দেশের শিল্প খাতে গ্যাস সংকট এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ না থাকায় অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও কম সক্ষমতায় চলছে উৎপাদন, আবার কোথাও বাধ্য হয়ে বন্ধ রাখতে হচ্ছে কারখানার কার্যক্রম। গ্যাসের ঘাটতি সামাল দিতে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করায় বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়। এতে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য।
রাজধানীর কাছাকাছি টঙ্গীর পাগার এলাকায় অবস্থিত আনোয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের দুটি প্রতিষ্ঠান—হোসেন ডায়িং অ্যান্ড প্রিন্টিং মিলস লিমিটেড এবং মেহমুদ ইন্ডাস্ট্রিজ প্রাইভেট লিমিটেড—এর উৎপাদনও গ্যাস সংকটে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
কারখানা পরিচালনার জন্য যেখানে প্রায় ১৫ পিএসআই গ্যাসের চাপ প্রয়োজন, সেখানে গত দুই মাসে চাপ ৪ পিএসআইয়ের বেশি পাওয়া যায়নি। অনেক সময় গ্যাসের চাপ একেবারে শূন্যে নেমে আসে। তখন উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রাখা ছাড়া উপায় থাকে না।
আনোয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ভাইস চেয়ারম্যান হোসেন মেহমুদ জানান, পরিস্থিতি সামাল দিতে এলপিজি, বিদ্যুৎ ও তেল ব্যবহার করে উৎপাদন চালু রাখা হচ্ছে। তবে এতে প্রাকৃতিক গ্যাসের তুলনায় উৎপাদন খরচ প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়ে গেছে। তিনি বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে শুধু ব্যয়ই বাড়ছে না, উৎপাদন পরিকল্পনাও ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এ পরিস্থিতি শিল্পের সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
গ্যাস সংযোগ না পেয়ে বিদ্যুৎ নির্ভর কারখানা:
মানিকগঞ্জের ধামরাইয়ে প্রধান সড়কের পাশে অবস্থিত ইনডেট ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কও একই সংকটে পড়েছে। বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যাক্সেসরিজ অ্যান্ড প্যাকেজিং ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএপিএমইএ) সভাপতি মো. শাহরিয়ারের মালিকানাধীন এ কারখানার আয়তন প্রায় সাড়ে চার লাখ বর্গফুট।
কারখানা স্থাপনের পর দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো গ্যাস সংযোগ পায়নি প্রতিষ্ঠানটি। সংযোগের জন্য মানিকগঞ্জের তিতাস কার্যালয়ে একাধিকবার যোগাযোগ করেও কোনো কার্যকর সমাধান পাননি উদ্যোক্তা। বাধ্য হয়ে বিদ্যুতের মাধ্যমে কারখানার একটি অংশে উৎপাদন চালু করা হয়েছে। তবে বিদ্যুৎ নির্ভর উৎপাদনে খরচ বেড়েছে ৮ থেকে ১০ শতাংশ।
গ্যাস সংকটে বন্ধ গাজীপুরের পাঁচ কারখানা:
গ্যাস সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় জুলাই মাসের শুরুতে গাজীপুরে লিথী গ্রুপের পাঁচটি পোশাক কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এতে প্রায় আড়াই হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন। কারখানা বন্ধের নোটিশে বলা হয়, গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকা, উৎপাদন কমে যাওয়া, ক্রয়াদেশ হ্রাস এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসা নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে এ সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
রাজধানীর একটি হোটেলে দৈনিক বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও রূপান্তর’ শীর্ষক নীতি সংলাপে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের জ্বালানি খাতে কার্যকর পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। তিনি বলেন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য যে পরিমাণ জ্বালানি প্রয়োজন, তার নিশ্চয়তা তৈরি করা যায়নি। গত ১৭ বছরে দেশে কোনো নতুন গ্যাসকূপ খনন হয়নি। ফলে বর্তমানে আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে প্রথমে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হয়। এরপর বাজারে পণ্য সরবরাহ কমে যায় এবং কারখানার মুনাফা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তার মতে, দীর্ঘ সময় এ সমস্যা চলতে থাকলে প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়। এর প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থানের ওপরও। ছোট শিল্প থেকে শুরু হওয়া সংকট ধীরে ধীরে বড় শিল্পেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তিনি বলেন, শুধু এলএনজি আমদানি করে দীর্ঘমেয়াদে গ্যাস সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। এজন্য নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

