মামলা, হয়রানি, কারখানায় হামলা, দখল, অগ্নিসংযোগ ও শ্রমিক অসন্তোষ—সব মিলিয়ে দেশের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ। নতুন বিনিয়োগের চিন্তার চেয়ে বর্তমানে নিজেদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে অনেকের জন্য।
ব্যবসায়ী নেতা, উদ্যোক্তা ও অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র উঠে এসেছে। তাঁদের মতে, দীর্ঘদিনের অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার কারণে উৎপাদনমুখী শিল্পের গতি কমছে। এতে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে একের পর এক মামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও দখলের ঘটনা ঘটে। এর প্রভাবে ব্যবসায়ীদের একটি অংশ দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। তাঁদের অনেকেই এখনো দেশে ফেরেননি।
ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়েছে। কোথাও উৎপাদন কমেছে, কোথাও কর্মীদের ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে নতুন করে কিছু উদ্যোক্তাও দেশ ছাড়ার কথা ভাবছেন, যা অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, অস্থিরতার প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে বেসরকারি খাত ঘুরে দাঁড়ানোর যে প্রত্যাশা ছিল, তা এখন অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
আস্থার সংকট কাটছে না:
বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের মধ্যে মামলা ও হয়রানির আশঙ্কা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির আশ্বাস দেওয়া হলেও অনেক ব্যবসায়ী এখনো পুরোপুরি নিরাপদ বোধ করছেন না।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগের জন্য শুধু অর্থ থাকলেই হয় না, প্রয়োজন স্থিতিশীল পরিবেশ ও আস্থার ভিত্তি। ব্যবসার নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে উদ্যোক্তারা বড় ধরনের ঝুঁকি নিতে আগ্রহী হবেন না।
ব্যবসায়ী সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া বেসরকারি খাতের উন্নতি সম্ভব নয়। তিনি বলেন, বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজন অনুকূল পরিবেশ। শুধু অর্থ থাকলেই বিনিয়োগ হয় না। আর্থিক খাতের বর্তমান দুর্বলতার পাশাপাশি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাও ব্যবসার ওপর বড় প্রভাব ফেলছে।
তাঁর মতে, একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার না আসা পর্যন্ত বেসরকারি খাতে পূর্ণ আস্থা ফিরে আসা কঠিন।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএস) গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবির বলেন, ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মামলা ও হয়রানির কারণে অনেকে বিনিয়োগ থেকে পিছিয়ে যাচ্ছেন। কেউ কেউ দেশ ছাড়ছেন। তিনি জানান, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর তথ্য অনুযায়ী, শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর বাইরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনাও ঘটেছে। সরকারের উদ্যোগ থাকলেও ব্যবসায়ীদের মধ্যে পুরোপুরি আস্থা ফিরছে না।
কম বিনিয়োগে কমতে পারে প্রবৃদ্ধির গতি:
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি আশরাফ আহমেদ বলেন, একটি নির্দিষ্ট সময়ে বিনিয়োগ কমে গেলে তার প্রভাব পরবর্তী কয়েক বছর অর্থনীতিতে থাকে। তিনি বলেন, ২০২৫ সালে বিনিয়োগ কম হলে ভবিষ্যতে প্রবৃদ্ধির গতিও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও দারিদ্র্য কমাতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি বাড়ানো জরুরি।
তাঁর মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাংলাদেশের মতো অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান ধরে রাখতে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই। স্থিতিশীলতা না থাকলে প্রয়োজনীয় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে।
শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতার ক্ষত:
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে গাজীপুর, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের মতো শিল্প এলাকায় তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন কারখানা শ্রমিক অসন্তোষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মুখে পড়ে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ের সহিংসতায় চার শতাধিক পোশাক কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়।
একজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দীর্ঘ ব্যবসায়িক জীবনে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হননি তিনি। কারখানার নিরাপত্তা নিয়ে দিনের পর দিন উদ্বেগের মধ্যে থাকতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত হামলা ও ভাঙচুরের কারণে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে, এসব ঘটনা শুধু আর্থিক ক্ষতিই করেনি, মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যেও তৈরি করেছে অনিশ্চয়তা ও ভয়ের পরিবেশ।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে কিছু ব্যবসায়ী দেশ ছেড়েছেন। আবার অনেকে হয়রানিমূলক মামলার মুখোমুখি হচ্ছেন।
তিনি বলেন, সদস্যদের যাতে অযথা হয়রানি করা না হয়, সে বিষয়ে বিজিএমইএ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, কারখানার নিরাপত্তা, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার ও জ্বালানি সংকট সমাধানের বিষয়েও সরকারকে অবহিত করা হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এসব সমস্যা দ্রুত সমাধান না হলে অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের অবদান কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়বে না।

