই সময়ে উচ্চ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য আগামী দশকে প্রয়োজন হবে বিপুল বিনিয়োগ।
কেন বদলে যাচ্ছে উন্নয়ন অর্থায়নের চিত্র?
বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন সহযোগিতার কাঠামো পরিবর্তনের পেছনে কয়েকটি বড় কারণ কাজ করছে। করোনাভাইরাস মহামারির পর বিশ্বের অনেক উন্নত অর্থনীতি এখন উচ্চ সরকারি ঋণ, ধীর প্রবৃদ্ধি, বয়স্ক জনসংখ্যা এবং বাড়তে থাকা প্রতিরক্ষা ব্যয়ের চাপ সামলাচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে বৈদেশিক উন্নয়ন সহায়তায়। ওইসিডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সংস্থাগুলোতে দাতা দেশগুলোর অবদান ১৫ শতাংশের বেশি কমেছে। আগামী দিনেও এ প্রবণতা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে উন্নয়ন সহায়তা এখন অনেক দেশের কাছে আগের মতো অগ্রাধিকার পাচ্ছে না।
বিশ্ব রাজনীতিতেও এসেছে বড় পরিবর্তন। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্ন আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ধরন পাল্টে দিয়েছে। অনেক দেশ এখন বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানে অর্থ দেওয়ার পরিবর্তে নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী দ্বিপক্ষীয় সহায়তায় বেশি আগ্রহী হচ্ছে। এতে অর্থ ব্যবহারের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ে এবং রাজনৈতিকভাবে দৃশ্যমানতাও বৃদ্ধি পায়। তবে দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সক্ষমতা দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
একসময় উন্নয়ন অর্থায়নের প্রধান লক্ষ্য ছিল দারিদ্র্য কমানো এবং অবকাঠামো নির্মাণ। কিন্তু এখন উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, খাদ্য নিরাপত্তা, ডিজিটাল প্রযুক্তি, মহামারি প্রস্তুতি, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং মানবিক সংকট মোকাবিলার মতো বিষয়। সমস্যা হলো—চাহিদা বাড়লেও অর্থের পরিমাণ সেই হারে বাড়ছে না। ফলে সীমিত অর্থের জন্য প্রতিযোগিতা আগের তুলনায় অনেক বেশি তীব্র হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন উন্নয়ন ব্যাংক ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বাড়িয়েছে। তবে এর বড় অংশ এসেছে বিদ্যমান মূলধনের কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে। নতুন অনুদান বা দাতা দেশগুলোর অতিরিক্ত অর্থায়ন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি। বরং অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে।
এর ফলে বৈশ্বিক উন্নয়ন অর্থায়নের কাঠামো ধীরে ধীরে অনুদাননির্ভর ব্যবস্থা থেকে ঋণনির্ভর ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে। যেসব দেশ এখনো সহজ শর্তের ঋণ ও অনুদানের ওপর বেশি নির্ভরশীল, তাদের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় বৈদেশিক সহায়তার ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পর সহজ শর্তের ঋণ ও অনুদানের সুযোগ ধীরে ধীরে কমবে। অন্যদিকে উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা কমবে না, বরং বাড়বে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, বন্দর উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের মানোন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়ন এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজন হবে বড় বিনিয়োগ অর্থাৎ একদিকে সহজ অর্থায়নের সুযোগ কমবে, অন্যদিকে অর্থের চাহিদা বাড়বে—এটাই বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত নিজস্ব রাজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি। দেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনো অনেক দেশের তুলনায় কম। বৈদেশিক সহায়তা কমলে উন্নয়নের বড় দায়িত্ব নিতে হবে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব ব্যবস্থাকেই। এ জন্য করের আওতা বাড়ানো, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা চালু করা এবং কর ফাঁকি বন্ধ করার উদ্যোগ আরও জোরদার করতে হবে।
শুধু সরকারি অর্থ দিয়ে আগামী দিনের উন্নয়ন চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। তাই বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রয়োজন স্থিতিশীল নীতি, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং ব্যবসার খরচ কমানো। ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার অভিজ্ঞতা দেখায়, শুধু কর সুবিধা নয়; বরং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও নির্ভরযোগ্য পরিবেশই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মূল আকর্ষণ।
দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য শুধু ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। করপোরেট বন্ড, সবুজ বন্ড, অবকাঠামো বন্ড এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে বিকল্প অর্থায়নের পথ তৈরি করতে হবে। একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার সরকারি চাপ কমানোর পাশাপাশি বেসরকারি খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। অথচ আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে প্রাপ্ত অর্থ এখনো সম্ভাবনার তুলনায় সীমিত। আগামী দিনে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সবুজ অবকাঠামো ও জলবায়ু অভিযোজন প্রকল্পে আন্তর্জাতিক অর্থায়নের সুযোগ বাড়বে। তবে এ সুযোগ কাজে লাগাতে হলে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রকল্প তৈরি এবং দ্রুত বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
ভবিষ্যতের উন্নয়ন অর্থায়নে শুধু অর্থ পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ হবে না, সেই অর্থ কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে সেটিও বড় বিষয় হয়ে উঠবে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও উন্নয়ন সহযোগীরা এখন প্রকল্পের প্রয়োজনের পাশাপাশি দেখবে—প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি, সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার দক্ষতা, নীতির ধারাবাহিকতা এবং সুশাসনের মান অর্থাৎ উন্নয়ন অর্থায়নের প্রশ্নটি এখন অর্থনীতির পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে।
সামনে বাংলাদেশের জন্য নতুন পথের সন্ধান:
বৈশ্বিক উন্নয়ন অর্থায়নের পরিবর্তনকে শুধু সংকট হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি বাংলাদেশের জন্য নতুন অর্থায়ন কৌশল তৈরির সুযোগও তৈরি করেছে। আগামী দিনের উন্নয়ন কাঠামোয় দেশীয় রাজস্ব হবে মূল ভিত্তি, বেসরকারি বিনিয়োগ হবে প্রবৃদ্ধির প্রধান শক্তি এবং বহুপক্ষীয় সহযোগিতা হবে সহায়ক উৎস।
এ জন্য প্রয়োজন নীতি পরিবর্তন, রাজস্ব সংস্কার, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, আর্থিক খাতের সংস্কার এবং সুশাসন নিশ্চিত করা। সহায়তানির্ভর উন্নয়নের যুগ ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে। ভবিষ্যতের সফলতা নির্ভর করবে অর্থনৈতিক সক্ষমতা, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার দক্ষতার ওপর। বাংলাদেশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে আজকের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামী দশকের উন্নয়নের গতি ও স্থায়িত্ব।
- ড. ফাহমিদা খাতুন: অর্থনীতিবিদ ও নির্বাহী পরিচালক সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)

