বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি হলো দেশের ব্যাংকিং খাত। শিল্পায়ন, ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে ব্যাংকের ভূমিকা অপরিসীম। জনগণের সঞ্চিত অর্থ নিরাপদে সংরক্ষণ এবং উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়নের মাধ্যমে এই খাত দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে গতিশীল করে।
কিন্তু গত এক দশকে একের পর এক ঋণ কেলেঙ্কারি, আর্থিক জালিয়াতি এবং দুর্বল সুশাসনের কারণে ব্যাংকিং খাতের প্রতি জনআস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে অস্তিত্বহীন বা কাগজে-কলমে থাকা প্রতিষ্ঠানের নামে বড় অঙ্কের ঋণ অনুমোদনের ঘটনা সবচেয়ে উদ্বেগজনক আর্থিক অপরাধ গুলোর একটি।
এ ধরনের অনিয়ম শুধু কোনো একটি ব্যাংকের আর্থিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং এর প্রভাব পুরো আর্থিক খাত এবং জাতীয় অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। জনগণের আমানতের অর্থ ঝুঁকির মুখে পড়ে, খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, ব্যাংকের মূলধনের ওপর চাপ সৃষ্টি হয় এবং নতুন বিনিয়োগে অর্থায়নের সক্ষমতা কমে যায়। ফলে প্রকৃত উদ্যোক্তা ও উৎপাদনমুখী খাত প্রয়োজনীয় ঋণ থেকে বঞ্চিত হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে।
বাংলাদেশে অতীতে আলোচিত একাধিক ঋণ কেলেঙ্কারি প্রমাণ করেছে যে দুর্বল অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ, ব্যাংক পরিচালনায় সুশাসনের ঘাটতি এবং জবাবদিহির অভাব থাকলে সংঘবদ্ধ জালিয়াতি চক্র সহজেই ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে অপব্যবহার করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে কাগজে-কলমে প্রতিষ্ঠান তৈরি করে, ভুয়া আর্থিক তথ্য উপস্থাপন করে এবং প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই এড়িয়ে বিপুল অঙ্কের ঋণ গ্রহণ করা হয়েছে। পরে সেই অর্থ আত্মসাৎ, অন্য খাতে স্থানান্তর বা বিদেশে পাচারের অভিযোগ বিভিন্ন তদন্তে উঠে এসেছে। এসব ঘটনার ফলে শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যাংক নয়, পুরো আর্থিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংক ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি, করপোরেট সুশাসন জোরদার এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা শক্তিশালী করতে বিভিন্ন সংস্কারমূলক উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে। একই সঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আলোচিত ঋণ জালিয়াতির ঘটনাগুলোর তদন্ত ও আইনগত কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবুও খেলাপি ঋণের চাপ, তারল্য সংকট এবং ব্যাংকিং খাতে আস্থার ঘাটতি এখনো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল বিচ্ছিন্ন অভিযান বা আইনগত ব্যবস্থা নয়; বরং স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি এবং পেশাদার ব্যাংক ব্যবস্থাপনার সমন্বিত সংস্কারের মাধ্যমেই এ সমস্যা দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ অনুমোদনের বিষয়টি তাই কেবল একটি আর্থিক অনিয়মের উদাহরণ নয়; এটি দেশের ব্যাংকিং খাতের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোর কার্যকারিতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে।
অস্তিত্বহীন বা ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ জালিয়াতি সাধারণত একটি সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংঘটিত হয়। প্রথমে কাগজে-কলমে একটি কোম্পানি বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হয়, যার বাস্তবে কোনো উৎপাদন কার্যক্রম, অফিস, গুদাম কিংবা উল্লেখযোগ্য ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড থাকে না। এরপর ট্রেড লাইসেন্স, কর-সংক্রান্ত নথি, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, আর্থিক বিবরণী ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জাল বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করে প্রতিষ্ঠানটিকে একটি বৈধ ব্যবসায়িক সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠী একাধিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন নামে ঋণ গ্রহণের চেষ্টাও করে।
এই ধরনের জালিয়াতি অনেক সময় ব্যাংকের অসাধু কর্মকর্তা, মূল্যায়নকারী, মধ্যস্বত্বভোগী কিংবা প্রভাবশালী মহলের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতায় সংঘটিত হয়। আবেদনকারীর আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবসায়িক কার্যক্রম, নগদ প্রবাহ, ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য এবং জামানতের যথাযথ মূল্যায়ন ছাড়াই বড় অঙ্কের ঋণ অনুমোদনের ঘটনা ঘটে। কোথাও কোথাও বন্ধকি সম্পত্তির মূল্য বাস্তব মূল্যের তুলনায় অতিরঞ্জিত করা হয় অথবা এমন সম্পত্তিকে জামানত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যার মালিকানা বা অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন থাকে।
ঋণের অর্থ ছাড় হওয়ার পর অনেক ক্ষেত্রে তা ঘোষিত ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ব্যবহার না করে অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর, ব্যক্তিগত বিনিয়োগ, সম্পদ ক্রয় কিংবা আমদানি কার্যক্রমের আড়ালে অপব্যবহার করা হয়। ফলে ঋণের অর্থ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ না হয়ে আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে চলে যায় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়।
এর ফলে ব্যাংকগুলোকে সম্ভাব্য ক্ষতির বিপরীতে অতিরিক্ত প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়, যা তাদের মুনাফা, মূলধন সক্ষমতা এবং নতুন ঋণ বিতরণের ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একই সঙ্গে উৎপাদনমুখী শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং রপ্তানিমুখী খাত পর্যাপ্ত অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হয়। বারবার এ ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে আসায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্বল করপোরেট সুশাসন, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ঘাটতি, ঋণ অনুমোদনে স্বচ্ছতার অভাব এবং প্রভাবমুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিবেশের অভাবই এ ধরনের অনিয়মের প্রধান কারণ। তাই শুধু অপরাধ সংঘটনের পর ব্যবস্থা নেওয়া নয়, বরং শুরু থেকেই কার্যকর যাচাই-বাছাই, তথ্যনির্ভর ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
এ সমস্যা থেকে উত্তরণে ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত সংস্কার এবং কার্যকর সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। ঋণ অনুমোদনের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে হবে। আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত অস্তিত্ব, ব্যবসায়িক কার্যক্রম, আর্থিক সক্ষমতা, মালিকানা এবং জামানতের সত্যতা তৃতীয় পক্ষের ভেরিফিকেশন, প্রয়োজনে স্বতন্ত্র মূল্যায়নকারী ও নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের সহায়তা এবং সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে নিশ্চিত করা উচিত। পাশাপাশি ঋণ বিতরণের পর অর্থ নির্ধারিত উদ্দেশ্যে ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি ব্যবস্থাকে আরও তথ্যনির্ভর, ঝুঁকিভিত্তিক এবং প্রযুক্তিসমৃদ্ধ করতে হবে। বড় অঙ্কের ঋণ, একই ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে অর্থায়ন এবং অস্বাভাবিক লেনদেনের ক্ষেত্রে বিশেষ নজরদারি জরুরি। একই সঙ্গে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, নিরীক্ষা কমিটি এবং ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে স্বার্থের সংঘাত বা অযাচিত প্রভাব ঋণ অনুমোদনের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে না পারে।
জাতীয় পরিচয়পত্র, কোম্পানির নিবন্ধন, করসংক্রান্ত তথ্য এবং অন্যান্য সরকারি তথ্যভান্ডারের সমন্বিত ডিজিটাল যাচাই ব্যবস্থা, শক্তিশালী (KYC) প্রক্রিয়া এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ প্রযুক্তির ব্যবহার ভুয়া পরিচয়, জাল নথি ও সন্দেহজনক ঋণ আবেদন দ্রুত শনাক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে অনিয়মে জড়িত ব্যক্তি, ব্যাংক কর্মকর্তা বা অন্য কোনো সুবিধাভোগীর বিরুদ্ধে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ সংঘটনের প্রবণতা কমে।
দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জনগণের আস্থা রক্ষায় একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিকল্প নেই। অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ অনুমোদন শুধু একটি ব্যাংকের সমস্যা নয়; এটি সমগ্র আর্থিক খাতের সুশাসন, নিয়ন্ত্রক সক্ষমতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। কঠোর আইন প্রয়োগ, প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি, স্বাধীন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং নৈতিক ব্যাংকিং সংস্কৃতির সমন্বিত বাস্তবায়নের মাধ্যমেই এ ধরনের আর্থিক জালিয়াতি কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব। কারণ একটি শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক ব্যাংকিং ব্যবস্থা শুধু আর্থিক খাতকেই সুরক্ষিত করে না, বরং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করারও অন্যতম পূর্বশর্ত।

