এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের পর অর্থনীতির গতি ধরে রাখা এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে পাঁচ বছর মেয়াদি বড় ধরনের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। তবে এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণের সময় দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও শিল্প খাতের চ্যালেঞ্জগুলো বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকারের প্রণীত ‘কান্ট্রি প্রোগ্রাম ডকুমেন্ট ২০২৬-২০৩১’-এ ২০৩১ সালের মধ্যে মাথাপিছু আয় প্রায় ৭৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৫ হাজার ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক, মানবসম্পদ উন্নয়ন সূচকসহ বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) আর্থিক সহায়তায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এই কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে। এতে এলডিসি উত্তরণের পরবর্তী সময়ে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং অর্থনীতির সক্ষমতা বৃদ্ধির কৌশল তুলে ধরা হয়েছে। পরিকল্পনাটি বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার এবং এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তৈরি ‘স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি’র সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রস্তুত করা হয়েছে।
রপ্তানি ও বিনিয়োগ বাড়ানোর বড় লক্ষ্য:
কান্ট্রি প্রোগ্রামে আগামী পাঁচ বছরে সেবা রপ্তানি ৫ বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ১০ বিলিয়ন ডলারে নেওয়ার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। পাশাপাশি রপ্তানিযোগ্য পণ্যের সংখ্যা প্রায় ৬০ শতাংশ বাড়িয়ে ৮০০টিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বর্তমানে ১ হাজার ডলারের বেশি মূল্যের রপ্তানি হয় এমন পণ্যের সংখ্যা প্রায় ৫০০। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩১ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ৮০০-তে নেওয়া হবে। এ ছাড়া জিডিপির তুলনায় রপ্তানিমুখী বিনিয়োগের হার শূন্য দশমিক ৬৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে বিনিয়োগ পরিস্থিতিকে। কারণ, দেশের বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি বর্তমানে দীর্ঘদিনের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিনিয়োগ না বাড়লে রপ্তানি সম্প্রসারণ ও নতুন শিল্প গড়ে তোলার লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ২০৩১ সালের লক্ষ্য অর্জনে সরকারি, বেসরকারি ও বিদেশি—সব ধরনের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার বিনিয়োগের অন্যতম বাধা। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ঋণের সুদহার কমানো না গেলে বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে বাড়বে না।
২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের কথা রয়েছে। তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং দেশের অর্থনৈতিক দুর্বলতার বিষয় বিবেচনা করে উত্তরণের প্রস্তুতি সময় ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর আবেদন করেছে সরকার। জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) এ আবেদন অনুমোদন করেছে। এখন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষা রয়েছে।
এলডিসি থেকে বের হওয়ার পর বাংলাদেশ বিভিন্ন বাণিজ্য সুবিধা, যেমন শুল্ক ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা, সহজ রুলস অব অরিজিন এবং কিছু মেধাস্বত্ব সুবিধা ধীরে ধীরে হারাবে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগামী পাঁচ বছরে নয়টি দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) অথবা অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বর্তমানে জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি ইপিএ রয়েছে। এছাড়া ভারত, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে।
কান্ট্রি প্রোগ্রামে তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি বহুমুখীকরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ ধীরে ধীরে সীমিত হচ্ছে। অন্যদিকে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) বড় অংশজুড়ে থাকা সেবা খাত থেকে রপ্তানি আয় এখনো তুলনামূলক কম।
বাংলাদেশের জিডিপিতে সেবা খাতের অবদান ৫৬ শতাংশের বেশি হলেও এ খাত থেকে রপ্তানি আয় ৭ বিলিয়ন ডলারেরও কম বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দুর্বল লজিস্টিকস ব্যবস্থা, পর্যটন অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং সেবা খাতে বিদেশি বিনিয়োগের ঘাটতিকে প্রতিযোগিতা সক্ষমতার বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
৫২ প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা:
পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রাথমিকভাবে ৫২টি প্রকল্পের ধারণা চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব প্রকল্পে উন্নয়ন সহযোগীদের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা, সরকারের দায়িত্ব এবং ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর ভূমিকার বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে।
বাণিজ্য অবকাঠামোর উন্নয়ন, বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণ এবং ব্যবসার পরিবেশ সহজ করার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ডব্লিউটিওর এনহ্যান্সড ইন্টিগ্রেটেড ফ্রেমওয়ার্ক (ইআইএফ) যৌথভাবে এই কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে।
পাঁচ বছর মেয়াদি এই পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একটি ভ্যালিডেশন কর্মশালার আয়োজন করে। সেখানে বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খান বলেন, শুধু নীতি ও গবেষণা প্রতিবেদন তৈরি করলেই হবে না, সফলতার মূল নির্ভর করবে কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।
ইআইএফের পরামর্শক ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. হাফিজুর রহমান বলেন, উন্নয়ন সহযোগীরা অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা দিতে আগ্রহী। তবে সরকারের দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপরই এসব উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে।
পরিকল্পনায় রেগুলেটরি কোয়ালিটি সূচকে বাংলাদেশের বর্তমান স্কোর ২৫ দশমিক ৭ থেকে বাড়িয়ে ৪০ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন ইনডেক্সে স্কোর ৬৫ দশমিক ৬ থেকে ৮০-তে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
গ্লোবাল ইকোনমিক ডাইভারসিফিকেশন ইনডেক্স অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ট্রেড ডাইভারসিফিকেশন সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৯৫। বেসরকারি খাতের বহুমুখীকরণ ও মূল্য সংযোজন বাড়িয়ে ২০৩১ সালের মধ্যে এই স্কোর ১৩০-এ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকারের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে এলডিসি পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি আরও প্রতিযোগিতামূলক হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, জ্বালানি সংকট সমাধান এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নই হবে এই লক্ষ্য অর্জনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

