অতিরিক্ত বৃষ্টিতে এবার পাটের ফলন কমেছে। এর ওপর কাঁচা পাট রপ্তানিতে বিধিনিষেধ থাকায় বাজারে চাহিদাও কমে গেছে। ফলে একদিকে উৎপাদন খরচ বেড়েছে, অন্যদিকে পাটের দাম নেমে যাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়েছেন কৃষকেরা।
গত বছর পাটের ভালো দাম পাওয়ায় এবার অনেক কৃষক বেশি জমিতে পাট চাষ করেছিলেন। কিন্তু অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে অনেক এলাকায় নির্ধারিত সময়ের ১৫ থেকে ২০ দিন আগেই পাট কাটতে হয়েছে। এতে বিঘাপ্রতি ফলন কমেছে ২ থেকে ৪ মণ পর্যন্ত।
কৃষকেরা বলছেন, ভালো মানের কাঁচা পাট এখন সর্বোচ্চ ৪ হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। অথচ গত বছর একই মানের পাট বিক্রি হয়েছিল প্রায় ৪ হাজার ৫০০ টাকা মণ দরে। গত দেড় মাসে কোথাও কোথাও পাটের দাম ৫ হাজার ২০০ টাকা থেকে কমে ৩ হাজার ৫০০ টাকা মণ পর্যন্ত নেমেছিল। পরে কিছুটা বেড়ে বর্তমানে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
ফরিদপুরের পাটচাষি সুকণ্ঠ পাল জানান, গত বছরের তুলনায় এবার বিঘাপ্রতি উৎপাদন খরচ বেড়েছে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা। বর্তমান দামে পাট বিক্রি করে উৎপাদন খরচই উঠছে না।
রাজবাড়ীর কৃষক মো. সিয়াম মল্লিক বলেন, অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে আগেভাগে পাট কাটতে হওয়ায় বিঘাপ্রতি ফলন ২ থেকে ৪ মণ কমেছে।
মাগুরার কৃষক নব কুমার কুণ্ডুর মতে, গত বছর পাট চাষ করে বিঘাপ্রতি ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হয়েছিল। এবার লাভ করতে হলে পাটের দাম কমপক্ষে ৪ হাজার ৫০০ টাকা মণ থাকতে হবে।
শুধু কৃষক নন, কম দামের কারণে পাট ব্যবসায়ীরাও চাপে রয়েছেন। পাবনার এক ব্যবসায়ী জানান, বাজার থেকে এক মণ পাট কিনে পাটকলে পৌঁছানো পর্যন্ত তাদের খরচ পড়ে ৪ হাজার ২০০ টাকার বেশি। কিন্তু মিল মালিকেরা এর চেয়েও কম দামে পাট কিনতে চাইছেন।
ফরিদপুরের এক ব্যবসায়ী জানান, বাজারে পাটের দাম অত্যন্ত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। দেড় মাসের মধ্যে দাম ৫ হাজার ২০০ টাকা থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা মণ পর্যন্ত নেমে যাওয়ার পর বর্তমানে কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৬০ লাখ বেল পাটের চাহিদা রয়েছে। চলতি বছর উৎপাদন ৮০ লাখ বেলের বেশি হতে পারে। অতিরিক্ত পাট সাধারণত রপ্তানি করা হয়। কিন্তু কাঁচা পাট রপ্তানিতে বিধিনিষেধ থাকায় সেই অতিরিক্ত পাটের বড় অংশ স্থানীয় বাজারে থেকে যাচ্ছে।
ফলে সরবরাহ বাড়লেও চাহিদা না বাড়ায় পাটের দাম কমেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের ফরিদপুর কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. রিশাদ আবদুল্লাহ জানান, অতিরিক্ত পানির কারণে পাটের একটি প্রচলিত জাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক কৃষক পূর্ণ পরিপক্ব হওয়ার আগেই পাট কাটতে বাধ্য হয়েছেন। এতে পাটের মান ও দাম—দুটিই কমেছে।
ফরিদপুরের পাট বিভাগের সহকারী পরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, গত বছর ভালো দাম পাওয়ায় এবার পাটের আবাদ বেড়েছে এবং উৎপাদনও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধ থাকায় বাজারে চাহিদা কমেছে। রপ্তানি আবার শুরু হলে পাটের দাম ৫ হাজার থেকে ৫ হাজার ৫০০ টাকা মণ পর্যন্ত উঠতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
কৃষকদের উৎপাদন খরচ বাড়ছে, ফলন কমছে এবং বাজারে দামও কমে যাচ্ছে—এ অবস্থায় ন্যায্য দাম না পেলে ভবিষ্যতে কৃষকেরা পাট চাষে আগ্রহ হারাতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

