দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ কয়েক বছর ধরেই ধীরগতিতে চলছে। একসময় যে খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৪ থেকে ১৫ শতাংশের কাছাকাছি, ধারাবাহিক পতনের পর তা এখন ৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।
ঋণপ্রবাহ বাড়াতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন নীতি সহায়তা, প্রণোদনা এবং সহজ শর্তের ঋণ কর্মসূচি নিয়েছে। তবে ব্যাংকার ও উদ্যোক্তাদের মতে, শুধু সুদহার কমানো বা ঋণ সুবিধা বাড়ালেই কাঙ্ক্ষিত ফল মিলবে না। শিল্প উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস ও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে নতুন বিনিয়োগ ও ঋণের চাহিদা বাড়ানো কঠিন।
শিল্প খাতে গ্যাস সংকট এখন আর সাময়িক সমস্যা নয়, বরং এটি বিনিয়োগ, উৎপাদন সক্ষমতা এবং রফতানি প্রতিযোগিতার জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদার তুলনায় সরবরাহে ঘাটতি রয়েছে এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি। এর ফলে অনেক শিল্পকারখানা প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ পাচ্ছে না। উৎপাদন কমছে, আবার নতুন কারখানায় গ্যাস সংযোগও বন্ধ রয়েছে।
পেট্রোবাংলার হিসাবে, দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি)। এর বিপরীতে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র ও আমদানিকৃত এলএনজি মিলিয়ে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৬৭০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন ঘাটতি থাকছে প্রায় ১ হাজার ১৩০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ মোট চাহিদার ৩০ শতাংশের বেশি গ্যাসের ঘাটতি নিয়েই চলছে দেশের শিল্প ও অন্যান্য কার্যক্রম।
গ্রীষ্মকালে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। তখন শিল্প খাতের জন্য বরাদ্দ গ্যাসের একটি অংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সার কারখানায় সরিয়ে নেওয়া হয়। এতে শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ আরও কমে যায়।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অন্তর্বর্তীকালীন) মো. এনামুল হকের মতে, দেশে বেসরকারি খাতে ঋণের ধীরগতি শুধু উচ্চ সুদহার বা কঠোর মুদ্রানীতির কারণে হচ্ছে না। এর পেছনে উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে অনিশ্চয়তাও বড় কারণ। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকার ঋণপ্রবাহ বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু শিল্প খাত যদি জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন বাড়াতে না পারে, তাহলে শুধু মুদ্রানীতিনির্ভর উদ্যোগ ঋণের প্রবৃদ্ধিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারবে না।
তার মতে, উচ্চ উৎপাদনক্ষম শিল্পে গ্যাস সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেওয়া, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির উন্নয়ন এবং জ্বালানি আমদানির সরবরাহ ব্যবস্থা স্থিতিশীল করা জরুরি। কারণ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গ্যাসনির্ভর শিল্পগুলো। তৈরি পোশাক, স্পিনিং, উইভিং, ডাইং, নিটিং, সিরামিক, কাচ, ইস্পাত, সিমেন্ট, কাগজ, রাসায়নিক ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পের অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। শিল্প মালিকদের সংগঠনগুলোর দাবি, প্রায় ৪০০ গ্যাসনির্ভর কারখানা স্বাভাবিক সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে না। অনেক প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। কিছু কারখানা বাধ্য হয়ে বন্ধও হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে ব্যাংক খাতেও। উৎপাদন কমে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানের ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা কমছে। ফলে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের ঝুঁকি বাড়ছে।
গ্যাস সংযোগ না পাওয়ার কারণে বড় ধরনের সমস্যায় পড়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ খেলাপিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলে গড়ে তোলা ছয়টি বড় শিল্পকারখানায় এখনো গ্যাস সংযোগ পায়নি প্রতিষ্ঠানটি। ২০২০ সালের পর এসব কারখানা নির্মাণে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হলেও উৎপাদনে যেতে পারেনি সবগুলো প্রকল্প।
দেশের গ্যাস সংকট নতুন নয়। প্রায় এক দশক আগেই এর ঝুঁকি স্পষ্ট হয়েছিল। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন দিয়ে শিল্পের চাহিদা পূরণ সম্ভব না হওয়ায় ২০১৮ সালের এপ্রিল থেকে এলএনজি আমদানি শুরু করে তৎকালীন সরকার। বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা গ্যাসের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৬৪০ মিলিয়ন ঘনফুট আসছে দেশীয় উৎস থেকে। আর প্রায় ৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ হচ্ছে আমদানিকৃত এলএনজি থেকে।
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। দেশের মোট ২৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৪২ শতাংশ গ্যাসনির্ভর। কিন্তু গ্যাসের অভাবে চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন করা যাচ্ছে না। ফলে বিভিন্ন সময়ে লোডশেডিংয়ের পরিস্থিতিও তৈরি হচ্ছে।
শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন কম হচ্ছে। একই সঙ্গে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া বিলের কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোও ঝুঁকিতে রয়েছে। তার মতে, জ্বালানি সংকট সমাধান না হলে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি বাড়ার আশা করা কঠিন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কভিড মহামারীর আগে ২০২০ সালে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৫ শতাংশের বেশি। এরপর থেকেই ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে এই প্রবৃদ্ধি। ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রণোদনা প্যাকেজের পরও ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ১০ দশমিক ৫৮ শতাংশে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আরও কমে হয় ৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
পরবর্তী সময়ে ব্যাংক খাতের সংস্কার, অনিয়মিত ঋণ বিতরণ বন্ধ এবং কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সংকটের কারণে ঋণ প্রবাহ আরও ধীর হয়ে পড়ে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা ৫ শতাংশের নিচে নেমেছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে।
বেসরকারি খাতে ঋণ বাড়াতে সম্প্রতি ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে জ্বালানি সংকটের কারণে এই অর্থ কতটা কাজে লাগবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহসান জামান চৌধুরী বলেন, শিল্প খাতের স্থবিরতার মূল কারণগুলোর একটি হচ্ছে জ্বালানি সংকট। সুদের হার কমলেও গ্যাস না থাকলে উদ্যোক্তারা নতুন শিল্প স্থাপনে আগ্রহী হবেন না। তিনি বলেন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে প্রথমে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান তানভিরুর রহমান বলেন, শিল্প খাতের জন্য গ্যাসসহ জ্বালানি সংকট এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তার মতে, শুধু সুদের হার কমানো নয়, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। একই সঙ্গে জ্বালানি আমদানির উৎস বৈচিত্র্য, কর-শুল্ক কাঠামো যৌক্তিক করা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা তহবিল গঠন করা জরুরি। উদ্যোক্তাদের মতে, বেসরকারি খাতের নেতৃত্বে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে সবচেয়ে বড় শর্ত এখন জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

