বাংলাদেশে স্বর্ণের দাম গত দুই বছরে নজিরবিহীন ওঠানামার মধ্য দিয়ে গেছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) বলছে, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরেই প্রথমবারের মতো ২২ ক্যারেট স্বর্ণের প্রতি ভরির দাম এক লাখ টাকা অতিক্রম করে। এরপর দাম বাড়তে বাড়তে চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রতি ভরির মূল্য দাঁড়ায় দুই লাখ ৮৬ হাজার টাকায়, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
এই রেকর্ড দামের পর বাজারে শুরু হয় ধারাবাহিক সমন্বয়। বাজুসের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারির পর থেকে এখন পর্যন্ত মোট ৯১ বার স্বর্ণের দাম পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৪ বার দাম বেড়েছে, ৪৬ বার কমেছে এবং একবার ভ্যাট সমন্বয় করা হয়েছে।
বিশ্ববাজারের পরিস্থিতিও স্বর্ণের দামে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও ইরানকে ঘিরে সংঘাত শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম নিম্নমুখী হতে থাকে। ২৮ জানুয়ারি প্রতি ট্রয় আউন্স (৩১ দশমিক ১ গ্রাম) স্বর্ণের দাম সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার ৩০৩ ডলারে উঠেছিল। পরে তা কমে গত শুক্রবার চার হাজার ২৩৫ ডলারে নেমে আসে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতিকে চাপে ফেলেছে। যুদ্ধের কারণে তেল ও গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় জ্বালানির দাম বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিতে। এই পরিস্থিতি স্বর্ণবাজারেও অস্থিরতা তৈরি করেছে।
অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুনের ভাষ্য, যুদ্ধের সময় বিশ্ব অর্থনীতি চাপের মুখে পড়ে এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় অর্থনীতিতে এর প্রভাব বেশি অনুভূত হয়। তাঁর মতে, বর্তমানে স্বর্ণের দামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার।
তিনি বলেন, সুদের হার বাড়লে বিনিয়োগকারীরা সাধারণত বন্ড ও মার্কিন ডলারের দিকে ঝুঁকে পড়েন। কারণ এসব খাতে সুদের সুবিধা পাওয়া যায়, কিন্তু স্বর্ণ থেকে কোনো সুদ আসে না। ফলে সুদের হার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বর্ণের চাহিদা কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়।
বাংলাদেশে স্বর্ণের দাম ভরি হিসেবে নির্ধারণ করা হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের ওজন পরিমাপ করা হয় ট্রয় আউন্স ও গ্রামে। দেশে ভরি, আনা ও রতি এখনও প্রচলিত পরিমাপের একক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
দেশে স্বর্ণের অলংকার শুধু সৌন্দর্যবর্ধনের উপকরণ নয়, অনেক পরিবারের কাছে এটি দীর্ঘমেয়াদি সম্পদও। সহজে সংরক্ষণ ও প্রয়োজনে নগদ অর্থে রূপান্তরের সুযোগ থাকায় অনেকেই স্বর্ণকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করেন।
গাজীপুরের বাসিন্দা জান্নাতুল মাওয়া জানান, তাঁর মায়ের বিয়ের সময়ের একটি সোয়া তিন ভরির গলার হার তিনি নিজের বিয়েতে পেয়েছেন। কিছুদিন আগে অলংকারটির বর্তমান বাজারমূল্য জানতে চাইলে স্বর্ণের বিশুদ্ধতার কারণে ভালো দাম প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে তিনি সেটি বিক্রি করেননি। এই অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, নিয়মিত সুদের সুবিধা না থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে স্বর্ণের মূল্যবৃদ্ধি অনেকের কাছে এটিকে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বাজুসের স্ট্যান্ডিং কমিটি অন প্রাইসিং অ্যান্ড প্রাইস মনিটরিংয়ের চেয়ারম্যান দেওয়ান আমিনুল ইসলামও একই মত প্রকাশ করেন। তিনি নিজের পরিবারের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, তাঁর মায়ের বিয়ের সময় ১৯৬৩ সালে প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ছিল মাত্র ৮০ টাকা। আর বর্তমানে তাঁর মেয়ের বিয়ের সময়ে সেই দাম দুই লাখ টাকারও বেশি।
তাঁর মতে, স্বর্ণ শুধু পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ নয়, দীর্ঘমেয়াদে মূল্য সংরক্ষণেরও একটি কার্যকর মাধ্যম। তবে যারা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে স্বর্ণে বিনিয়োগ করতে চান, তাদের আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বাজারের মূল্যপ্রবণতা ভালোভাবে বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

