স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখোমুখি হতে পারে। বর্তমানে এলডিসি হিসেবে পাওয়া পেটেন্ট বা মেধাস্বত্ব ছাড়ের সুবিধা, শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা এবং নগদ রপ্তানি সহায়তা—সবই ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যাবে। এতে ওষুধ উৎপাদনের খরচ বাড়ার পাশাপাশি দেশের বাজারে ওষুধের দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, এলডিসি উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ব নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। ফলে অনেক জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনে বাড়তি ব্যয় যুক্ত হতে পারে। একই সঙ্গে বিদেশ থেকে আমদানি করা কাঁচামালের ওপর নির্ভরতা কমাতে না পারলে উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় এলডিসি থেকে উত্তরণের আগেই ওষুধ শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন উদ্যোক্তারা। তারা বলছেন, দেশেই ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদন, গবেষণা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে দেশের মানুষকে তুলনামূলক কম দামে ওষুধ সরবরাহ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানিও বাড়বে।
বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির মহাসচিব ডা. মো. জাকির হোসেন বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ট্রিপস চুক্তির আওতায় পাওয়া বিশেষ সুবিধা সীমিত হয়ে যাবে। তখন জেনেরিক ওষুধ উৎপাদন ও রপ্তানিতে দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের ওষুধ শিল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কাঁচামাল নির্ভরতা। ওষুধ তৈরির প্রধান উপাদান অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (এপিআই)-এর প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে ডলারের দাম বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার সংকট কিংবা কাঁচামালের মূল্য বাড়লে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যায়। তার মতে, ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশীয় ওষুধ শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের ডিপিডিটির উপসচিব ড. অশোক কুমার রায় বলেন, বাংলাদেশ এখনো এলডিসিভুক্ত দেশ হওয়ায় ওষুধ উৎপাদনে পেটেন্ট ছাড়ের সুবিধা পাচ্ছে। এই সুবিধার কারণে আন্তর্জাতিকভাবে পেটেন্ট করা অনেক ওষুধের জেনেরিক সংস্করণ তুলনামূলক কম খরচে উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে।
তিনি বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর পেটেন্ট সুবিধা না থাকলে নতুন ওষুধ উৎপাদনে বাড়তি খরচ যুক্ত হবে। এর প্রভাব বাজারে ওষুধের দামের ওপর পড়তে পারে। তিনি আরও বলেন, উত্তরণের আগেই উদ্যোক্তাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, গবেষণা এবং উৎপাদন ব্যবস্থার উন্নয়নে জোর দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এলডিসি দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বর্তমানে ডব্লিউটিওর ট্রিপস চুক্তির আওতায় ওষুধের পেটেন্ট বাস্তবায়নে বিশেষ ছাড় পেয়ে আসছে। এই সুবিধার কারণে দেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক পেটেন্ট থাকা অনেক ওষুধের জেনেরিক সংস্করণ তৈরি, বাজারজাত এবং রপ্তানি করতে পারছে।
তবে এলডিসি উত্তরণের পর এই সুবিধা আর থাকবে না। তখন নতুন পেটেন্টযুক্ত ওষুধ উৎপাদন বা বাজারজাত করতে আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ব আইন মেনে চলতে হবে। প্রয়োজনে পেটেন্ট মালিকদের কাছ থেকে লাইসেন্স নিতে হতে পারে, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো, নতুন ওষুধ উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক মানের ক্লিনিক্যাল গবেষণার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
ওষুধ শিল্পের অন্যতম বড় সমস্যা হলো কাঁচামালের জন্য বিদেশ নির্ভরতা। দেশের অধিকাংশ এপিআই চীন, ভারত ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি কিংবা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে উৎপাদনে। শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ সমস্যা কাটাতে এপিআই শিল্প পার্ক দ্রুত পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা প্রয়োজন। দেশেই কাঁচামাল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হলে ওষুধের উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং রপ্তানি সক্ষমতাও বাড়বে।
বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের বাজার বর্তমানে প্রায় ৩৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকা। প্রতি বছর গড়ে ১০ থেকে ১২ শতাংশ হারে এ খাতের প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। দেশের প্রায় ৯৮ শতাংশ ওষুধের চাহিদা স্থানীয় উৎপাদনের মাধ্যমে পূরণ করছে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ২০০। তবে বাজারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে শীর্ষ কয়েকটি কোম্পানি।
দেশের ওষুধ বাজারে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস, রেনেটা পিএলসি, বেক্সিমকো ফার্মা ও এসিআইয়ের মতো প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশের ওষুধ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। এর মধ্যে শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, নেপাল, ফিলিপাইন, কেনিয়া, ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র অন্যতম। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ওষুধ রপ্তানি থেকে বাংলাদেশ প্রায় ২১ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার আয় করেছে। আগের বছরের তুলনায় এই আয় বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এলডিসি উত্তরণ বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের জন্য যেমন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে, তেমনি সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগও তৈরি করবে। সময়মতো প্রস্তুতি নিতে পারলে উচ্চমূল্যের আন্তর্জাতিক বাজারেও দেশের ওষুধ শিল্প আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।

