বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে গিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা জটিলতার মুখে পড়ছেন উদ্যোক্তারা। সমস্যা শুধু বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থার অভাব নয়, বরং একাধিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা, কর বিভাগ, শুল্ক কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন সেবা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের জটিলতাই বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতি বদলাতে যাচ্ছে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’। দেশের একমাত্র বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থা হিসেবে নতুন এই প্রতিষ্ঠান গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি সংস্থা একীভূত করলেই বিনিয়োগের সব বাধা দূর হবে না। সফলতার জন্য প্রয়োজন আরও বিস্তৃত প্রশাসনিক ও নীতিগত সংস্কার।
গত বুধবার জাতীয় সংসদে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ বিল, ২০২৬’ পাস হয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব কর্তৃপক্ষ (পিপিপিএ)-কে একীভূত করে নতুন সংস্থা গঠনের পথ তৈরি হয়েছে। সরকারি গেজেটে নির্ধারিত তারিখ থেকে আইনটি কার্যকর হবে।
এর আগে ২০১৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিনিয়োগ বোর্ড (বিওআই) ও বেসরকারিকরণ কমিশন একীভূত করে গঠন করা হয়েছিল বিডা। লক্ষ্য ছিল দেশে বিনিয়োগ বাড়ানো ও প্রক্রিয়া সহজ করা। তবে এরপরও কাঙ্ক্ষিত গতি পায়নি বেসরকারিকরণ কার্যক্রম, পাশাপাশি বিনিয়োগ পরিবেশের অনেক সমস্যা রয়ে যায়।
নতুন ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’-এর মূল লক্ষ্য হলো বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি কার্যকর ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু করা। একীভূত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, অনুমোদনের নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং একক জানালা ব্যবস্থার মাধ্যমে বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই উদ্যোগ সফল হলে জমি বরাদ্দ, অনুমোদন, লাইসেন্স, প্রণোদনা ও প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিনিয়োগকারীদের একাধিক প্রতিষ্ঠানের দ্বারে ঘুরতে হবে না। এক ছাতার নিচে বিনিয়োগ উন্নয়ন ও শিল্পাঞ্চল ব্যবস্থাপনা আনা হলে বিডা ও বেজার মধ্যে থাকা সমন্বয় ঘাটতিও কমতে পারে।
তবে বড় প্রশ্ন হলো—এই একীভূতকরণ কি সত্যিই বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশে বড় পরিবর্তন আনতে পারবে? বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও এর প্রভাব নির্ভর করবে নতুন সংস্থার কার্যকর ক্ষমতা, ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়ের ওপর।
সাবেক বিডা নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, শুধু একীভূত করাই যথেষ্ট নয়। বিনিয়োগকারীদের সমস্যা সমাধানে নতুন সংস্থার কতটা ক্ষমতা থাকবে এবং সেটি কীভাবে পরিচালিত হবে, সেটিই মূল বিষয়। কারণ বিনিয়োগকারীদের বড় সমস্যাগুলোর অনেকগুলোই বিডা, বেজা বা পিপিপিএর বাইরে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), কাস্টমস, পরিবেশ অধিদপ্তর, বিদ্যুৎ-গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, ভূমি প্রশাসনসহ বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রমের ওপরও বিনিয়োগের গতি নির্ভর করে।
অনুমোদন পেতে দেরি, কর ব্যবস্থার জটিলতা, শুল্ক ছাড়ে বিলম্ব, পরিবেশগত ছাড়পত্র পাওয়া এবং ইউটিলিটি সংযোগের মতো বিষয়গুলো সমাধান করতে না পারলে নতুন সংস্থার কার্যকারিতা সীমিত হয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বৈদেশিক মুদ্রার ওঠানামা, নীতির পরিবর্তন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতি এবং নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের অভাবও বিনিয়োগের পথে বড় বাধা হয়ে আছে।
বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগকারী ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এনবিআর ও কাস্টমস ব্যবস্থাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে। জটিল কর আইন, নিয়মের ভিন্ন ব্যাখ্যা, ঘন ঘন নিরীক্ষা, দীর্ঘ কর বিরোধ এবং ধীরগতির পণ্য খালাস ব্যবসার খরচ বাড়াচ্ছে। রপ্তানিকারকরাও একই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। কাঁচামাল আমদানির পর দ্রুত খালাস না হওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং বাড়ছে ব্যয়। এ ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা শুধু বিনিয়োগ সংস্থা পুনর্গঠনের মাধ্যমে দূর করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিনিয়োগ সংস্থাগুলোকে একীভূত করলে সেবার দক্ষতা বাড়তে পারে। তবে এটি পুরো সরকারি ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিকল্প নয়। তার মতে, বিনিয়োগের জন্য শুধু একটি ভালো বিনিয়োগ সংস্থাই যথেষ্ট নয়। কার্যকর কাস্টমস ব্যবস্থা, স্বচ্ছ করনীতি, দ্রুত কোম্পানি নিবন্ধন, উন্নত লজিস্টিকস, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং স্থিতিশীল নীতিমালা—সবকিছুই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, বিনিয়োগ সংক্রান্ত সেবা এখনো ৫০টির বেশি সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। তিনটি সংস্থা একীভূত করলে প্রক্রিয়ার একটি অংশ সহজ হবে, কিন্তু বিনিয়োগকারীদের অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের কাছ থেকেও সেবা নিতে হবে।
তার মতে, শুধু প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের চেয়ে অপ্রয়োজনীয় লাইসেন্স, নিবন্ধন ও অনুমোদনের সংখ্যা কমানো বেশি কার্যকর হতে পারে। তবে সরকারের উদ্যোগের যৌক্তিকতাও রয়েছে। একটি একক সংস্থা থাকলে বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের পরিচিতি আরও পরিষ্কার হবে, দায়িত্বের বিভাজন কমবে এবং জবাবদিহিতা বাড়তে পারে। ডিজিটাল ওয়ান-স্টপ সার্ভিস এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুমোদন নিশ্চিত করা গেলে বিনিয়োগ প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও পূর্বানুমানযোগ্য হতে পারে।
বিডা ও বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান এবং পিপিপিএর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আশিক চৌধুরী এই একীভূতকরণকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা একটি কার্যকর একক সেবা কাঠামোর দাবি জানিয়ে আসছেন।
তার ভাষ্য, বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ আনতে প্রকৃত ওয়ান-স্টপ সার্ভিস ব্যবস্থা দরকার। স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (আঙ্কটাড) বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ সংস্কারের পর্যালোচনায় এই একীভূতকরণের সুপারিশ করেছিল।
তবে শেষ পর্যন্ত ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’-এর সফলতা নির্ভর করবে শুধু নতুন সংস্থা কতটা শক্তিশালী হলো তার ওপর নয়, বরং পুরো সরকারি ব্যবস্থার দক্ষতা ও সংস্কারের ওপর। বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রবেশপথ সহজ হতে পারে, কিন্তু তারা বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদে থাকবেন কি না, তা নির্ধারণ করবে দেশের সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিবেশ।

