মুক্তবাজার অর্থনীতিতে আমদানি শুল্কের ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমছে। ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জাতীয় রাজস্বে ভ্যাটের অবদান ২৫ শতাংশেরও বেশি হলেও দীর্ঘদিনের নানা উদ্যোগ, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং তদারকির দুর্বলতার কারণে এই খাত থেকে প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায় সম্ভব হচ্ছে না।
ভ্যাট ব্যবস্থাকে আধুনিক ও স্বচ্ছ করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রথমে ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্টার (ইসিআর) এবং পরে ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) চালুর উদ্যোগ নেয়। এ দুই প্রকল্পে কয়েকশ কোটি টাকা ব্যয় হলেও বাস্তবে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রযুক্তির অপব্যবহার, দক্ষ জনবলের অভাব, দুর্বল তদারকি এবং কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর অনিয়মের কারণে শপিংমল, চেইনশপ ও রেস্তোরাঁ খাত থেকে ভ্যাট আদায়ে বড় ধরনের বাধা তৈরি হয়েছে।
মাঠপর্যায়ের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। খুচরা ও পাইকারি খাতের প্রায় ৭৫ লাখ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে বছরে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা ভ্যাট আদায়ের সম্ভাবনা থাকলেও এনবিআরের হিসাবে আদায় হচ্ছে মাত্র প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ সম্ভাব্য রাজস্বের প্রায় ৩ শতাংশই সরকারি কোষাগারে পৌঁছাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ইএফডি যন্ত্র ইচ্ছাকৃতভাবে বন্ধ রাখা হয়। আবার কোথাও সরকারি রসিদের পরিবর্তে সমান্তরাল বা অননুমোদিত বিল দেওয়া হয়। কার্যকর নজরদারির অভাবে ভোক্তারা ভ্যাট পরিশোধ করলেও তার বড় একটি অংশ সরকারি কোষাগারে জমা পড়ে না। এতে একদিকে সাধারণ ক্রেতারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে প্রতি বছর রাজস্ব ঘাটতি বাড়ছে।
এনবিআর সূত্রে জানা যায়, ভ্যাট অটোমেশন কার্যক্রমে ইসিআর ও ইএফডি প্রকল্পে সাড়ে ৩৫০ কোটির বেশি টাকা ব্যয় হয়েছে। তবে যন্ত্রের ব্যবহার নিশ্চিত করা, কারিগরি সমস্যা সমাধান এবং নিয়মিত তদারকির ঘাটতির কারণে প্রকল্পটি প্রত্যাশিত গতি পায়নি। চুক্তি অনুযায়ী পাঁচ বছরে তিন লাখ ইএফডি মেশিন স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল কিন্তু দুই বছরে স্থাপন করা গেছে মাত্র ১৫ হাজারটি, যা নির্ধারিত লক্ষ্যের তুলনায় খুবই কম।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইএফডি প্রযুক্তি সফলভাবে ভ্যাট আদায়ে ব্যবহৃত হলেও বাংলাদেশে সেই সাফল্য আসেনি। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এর পেছনে রয়েছে যন্ত্রের মানগত ত্রুটি, মাঠপর্যায়ে তদারকির দুর্বলতা, ব্যবসায়ী ও ক্রেতা—উভয় পক্ষের অনীহা এবং করদাতা, কাস্টমস ও ভ্যাট-সংক্রান্ত তথ্য সমন্বয়ের জন্য কার্যকর একটি একীভূত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অভাব।
রাজধানীর বায়তুল মোকাররম, বসুন্ধরা সিটি, মৌচাক ও বেইলি রোড এলাকার বিভিন্ন শপিংমলে সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক প্রতিষ্ঠানে ইএফডি যন্ত্র স্থাপন করা হলেও তা নিয়মিত ব্যবহার করা হচ্ছে না। কোথাও যন্ত্র অকার্যকর অবস্থায় পড়ে আছে, আবার কোথাও বিক্রির হিসাব এখনো প্রচলিত পদ্ধতিতেই সংরক্ষণ করা হচ্ছে। ফলে ভ্যাট অটোমেশনের মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই রয়ে গেছে।
ইসিআর থেকে ইএফডি: দেড় দশকের উদ্যোগেও ভ্যাট অটোমেশন এখনো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছায়নি
ভোক্তা পর্যায়ে ভ্যাট আদায়কে স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে গত দেড় দশক ধরে একের পর এক উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে পরিকল্পনা, প্রযুক্তি ও বাস্তবায়নের নানা সীমাবদ্ধতায় এসব উদ্যোগ এখনো প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি।
২০০৭-০৮ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্টার (ইসিআর) বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নেয় এনবিআর। লক্ষ্য ছিল বিক্রয় তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করে ভ্যাট আদায়কে আরও কার্যকর করা। কিন্তু এনবিআরের কেন্দ্রীয় সার্ভারের সঙ্গে সংযোগের অভাব, মাঠপর্যায়ে দুর্বল তদারকি, অনিয়মের অভিযোগ এবং ব্যবসায়ীদের সীমিত আগ্রহের কারণে এই উদ্যোগ সফল হয়নি। ফলে ভ্যাট ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়ানোর পরিবর্তে ফাঁকি রোধেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আসেনি।
ইএফডি চালু হলেও গতি পায়নি বাস্তবায়ন:
ইসিআরের সীমাবদ্ধতার পর ২০১৮ সালে এনবিআর ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) ও সেলস ডাটা কন্ট্রোলার (এসডিসি) চালুর উদ্যোগ নেয়। শুরুতে প্রতিটি যন্ত্র ২০ হাজার ৫৩৩ টাকা দিয়ে ব্যবসায়ীদের কিনতে বলা হলে ব্যাপক আপত্তি ওঠে। পরে বিনামূল্যে কিংবা সহজ কিস্তিতে সরবরাহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও চার বছরে স্থাপন করা সম্ভব হয় মাত্র ১০ হাজারটি মেশিন।
পরবর্তীতে প্রকল্পের গতি বাড়াতে ২০২২ সালের নভেম্বরে তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান জেনেক্স ইনফোসিস লিমিটেডের সঙ্গে ১০ বছরের একটি চুক্তি করে এনবিআর। চুক্তি অনুযায়ী, ঢাকা ও চট্টগ্রামের ২৫ ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নিজস্ব অর্থায়নে তিন লাখ ইএফডি মেশিন স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পায় প্রতিষ্ঠানটি। এর মাধ্যমে বছরে গড়ে ২১২ কোটি টাকা গ্রস রাজস্ব অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি।
ভ্যাট ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও কাগজবিহীন করার লক্ষ্য নিয়ে গত দেড় দশকে বিভিন্ন অটোমেশন প্রকল্প হাতে নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩৪৭ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
এর মধ্যে প্রথম ধাপে চীনের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এসজেডজেডটি (SZZT) থেকে ১০ হাজারটি ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) ও সেলস ডাটা কন্ট্রোলার (এসডিসি) মেশিন আমদানি করা হয়। এসব যন্ত্র সংগ্রহে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩১৭ কোটি টাকা। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, যন্ত্রের কারিগরি সীমাবদ্ধতা, মানগত ত্রুটি এবং মাঠপর্যায়ে কার্যকর বাস্তবায়নের অভাবে এসব মেশিনের বড় অংশ প্রত্যাশিতভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি।
খুচরা ও পাইকারি খাতের প্রায় ৭৫ লাখ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে বছরে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা ভ্যাট আদায়ের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে আদায় হচ্ছে মাত্র প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে ইএফডি ব্যবহার না করা, অননুমোদিত বা ভুয়া রসিদ প্রদান এবং দুর্বল তদারকির কারণে ভোক্তারা ভ্যাট পরিশোধ করলেও তার বড় অংশ সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে না। ফলে সম্ভাব্য রাজস্বের বড় অংশ আদায়ের বাইরে থেকে যাচ্ছে।
জেনেক্স ইনফোসিসের সঙ্গে হওয়া চুক্তি অনুযায়ী, পাঁচ বছরে ঢাকা ও চট্টগ্রামে তিন লাখ ইএফডি মেশিন সরবরাহ, স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। এ প্রকল্পে প্রতিষ্ঠানটিকে সরাসরি সরকারি অর্থ দেওয়া হবে না। পরিবর্তে সংগৃহীত ভ্যাটের ওপর ০ দশমিক ৫৩ শতাংশ কমিশন পাওয়ার কথা। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং উভয় পক্ষের বিরোধের কারণে কোম্পানিটির ব্যয় করা প্রায় ৯৪ কোটি টাকার পাওনা নিয়ে এনবিআর ও জেনেক্স ইনফোসিসের মধ্যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) প্রকল্পের মাধ্যমে পাঁচ বছরে তিন লাখ মেশিন স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। সে হিসাবে প্রতি বছর ৬০ হাজার মেশিন বসানোর কথা থাকলেও বাস্তব চিত্র সেই লক্ষ্য থেকে অনেক দূরে। চুক্তি অনুযায়ী প্রথম বছরেই ৩০ হাজার মেশিন স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু দুই বছর পেরিয়ে গেলেও জেনেক্স ইনফোসিস স্থাপন করতে পেরেছে মাত্র ১১ হাজার ৩১৩টি ইএফডি ডিভাইস। বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এই সংখ্যা ১৫ হাজার ৯৯৫টির কাছাকাছি হলেও নির্ধারিত লক্ষ্যের তুলনায় তা এখনও খুবই কম।
অন্যদিকে, ২০২০ সালে ইএফডি কার্যক্রম উদ্বোধনের পর এনবিআর ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মোট প্রায় ২৫ হাজার ৭৪১টি ইএফডি ও এসডিসি মেশিন বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে স্থাপন করা হয়েছে। তবে কারিগরি ত্রুটি, রক্ষণাবেক্ষণের দুর্বলতা এবং ব্যবসায়ীদের অনাগ্রহের কারণে এসব যন্ত্রের বড় একটি অংশ নিয়মিত ব্যবহার হচ্ছে না। ফলে ভ্যাট অটোমেশনের পুরো কার্যক্রম প্রত্যাশিত গতি হারিয়েছে।
নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর হওয়ার পর ভোক্তাদের ইএফডি রসিদ সংগ্রহে উৎসাহিত করতে ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ইএফডি লটারির উদ্যোগ নেয় এনবিআর। ওই বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি প্রথম ড্র অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা পুরস্কারসহ মোট ১০১ জন বিজয়ীর জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা ছিল। ইএফডি রসিদকেই লটারির কুপন হিসেবে গণ্য করা হতো এবং প্রতি মাসে নিয়মিত ড্র আয়োজন করা হয়।
তবে প্রায় ২৪টি লটারির ড্র অনুষ্ঠিত হলেও এই উদ্যোগ ক্রেতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সাড়া তৈরি করতে পারেনি। পরবর্তীতে কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ায় লটারি কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, ভ্যাট চালানে ক্রেতার পূর্ণাঙ্গ পরিচয় ও যোগাযোগের তথ্য না থাকা, অনেক ক্রেতার ইএফডি রসিদ সংগ্রহে অনাগ্রহ, সঠিক চালান নম্বর নিবন্ধিত না হওয়া এবং পুরস্কারের অর্থ গ্রহণের জটিল প্রক্রিয়ার কারণে এই উদ্যোগ কার্যকর হয়নি।
অন্য দেশ সফল, বাংলাদেশে রয়ে গেছে চ্যালেঞ্জ:
বিশেষজ্ঞদের মতে, রুয়ান্ডা, পর্তুগাল ও উগান্ডার মতো দেশ ই-ইনভয়েসিং, রিয়েল-টাইম তথ্য পর্যবেক্ষণ এবং কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে ভ্যাট আদায়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব, দুর্বল বাস্তবায়ন এবং সীমিত তদারকির কারণে ইএফডি প্রকল্প প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি। তাদের মতে, শুধু প্রযুক্তি স্থাপন করলেই কর ফাঁকি রোধ সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি সুশাসন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) নজরদারি, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং ভোক্তাদের জন্য বাস্তবসম্মত প্রণোদনা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রযুক্তির ফাঁক গলে ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ:
মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, যেসব প্রতিষ্ঠানে ইএফডি মেশিন রয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলোই নিয়মিত চালু রাখা হয় না। রাজধানীর গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, বেইলি রোড ও উত্তরার বিভিন্ন রেস্তোরাঁ ও সুপারশপে এমন চিত্র দেখা গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে ‘সার্ভার ডাউন’, ‘ইন্টারনেট সংযোগ নেই’, ‘মেশিন বিকল’ কিংবা ‘বিদ্যুৎ সমস্যা’র মতো কারণ দেখিয়ে ইএফডি ব্যবহার এড়িয়ে যাওয়া হয়। একই সঙ্গে অনেক ক্রেতাও ভ্যাটের ডিজিটাল রসিদ সংগ্রহে আগ্রহ দেখান না।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ইএফডি ও এসডিসি মেশিন সরাসরি এনবিআরের কেন্দ্রীয় সার্ভারের সঙ্গে সংযুক্ত থাকায় প্রতিটি বিক্রয়ের তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে নিবন্ধিত হয়। এই ডিজিটাল নজরদারি এড়াতে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ইচ্ছাকৃতভাবে মেশিনের বিদ্যুৎ বা নেটওয়ার্ক সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ডিজিটাল রসিদের বদলে সাধারণ বিল:
রাজধানীর শান্তিনগর, খিলগাঁও ও বেইলি রোড এলাকার কয়েকটি রেস্তোরাঁয় সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে হাতে লেখা বা সাধারণ কম্পিউটারে প্রিন্ট করা বিলের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধ নেওয়া হচ্ছে। এসব বিলে ইএফডি রসিদের মতো ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের সুযোগ থাকে না। আবার অনেক ক্রেতাও বিল সংগ্রহ করেন না। ফলে ভোক্তার কাছ থেকে ভ্যাট আদায় হলেও তা সবসময় সরকারি ব্যবস্থায় নথিভুক্ত হচ্ছে না।

বেইলি রোডের এক ব্যবসায়ী কামাল উদ্দিন বলেন, অনেক দোকানে ইএফডি মেশিন থাকলেও নিয়মিত ব্যবহার করা হয় না। তার ভাষ্য, অনেক ক্রেতা রসিদ নিতে চান না, আবার কিছু ব্যবসায়ীও বিভিন্ন কারণে যন্ত্রটি ব্যবহার করতে অনাগ্রহী। ফলে এখনও অনেক প্রতিষ্ঠানে ইএফডির ব্যবহার নিয়মিত হয়নি।
বিদেশে সফল, বাংলাদেশে কেন পিছিয়ে ইএফডি প্রকল্প?
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রত্যাশিত ফল মেলেনি। অথচ বিশ্বের কয়েকটি দেশ একই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভ্যাট আদায়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু প্রযুক্তি স্থাপন নয়, কার্যকর তদারকি, সুশাসন এবং সমন্বিত কর ব্যবস্থাই এসব সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) মনে করে, বাংলাদেশে ঝুঁকিভিত্তিক অডিটের সীমাবদ্ধতা, সমন্বিত করদাতা তথ্যভাণ্ডারের অভাব এবং কর প্রশাসনের ডিজিটাল সংযোগ দুর্বল থাকায় ভ্যাট অটোমেশনের পূর্ণ সুফল পাওয়া যায়নি।
বার্সেলোনা স্কুল অব ইকোনমিক্সের ২০২৪ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, কেবল ইএফডি স্থাপন করলেই কর আদায় বাড়ে না। এটি তখনই কার্যকর হয়, যখন পুরো কর ব্যবস্থার কমপ্লায়েন্স ও মনিটরিং কাঠামোর সঙ্গে প্রযুক্তিকে যুক্ত করা যায়। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, রুয়ান্ডা, পর্তুগাল, কেনিয়া ও তানজানিয়ার মতো দেশগুলো শুধু ইএফডি ব্যবহারের ওপর নির্ভর করেনি। তারা প্রযুক্তির পাশাপাশি ঝুঁকিভিত্তিক অডিট, শক্তিশালী তদারকি, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং ভোক্তাদের জন্য আর্থিক প্রণোদনার মতো পদক্ষেপও গ্রহণ করেছে।
রুয়ান্ডার সাফল্যের গল্প:
২০১৩-১৪ অর্থবছর থেকে রুয়ান্ডা বাধ্যতামূলকভাবে ইলেকট্রনিক বিলিং মেশিন (ইবিএম) চালু করে। বর্তমানে দেশটি আফ্রিকার প্রযুক্তিনির্ভর কর সংস্কারের অন্যতম সফল উদাহরণ হিসেবে পরিচিত।
তথ্য অনুযায়ী, এক দশকে দেশটির ভ্যাট রাজস্ব ২৫৯ বিলিয়ন রুয়ান্ডান ফ্রাংক থেকে বেড়ে ৭৯২ বিলিয়ন ফ্রাংকে পৌঁছেছে, যা ২০০ শতাংশেরও বেশি প্রবৃদ্ধি। ই-ইনভয়েসিং, রিয়েল-টাইম তথ্য আদান-প্রদান, ঝুঁকিভিত্তিক অডিট এবং কঠোর নজরদারির সমন্বিত ব্যবস্থার ফলেই এই অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে।
পর্তুগালে করদাতাদের জন্য প্রণোদনা:
পর্তুগালও ই-ফাতুরা প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কর ফাঁকি নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। সেখানে ক্রেতারা কেনাকাটার সময় কর শনাক্তকরণ নম্বর ব্যবহার করে বিল সংগ্রহ করলে বার্ষিক আয়করে ছাড় পান। এ ছাড়া প্রতিটি বৈধ রসিদের বিপরীতে ‘লাকি লটারি’র ব্যবস্থাও রয়েছে। কর ছাড় ও পুরস্কারের এই দ্বৈত প্রণোদনা ব্যবসায়ী ও ভোক্তা—উভয়কেই বৈধ রসিদ ব্যবহারে উৎসাহিত করেছে।
কেনিয়া ও তানজানিয়ার অভিজ্ঞতা:
কেনিয়া ২০০৫ সালে এবং তানজানিয়া ২০১০ সালে ইএফডি প্রযুক্তি চালু করলেও শুরুতে তারা নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। তবে পরবর্তীতে কঠোর আইন প্রয়োগ, ডেটা অ্যানালিটিক্সের ব্যবহার এবং প্রযুক্তিকে সামগ্রিক কর ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করার মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে সক্ষম হয়।
উগান্ডার প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি:
উগান্ডাকেও বর্তমানে প্রযুক্তিনির্ভর কর প্রশাসনের সফল উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশটি ভ্যাট আদায়ে প্রায় ১৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এই সাফল্যের পেছনে শুধু ইএফডি স্থাপন নয়, বরং রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং, ই-ইনভয়েসিং এবং কঠোর আইনি প্রয়োগকে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
কর বিশেষজ্ঞ ও চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট স্নেহাশীষ বড়ুয়ার মতে, খুচরা পর্যায়ে তুলনামূলক বেশি ভ্যাটের হার অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীর জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করে। ফলে তারা ইএফডি ব্যবহারের পরিবর্তে নগদ লেনদেনে বেশি আগ্রহী হন। তিনি আরও বলেন, ইএফডি চালুর সময় আধুনিক প্রযুক্তি, ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) নজরদারি ব্যবস্থার যথাযথ সমন্বয় করা হয়নি। ফলে প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন সম্ভব হয়নি।
কেন কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পেল না ইএফডি প্রকল্প?
দীর্ঘদিন ধরে ভ্যাট আদায়ে ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর চেষ্টা হলেও বাংলাদেশে ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি। অর্থনীতিবিদ, কর বিশেষজ্ঞ এবং এনবিআরের কর্মকর্তাদের মতে, শুধু প্রযুক্তি নয়; দুর্বল বাস্তবায়ন, সুশাসনের ঘাটতি এবং সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবই এই ব্যর্থতার মূল কারণ।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, উন্নত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা না নেওয়া এবং সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব প্রকল্পটিকে পিছিয়ে দিয়েছে। তার মতে, যেসব দেশে এ ধরনের প্রযুক্তি সফল হয়েছে, তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সমন্বিত তথ্যব্যবস্থা (ইন্টার-অপারেবিলিটি) এবং শক্তিশালী নজরদারি একসঙ্গে নিশ্চিত করেছে।
তিনি বলেন, অটোমেশন প্রকল্প সফল করতে শুধু প্রযুক্তি স্থাপন করলেই হবে না। এর সঙ্গে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং কার্যকর প্রশাসনিক কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। পুরো কর ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় না আনলে ই-ইনভয়েসিং বা নতুন প্রযুক্তিও কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
এনবিআর কর্মকর্তার দৃষ্টিতে ব্যর্থতার কারণ:
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের ভ্যাট বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পটি শুরু থেকেই যন্ত্রনির্ভর (ডিভাইস-ডিপেন্ডেন্ট) ছিল। কিন্তু বিকল্প ব্যবস্থা, সহজ সেবা এবং টেকসই অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়নি।
তার ভাষ্য, অনেক প্রতিষ্ঠানে ইএফডি বা ই-ইনভয়েস সুবিধা না থাকায় ব্যবসায়ীরা আবার কাগজের ভাউচারেই ফিরে যান। তিনি মনে করেন, ই-ইনভয়েসিংয়ের সঙ্গে এআইভিত্তিক ক্যামেরা ও স্বয়ংক্রিয় তথ্য বিশ্লেষণ যুক্ত করা গেলে বিক্রয় তথ্য যাচাই সহজ হতো এবং মানবিক ভুল ও অনিয়ম অনেকটাই কমানো সম্ভব হতো।
তিনি আরও জানান, তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগও প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। অপারেটরদের কমিশন কম, দক্ষ জনবলের অভাব এবং সীমিত পারিশ্রমিক প্রকল্পের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করেছে। পাশাপাশি ভ্যাট মডিউল ও ডেটা কাঠামোর মধ্যে সমন্বয় না থাকাও একটি বড় সমস্যা বলে তিনি উল্লেখ করেন।
‘প্যারালাল বিলিং’—ভ্যাট ফাঁকির নতুন কৌশল:
ভ্যাট ফাঁকির অন্যতম আলোচিত কৌশল এখন ‘প্যারালাল বিলিং’। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিজেদের পয়েন্ট অব সেলস (পিওএস) সফটওয়্যার এমনভাবে তৈরি করেছে, যা দেখতে এনবিআরের ইএফডি রসিদের মতো হলেও প্রকৃতপক্ষে তা সরকারি ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত নয়।
এসব রসিদে পণ্যের বিবরণ, ভ্যাটের হার ও মোট মূল্য উল্লেখ থাকলেও এনবিআরের ইউনিক আইডি বা রিয়েল-টাইম কিউআর কোড থাকে না। ফলে ক্রেতা ভ্যাট পরিশোধ করলেও সেই অর্থ সরকারি সার্ভারে নিবন্ধিত হয় না।
এনবিআরের ভ্যাট নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে ১২৬টি প্রতিষ্ঠানের নথি পর্যালোচনা করে প্রায় ১ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকির তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তে প্যারালাল বিলিংসহ বিভিন্ন অনিয়মের প্রমাণও মিলেছে।
তদারকির দুর্বলতায় বাড়ছে রাজস্ব ঘাটতি:
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৭৫ লাখ ব্যবসায়ী রয়েছেন। গড়ে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মাসে ২০ হাজার টাকা ভ্যাট আদায় করা গেলে বছরে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহ সম্ভব কিন্তু এনবিআরের তথ্য বলছে, বর্তমানে মাঠপর্যায়ে আদায় হচ্ছে মাত্র প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা অর্থাৎ সম্ভাব্য রাজস্বের মাত্র ৩ শতাংশ সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে, আর বাকি বিশাল অংশ আদায়ের বাইরে থেকে যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভোক্তারা নিয়ম অনুযায়ী ভ্যাট পরিশোধ করলেও দুর্বল তদারকি, অনিয়ম এবং ভুয়া রসিদের কারণে সেই অর্থের বড় অংশ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে পৌঁছায় না।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, ইএফডি প্রকল্পে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ হলেও বাস্তবে এর কার্যকারিতা খুবই সীমিত। তিনি মনে করেন, প্রযুক্তিনির্ভর প্রকল্প বাস্তবায়নে অংশীজনদের মতামত যথাযথভাবে নেওয়া হয়নি। তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও তরুণ প্রযুক্তিবিদদের সম্পৃক্ত করে ইন্টার্নশিপভিত্তিক জনবল গড়ে তুললে প্রকল্পের বাস্তবায়ন আরও কার্যকর হতে পারত।
এনবিআরের ২০২৩ সালের নির্দেশনা অনুযায়ী, ইএফডি ব্যবহার না করা বা ক্রেতাকে রসিদ না দিলে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের ভ্যাট ফাঁকি দেওয়া বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই জরিমানা কতটা কার্যকর। যদিও ভ্যাট আইনে কর ফাঁকির পরিমাণের ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে, বাস্তবে সেই বিধান প্রয়োগের নজির খুবই সীমিত।
কর বিশেষজ্ঞ ও চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট স্নেহাশীষ বড়ুয়ার মতে, খুচরা পর্যায়ে উচ্চ ভ্যাট হার অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীকে আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার বাইরে থাকতে উৎসাহিত করছে। পাশাপাশি ইএফডি চালুর সময় আধুনিক প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারির যথাযথ সমন্বয় করা হয়নি।
তিনি বলেন, বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের জন্য ই-ইনভয়েসিং কার্যকর হলেও ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (ইএফডিএমএস) এখনও প্রত্যাশিত সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। অনেক ব্যবসায়ী সব বিক্রয়ের তথ্য ইএফডিতে সংরক্ষণ করেন না। ফলে বিক্রয়ের একটি অংশ নজরদারির বাইরে থেকে যায়।
অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানও একই ধরনের মত দিয়েছেন। তার মতে, ইসিআর থেকে শুরু করে ইএফডি পর্যন্ত প্রতিটি উদ্যোগের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার অস্পষ্টতা, মাঠপর্যায়ের অদক্ষতা এবং সুশাসনের অভাব। প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি কার্যকর বাস্তবায়ন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করলে ভবিষ্যতেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।
ইএফডি প্রকল্পের গল্পটি শুধু একটি প্রযুক্তি স্থাপনের ব্যর্থতার গল্প নয়; এটি একটি পুরো রাজস্ব ব্যবস্থার দুর্বলতা, পরিকল্পনার ঘাটতি এবং জবাবদিহির সংকটের প্রতিচ্ছবি। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে যন্ত্র বসানো হয়েছে, সফটওয়্যার তৈরি হয়েছে, অটোমেশনের স্বপ্ন দেখানো হয়েছে— কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, সেই প্রযুক্তি কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে?
যে প্রযুক্তি রুয়ান্ডা, পর্তুগাল কিংবা উগান্ডার মতো দেশে ভ্যাট আদায়ে পরিবর্তন এনেছে, বাংলাদেশে সেটিই কেন বারবার বাধার মুখে পড়ছে? সমস্যা কি শুধুই যন্ত্রে, নাকি এর পেছনে রয়েছে ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, স্বচ্ছতার অভাব এবং পুরোনো অনিয়মের সংস্কৃতি?
ভোক্তা পণ্য কেনার সময় নিয়ম মেনে ভ্যাট পরিশোধ করছেন। কিন্তু সেই অর্থ যদি ডিজিটাল ব্যবস্থার ফাঁক গলে সরকারি কোষাগারে না পৌঁছায়, তাহলে দায় কার? প্রযুক্তির, ব্যবসায়ীর, নাকি তদারকি ব্যবস্থার?
একদিকে রাষ্ট্র রাজস্ব ঘাটতি পূরণে নতুন নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্যমান ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে সম্ভাব্য হাজার হাজার কোটি টাকা আদায় হচ্ছে না। তাহলে শুধু নতুন কর বাড়ানোর চিন্তা, নাকি আগে বিদ্যমান রাজস্ব ব্যবস্থাকে কার্যকর করাই হওয়া উচিত— সেই প্রশ্নও সামনে আসছে।
ইএফডি কি শুধুই আরেকটি ব্যর্থ অটোমেশন প্রকল্প হয়ে থাকবে, নাকি সঠিক পরিকল্পনা, জবাবদিহি ও প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহারে এটি আবার ঘুরে দাঁড়াবে? শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই— সমস্যা কি প্রযুক্তির অভাবে, নাকি প্রযুক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর সদিচ্ছার অভাবে?

