দীর্ঘ তিন দশক ধরে সস্তা শ্রম, তৈরি পোশাক রপ্তানি, প্রবাসী আয় এবং শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ ভোগের ওপর ভর করে বাংলাদেশের অর্থনীতি ধারাবাহিকভাবে এগিয়েছে। এই মডেলের ফলেই দেশটি নিম্ন আয়ের অর্থনীতি থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে পৌঁছেছে। তবে বৈশ্বিক অর্থনীতির দ্রুত পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা এখন মনে করছেন, আগের সেই প্রবৃদ্ধির সূত্র আর ভবিষ্যতের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারবে না।
অর্থনীতিবিদ এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মতে, শুধু শ্রম ও মূলধননির্ভর প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করলে বাংলাদেশ উচ্চ-মধ্যম কিংবা উচ্চ আয়ের দেশের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে না। এ জন্য উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি গ্রহণ, উদ্ভাবন এবং দক্ষ বিনিয়োগকে কেন্দ্র করে নতুন অর্থনৈতিক কৌশল গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে।
গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। একই সময়ে মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় বেড়ে ৩ হাজার ২০ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে এবং দেশের অর্থনীতির আকার প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি হয়েছে। তবে এখন উন্নয়নের মূল্যায়ন শুধু জিডিপি বা মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে সীমাবদ্ধ নেই।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের ‘মধ্যম আয়ের ফাঁদ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যম আয়ের দেশগুলোর উন্নয়নের তিনটি প্রধান ভিত্তি হলো—বিনিয়োগ, প্রযুক্তি গ্রহণ ও বিস্তার এবং উদ্ভাবন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হলেও উচ্চ আয়ের পথে যেতে হলে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের সক্ষমতা বাড়ানো অপরিহার্য। অন্যথায় উৎপাদনশীলতা স্থবির হয়ে অর্থনীতি দীর্ঘদিন একই স্তরে আটকে যেতে পারে।
বর্তমানে বিশ্বের ১০৮টি মধ্যম আয়ের দেশে প্রায় ৬০০ কোটি মানুষের বসবাস, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭৩ শতাংশ। কিন্তু ১৯৯০-এর দশক থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র ৩৯টি দেশ উচ্চ আয়ের অর্থনীতিতে উন্নীত হতে পেরেছে। বাকি দেশগুলো দীর্ঘ সময় ধরে মধ্যম আয়ের স্তরেই আটকে রয়েছে।
বাংলাদেশও এখন একই চ্যালেঞ্জের মুখে। সরকারের লক্ষ্য, ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চ-মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হওয়া। বিশ্বব্যাংকের বর্তমান শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী, উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় ৪ হাজার ৬৩৬ ডলার এবং উচ্চ আয়ের দেশের পর্যায়ে যেতে ১৪ হাজার ৩৭৬ ডলারে পৌঁছাতে হবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানো নয়, বরং সেই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি পরিবর্তন করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
দেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সূচকগুলোও নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। একসময় ৭ শতাংশের বেশি থাকা জিডিপি প্রবৃদ্ধি বর্তমানে ৪ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপ, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং বিনিয়োগের ধীরগতি অর্থনীতিকে চাপে ফেলেছে।
বেসরকারি বিনিয়োগ কয়েক বছর ধরে জিডিপির প্রায় ২৪ শতাংশে স্থবির রয়েছে। সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ হিসাবে তা প্রায় ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। অন্যদিকে নিট বিদেশি বিনিয়োগ এখনো জিডিপির ১ শতাংশের নিচে। কর-জিডিপি অনুপাতও এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম।
বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) মনে করছে, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি আর্থিক খাতের সংস্কার, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি গ্রহণ এবং বেসরকারি বিনিয়োগ সম্প্রসারণ ছাড়া উচ্চ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হবে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরীর ভাষায়, উন্নয়নের ইতিহাসে সফল হয়েছে সেই দেশগুলো, যারা সময়মতো প্রবৃদ্ধির চরিত্র বদলাতে পেরেছে। তাঁর মতে, বাংলাদেশেরও এখন প্রচলিত শক্তির পাশাপাশি নতুন প্রবৃদ্ধির ভিত্তি গড়ে তোলার সময় এসেছে।
রপ্তানিতে বৈচিত্র্যের প্রয়োজন:
যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড গ্রোথ ল্যাবের ‘অ্যাটলাস অব ইকোনমিক কমপ্লেক্সিটি’ বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য শুধু রপ্তানির পরিমাণ বাড়ানো যথেষ্ট নয়; উচ্চমূল্য সংযোজনকারী ও প্রযুক্তিনির্ভর পণ্যের অংশও বাড়াতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই তৈরি পোশাক শিল্প থেকে আসে। তবে নতুন শিল্প এবং উচ্চমূল্য সংযোজনকারী পণ্য উৎপাদনে অগ্রগতি তুলনামূলক ধীর।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানো নয়, বরং প্রবৃদ্ধির নতুন উৎস তৈরি করা। প্রযুক্তি, উৎপাদনশীলতা, দক্ষ প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি বিনিয়োগ—এই চার ক্ষেত্রে দ্রুত অগ্রগতি ছাড়া উচ্চ আয়ের দেশে পৌঁছানো কঠিন হবে।
দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর এবং তাইওয়ানের মতো দেশগুলো শ্রমনির্ভর শিল্প থেকে প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনে রূপান্তরের মাধ্যমে উন্নয়নের নতুন ধাপে পৌঁছেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভিয়েতনামও উৎপাদনমুখী বিদেশি বিনিয়োগ, ইলেকট্রনিকস শিল্পের সম্প্রসারণ এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে উচ্চ-মধ্যম আয়ের অর্থনীতিতে উন্নীত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব অভিজ্ঞতা দেখায় যে কাঠামোগত সংস্কার এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সম্ভব নয়।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা এবং নীতির পূর্বানুমানযোগ্যতা নিশ্চিত না হলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়বে না, ফলে উৎপাদনশীলতারও কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হবে না।
সরকারের পরিকল্পনা ও বাস্তব চ্যালেঞ্জ:
২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার ব্যাংক খাতের সংস্কার, রাজস্ব প্রশাসনের আধুনিকায়ন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়নকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো খাতে ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে, যাতে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতার ভিত্তি শক্তিশালী হয়।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, স্বল্পমেয়াদে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদে কাঠামোগত সংস্কার—দুই দিকেই সরকার সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। তাঁর মতে, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা উন্নয়ন এবং বেসরকারি বিনিয়োগ সম্প্রসারণই আগামী দশকের অর্থনৈতিক কৌশলের মূল ভিত্তি হবে। তবে নীতিগত ঘোষণাগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি আগের তুলনায় কমেছে। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং অর্থায়নের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নতুন বিনিয়োগও ধীর হয়ে পড়েছে।
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমানের মতে, বিনিয়োগকারীদের জন্য নীতির ধারাবাহিকতা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, দ্রুত সরকারি সেবা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা গেলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে। এর মাধ্যমে প্রযুক্তি স্থানান্তর ও উৎপাদনশীলতাও বৃদ্ধি পাবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের সামনে সুযোগ এখনো ফুরিয়ে যায়নি। বড় অভ্যন্তরীণ বাজার, তরুণ জনগোষ্ঠী, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান, শক্তিশালী শিল্পভিত্তি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা দেশের বড় সম্পদ।
তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সময়োপযোগী নীতি, কার্যকর প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়ন এবং ধারাবাহিক সংস্কারের বিকল্প নেই। অন্যথায় মধ্যম আয়ের ফাঁদ এড়িয়ে উচ্চ আয়ের অর্থনীতিতে পৌঁছানোর পথ আরও দীর্ঘ ও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

