একই সংখ্যক শ্রমিক, একই পরিমাণ মূলধন এবং একই যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেও এক দেশের উৎপাদন অন্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে। এর পেছনের সবচেয়ে বড় কারণ উৎপাদনশীলতা। অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে একটি দেশের সাফল্য শুধু বিনিয়োগ বা শ্রমশক্তির ওপর নির্ভর করে না; বরং বিদ্যমান সম্পদ ব্যবহার করে কত বেশি মূল্য সংযোজন করা যাচ্ছে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের অর্থনীতিও এখন সেই বাস্তবতার মুখোমুখি।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) কম্পেনডিয়াম অব প্রোডাক্টিভিটি ইন্ডিকেটরস ২০২৫-এ বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি উৎপাদনশীলতা। একই ধরনের পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে এশিয়ান প্রোডাক্টিভিটি অর্গানাইজেশনের (এপিও) প্রোডাক্টিভিটি ডেটাবুক ২০২৫-এ। সেখানে বলা হয়েছে, এশিয়ার দেশগুলোর টেকসই প্রবৃদ্ধিতে শ্রমের গুণগত মান এবং একই সম্পদ থেকে বেশি মূল্য সৃষ্টির সক্ষমতা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হানের বিভিন্ন গবেষণা ও বিশ্লেষণেও একই বিষয় উঠে এসেছে। তাঁর মতে, উৎপাদনশীলতা কেবল শ্রমিকের দক্ষতার ওপর নির্ভর করে না। উন্নত শিক্ষা, প্রযুক্তির ব্যবহার, উদ্ভাবন এবং কার্যকর প্রতিষ্ঠান—সবকিছুর সমন্বয়েই একটি দেশের উৎপাদনশীলতার ভিত্তি গড়ে ওঠে।
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতাও এই প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করেছে। বিনিয়োগের গতি কমে যাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রবৃদ্ধির মন্থরতার মধ্যে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—বিদ্যমান সম্পদ ব্যবহার করেই কীভাবে আরও বেশি উৎপাদন নিশ্চিত করা সম্ভব।
এখন উৎপাদনশীলতার প্রতিযোগিতা শুধু কারখানা বা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি জ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবননির্ভর বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে। উন্নত দেশগুলো গবেষণা, উচ্চপ্রযুক্তি শিল্প এবং উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে দক্ষ পেশাজীবীদের আকৃষ্ট করছে। ফলে দক্ষ মানবসম্পদ এখন অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
এই প্রবণতার প্রভাব বাংলাদেশেও স্পষ্ট। বিজ্ঞানী, গবেষক, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, সফটওয়্যার প্রকৌশলী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশেষজ্ঞ, ডেটা বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, স্থপতি ও উদ্ভাবকদের একটি অংশ উন্নত দেশগুলোর কর্মবাজারে যুক্ত হচ্ছেন। ফলে মানবসম্পদ তৈরিতে দেশের যে বিনিয়োগ হচ্ছে, তার একটি অংশ বিদেশের অর্থনীতিতে কাজে লাগছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে স্নাতক শেষ করে ২০২১ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য কানাডায় যান গবেষণা প্রকৌশলী সিয়াম আহমেদ। বর্তমানে তিনি টরন্টোভিত্তিক একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠানে গবেষণা প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত। তাঁর ভাষ্য, দেশে ফিরে কাজ করার ইচ্ছা থাকলেও গবেষণার পর্যাপ্ত অর্থায়ন, আধুনিক গবেষণাগার এবং দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা–ক্যারিয়ারের সুযোগের সীমাবদ্ধতা তাঁকে নিরুৎসাহিত করেছে। তিনি বলেন, বিষয়টি শুধু বেতনের নয়; একজন গবেষক হিসেবে নিজের দক্ষতা ও ধারণা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশই সবচেয়ে বড় বিবেচ্য।
জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক বিভাগ (ইউএন ডেসা)-এর ইন্টারন্যাশনাল মাইগ্র্যান্ট স্টক ২০২৪ অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া মানুষের সংখ্যা ৮৭ লাখের বেশি। অন্যদিকে সরকারের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট দলিলে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমানে প্রায় এক কোটি বাংলাদেশি কর্মী ও প্রবাসী বিদেশে অবস্থান করছেন।
ওইসিডির তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও ইতালিতে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া অভিবাসীর সংখ্যা ২০২০ সালের ৭ লাখ ৩৭ হাজার থেকে ২০২৪ সালে বেড়ে ৯ লাখ ১৫ হাজারে পৌঁছেছে। এটি শুধু অভিবাসন বৃদ্ধির চিত্র নয়; বরং বিশ্ববাজারে উচ্চদক্ষ জনবলের চাহিদা বৃদ্ধিরও ইঙ্গিত বহন করে।
বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)-এর তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে বিদেশে যাওয়া ১১ লাখ ৩০ হাজার কর্মীর মধ্যে ২ লাখ ৩৭ হাজার ছিলেন দক্ষ কর্মী এবং প্রায় ৪৫ হাজার ছিলেন বিভিন্ন পেশার বিশেষজ্ঞ।
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও বিদেশমুখী প্রবণতা বাড়ছে। ইউনেস্কো ইনস্টিটিউট ফর স্ট্যাটিসটিকসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৫২ হাজার ৭৯৯। বিদেশে উচ্চশিক্ষায় ভর্তি–পরামর্শদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন ফ্যাড-ক্যাবের সভাপতি মো. জুলফিকার আলী জুয়েল জানান, প্রতিবছর প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার শিক্ষার্থী বিদেশে পড়তে যান এবং তাঁদের অন্তত ৬০ শতাংশ আর দেশে ফিরে আসেন না। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষ মানুষের বিদেশে যাওয়া সব সময় নেতিবাচক নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিদেশে অর্জিত জ্ঞান, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং পেশাগত অভিজ্ঞতা কতটা দেশের শিল্প, গবেষণা ও উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা যাচ্ছে।
রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. তাসনিম সিদ্দিকীর মতে, দক্ষ মানুষের বৈশ্বিক চলাচল এখন স্বাভাবিক বাস্তবতা। তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব এমন পরিবেশ তৈরি করা, যাতে বিদেশে অর্জিত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা দেশের উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করা যায়।
এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, চীন ও ভারতের অভিজ্ঞতা উল্লেখযোগ্য। এসব দেশ শুধু দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করেনি; বিদেশে থাকা গবেষক, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও উদ্যোক্তাদের জ্ঞান, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ককেও দেশের শিল্প ও উদ্ভাবনের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ফলে মেধা দেশের বাইরে গেলেও তার সুফল দেশের অর্থনীতিতে ফিরে এসেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, উৎপাদনশীলতা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের মুনাফা বাড়ানোর বিষয় নয়। একই শ্রম ও মূলধন ব্যবহার করে বেশি মূল্য সংযোজন করা গেলে শিল্পের প্রতিযোগিতা বাড়ে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ভিত্তি আরও শক্তিশালী হয়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ও কর বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, উচ্চ উৎপাদনশীল অর্থনীতি মানে শুধু বেশি উৎপাদন নয়; বরং একই সম্পদ থেকে বেশি আয় সৃষ্টি। এর ইতিবাচক প্রভাব কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং রাষ্ট্রের রাজস্ব—সব ক্ষেত্রেই প্রতিফলিত হয়।
সরকারও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিকে অর্থনৈতিক রূপান্তরের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, দক্ষ মানবসম্পদই দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাই প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প, গবেষণা ও উদ্ভাবনের সুযোগ সম্প্রসারণ, আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা উন্নয়ন এবং মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি সরকারের অগ্রাধিকার, যাতে দক্ষ পেশাজীবীরা দেশেই নিজেদের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারেন।
সব মিলিয়ে অর্থনীতির আগামী দিনের সাফল্য শুধু প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে বিচার করা হবে না। একই শ্রম, একই মূলধন ও একই সম্পদ ব্যবহার করে কে কত বেশি মূল্য সৃষ্টি করতে পারছে, আগামী দশকের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

