বিশ্বকাপ ফুটবল এখন শুধু মাঠের লড়াই নয়, এটি পরিণত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম বড় ক্রীড়া বাণিজ্য প্ল্যাটফর্মে। কোটি কোটি দর্শকের আগ্রহকে ঘিরে টিকিট বিক্রি, সম্প্রচার স্বত্ব, বিজ্ঞাপন, পণ্য বিক্রি ও আতিথেয়তা খাতে তৈরি হয়েছে বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। এবারের ফিফা বিশ্বকাপ থেকে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার আয় ১৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান।
বিশ্বকাপে সরাসরি অংশ না নিলেও বাংলাদেশেও এর অর্থনৈতিক প্রভাব ছিল দৃশ্যমান। জার্সি, পতাকা, টেলিভিশন, খাবার, রেস্তোরাঁ ব্যবসা থেকে শুরু করে বিভিন্ন খাতে বেড়েছে বেচাকেনা। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের দাবি, বিশ্বকাপ ঘিরে দেশে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হয়েছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিশ্বকাপ এখন বৈশ্বিক বাণিজ্যের বড় একটি ক্ষেত্র। ফুটবলপ্রেমীরা বিভিন্ন পণ্য ও সেবার মাধ্যমে এই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ হয়ে ওঠেন। তিনি বলেন, পোশাক, খাবার, টিকিট, ক্রীড়াসামগ্রীসহ নানা খাতে বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে ব্যবসা বাড়ে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। টুর্নামেন্ট শেষ হলেও জার্সি, পোস্টারসহ বিভিন্ন পণ্যের বিক্রি আরও কিছুদিন চলবে।
বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে জার্সি ও পতাকা বিক্রির চিত্র ছিল চোখে পড়ার মতো। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাহিদা ছিল এই দুই দলের জার্সির। বিক্রি হওয়া মোট জার্সির প্রায় ৬০ শতাংশই ছিল ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার বলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। পাশাপাশি ফ্রান্স ও জার্মানির জার্সিরও চাহিদা ছিল।
দেশীয় কারখানায় তৈরি জার্সি এখন চীনা পণ্যের বিকল্প হিসেবে বাজারে জায়গা করে নিচ্ছে। দেশের পোশাক কারখানাগুলো শুধু স্থানীয় বাজারের জন্য নয়, আন্তর্জাতিক বাজারের জন্যও সমর্থক ও খেলোয়াড়দের জার্সি তৈরি করছে। তৈরি পোশাক খাতের সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এবারের বিশ্বকাপে বাংলাদেশে বিভিন্ন দলের জার্সি ৩০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়েছে। নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে জার্সির চাহিদা বেড়েছে। এটি দেশের রপ্তানি আয়েও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখতে বড় পর্দার চাহিদাও বাড়িয়েছে ইলেকট্রনিক্স বাজার। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর দাবি, এবারের বিশ্বকাপ মৌসুমে শুধু টেলিভিশন বিক্রির বাজার প্রায় ১ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বড় পর্দার টেলিভিশনের পাশাপাশি প্রজেক্টর, সাউন্ড সিস্টেমসহ বিভিন্ন সরঞ্জামের বিক্রিও বেড়েছে। বিশেষ করে রাতের ম্যাচগুলোকে ঘিরে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরের রেস্তোরাঁ ও ক্যাফেতে দর্শকদের ভিড় ছিল বেশি। গভীর রাতের ম্যাচকে কেন্দ্র করে অনলাইন খাবার সরবরাহ প্রতিষ্ঠান, ফাস্টফুড ব্যবসা ও ছোট খাবারের দোকানগুলোতেও বিক্রি বেড়েছে।
ফিফা ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বকাপ শুধু একটি ক্রীড়া আয়োজন নয়, এটি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। বড় ব্র্যান্ডগুলো বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করে বিজ্ঞাপন ও পৃষ্ঠপোষকতায়।
অ্যাডিডাস, কোকা-কোলা ও ভিসার মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বকাপকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের ব্র্যান্ডের প্রচার, বাজার সম্প্রসারণ এবং ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির সুযোগ গ্রহণ করে।” আয়োজক দেশগুলোও পর্যটন, হোটেল, পরিবহন ও স্থানীয় ব্যবসা খাতে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা পায়। কাতার বিশ্বকাপের আগে অবকাঠামো খাতে বিপুল বিনিয়োগ করেছিল, যা দেশটির অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে।
ফিফার আয় ছাড়িয়েছে লক্ষ্যমাত্রা:
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবারের বিশ্বকাপ থেকে ফিফার আয় হয়েছে ১৫ বিলিয়ন ডলার। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে ফিফা ১১ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। চূড়ান্ত আয় সেই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার বেশি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো সদস্য দেশগুলোর ফুটবল সংস্থাগুলোকে এ বিষয়ে অবহিত করেছেন। তবে ফিফা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে আয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করেনি।
ফিফার অতিরিক্ত আয়ের বড় অংশ এসেছে আতিথেয়তা প্যাকেজ এবং টিকিট বিক্রি থেকে। বিশেষ করে দ্বিতীয় বাজারে টিকিট বিক্রির মাধ্যমে বড় অঙ্কের রাজস্ব পেয়েছে সংস্থাটি। ফিফার নীতিমালা অনুযায়ী, দ্বিতীয় বাজারে টিকিট পুনর্বিক্রির ক্ষেত্রে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের কাছ থেকেই ১৫ শতাংশ করে কমিশন নেওয়া হয়। ফলে উচ্চমূল্যের টিকিট লেনদেন থেকেও উল্লেখযোগ্য আয় করেছে ফিফা।
বিশ্বকাপ থেকে বাড়তি আয়ের ফলে ফিফার সদস্য দেশগুলোর উন্নয়ন তহবিলে বরাদ্দ বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে অর্থ বণ্টনের কাঠামো এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এই আর্থিক সাফল্য ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় অনুষ্ঠিত এবারের বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে কয়েকটি বিতর্ক তৈরি হলেও সদস্য দেশগুলোর সমর্থন ধরে রাখতে পেরেছে ফিফা নেতৃত্ব।
বিশ্বকাপ আয়োজনের পর যুক্তরাষ্ট্রে আরও বড় ফুটবল আসর আয়োজনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দেশটি ২০২৯ সালের ক্লাব বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে ফিফার সঙ্গে আলোচনা করছে। পাশাপাশি ২০৩৮ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনের আগ্রহও দেখিয়েছে। শুক্রবার এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও দেশটিতে এককভাবে বিশ্বকাপ আয়োজনের আগ্রহ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। পর্যবেক্ষকদের মতে, বিশ্বকাপ থেকে অর্জিত বাড়তি রাজস্ব সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সঠিকভাবে বণ্টন করা হলে ফিফা নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন আরও বাড়তে পারে।
বিশ্বকাপ ফাইনাল ঘিরেও টিকিটের উচ্চমূল্য আলোচনায় এসেছে। নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত স্পেন ও আর্জেন্টিনার ফাইনালের জন্য ফিফার টিকিটিং প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন ভিআইপি ও আতিথেয়তা প্যাকেজ বিক্রির জন্য রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে ‘ট্রফি লাউঞ্জ’ প্যাকেজের মূল্য ছিল জনপ্রতি ৩৪ হাজার ৫০০ ডলার। বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক সাফল্যের অন্যতম উদাহরণ হিসেবে এই উচ্চমূল্যের প্যাকেজকে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ এখন শুধু ফুটবলের মহাযজ্ঞ নয়, এটি বৈশ্বিক অর্থনীতিরও বড় একটি চালিকাশক্তি। মাঠের ৯০ মিনিটের উত্তেজনার বাইরে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের নানা প্রান্তের ব্যবসা ও মানুষের জীবনে।

