দেশে নতুন শিল্প স্থাপন, চলমান কারখানায় উৎপাদন অব্যাহত রাখা এবং বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য ও টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা। কিন্তু পর্যাপ্ত ও স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়ায় দেশের শিল্প খাত নানা সমস্যার মুখে পড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে উৎপাদন, রফতানি সক্ষমতা এবং বিনিয়োগ পরিবেশে।
শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকের অর্থায়নও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা দূর করা না গেলে নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণ করতে হবে। একই সঙ্গে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও পূর্বানুমানযোগ্য নীতিকাঠামো তৈরি করা জরুরি।
তাদের মতে, শুধু সরকারের একার পক্ষে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব নয়। জ্বালানি খাতের উন্নয়নে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণও বাড়াতে হবে। জীবাশ্ম জ্বালানি ও আমদানিনির্ভর ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও রূপান্তর’ শীর্ষক পলিসি কনক্লেভে এসব বিষয় উঠে আসে। বণিক বার্তা আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে জ্বালানি খাতের নীতিনির্ধারক, বিশেষজ্ঞ, উদ্যোক্তা, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকাররা অংশ নেন। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার, টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং নবায়নযোগ্য শক্তিতে রূপান্তরের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে এ আলোচনার আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি।
কনক্লেভে বক্তব্য দিতে গিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের জ্বালানি খাতে কার্যকর পরিকল্পনার ঘাটতি ছিল। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হলেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি নিশ্চিত করতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, গত ১৭ বছরে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে বড় ধরনের অগ্রগতি হলেও গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে কাঙ্ক্ষিত উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। দেশে প্রায় ২৮ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হলেও এর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়নি।
মন্ত্রী বলেন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে বর্তমানে দেশের জ্বালানি ব্যবস্থা অনেকাংশে আমদানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। পাশাপাশি এলএনজি আমদানির অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করতে হবে, যাতে কোনো একটি স্থাপনায় সমস্যা তৈরি হলে পুরো দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা সংকটে না পড়ে।
কনক্লেভে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানান জ্বালানি মন্ত্রী। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পাইকারি পর্যায়ে সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত। তবে গ্রাহক পর্যায়ের বিতরণ ব্যবস্থায় দক্ষ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
মন্ত্রী বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সফলভাবে বিদ্যুৎ বিতরণ করছে। ভারতের কলকাতা, মুম্বাই ও দিল্লির উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, সেখানে বেসরকারি কোম্পানিগুলো বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থাপনায় কার্যকর ভূমিকা রাখছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি অন্য দেশের উদ্যোক্তারা এ খাতে সফল হতে পারেন, তাহলে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা কেন পারবেন না?
মন্ত্রী আরও বলেন, সরকারের কাজ হওয়া উচিত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা এবং পাইকারি পর্যায়ে সরবরাহ নিশ্চিত করা। কিন্তু খুচরা পর্যায়ের বিতরণ ব্যবস্থা দক্ষ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়া হলে সেবার মান ও দক্ষতা বাড়তে পারে। তিনি বলেন, তার অধীন বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোকে দীর্ঘমেয়াদে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার বিষয়টি তিনি দেখতে চান।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, দেশের নিজস্ব জ্বালানি সম্পদ খুব বেশি নয়। কয়লার মজুদ থাকলেও তা উত্তোলনের বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্তহীনতা রয়েছে। আর জ্বালানি খাতের অন্যতম প্রধান সম্পদ গ্যাসের মজুদ নিয়েও ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিত ধারণা নেই।
তিনি বলেন, গত প্রায় ৭০ বছর ধরে দেশে গ্যাস ব্যবহার হচ্ছে। শুরুতে দৈনিক মাত্র ৩১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও ২০১৬-১৭ সময়ে তা বেড়ে প্রায় ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছায়। তবে বর্তমানে স্থানীয় উৎস থেকে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জানান, স্থানীয় উৎপাদনের পাশাপাশি দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে আরও প্রায় এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে দেশে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে। তবে বাংলাদেশে নতুন করে বড় ধরনের গ্যাস মজুদ রয়েছে কিনা, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় গ্যাস অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন জালাল আহমেদ। তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলো সমুদ্র এলাকায় অনুসন্ধান চালিয়ে বড় ধরনের গ্যাস মজুদের সন্ধান পেয়েছে। মিয়ানমার তার দক্ষিণ উপকূলের কাছে প্রায় ১০০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুদের সন্ধান পেয়েছে বলে খবর এসেছে। একই সময়ে ভারতের অন্ধ্র প্রদেশেও প্রায় ২৯ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগর এলাকায় গত ১৭ বছরে উল্লেখযোগ্য অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে সমুদ্র এলাকায় যে দরপত্র কার্যক্রম চলছে, সেটি সফল হলেও অনুসন্ধানের ফলাফল জানতে কয়েক বছর সময় লাগবে। তার মতে, দ্রুত জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে স্থল ও সমুদ্র—দুই জায়গাতেই অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের উপাচার্য ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম। তিনি বলেন, দেশের গ্যাস মজুদ কমে আসা এবং নতুন অনুসন্ধানে ধীরগতির কারণে বিদ্যুৎ খাতে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় কোনো একক প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করলে হবে না।
তার মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কয়লা ও পারমাণবিক শক্তির সমন্বয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, জমির সীমাবদ্ধতার কারণে শুধু ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ওপর নির্ভর করা বাস্তবসম্মত নয়। সরকারি অব্যবহৃত জমি এবং শিল্প কারখানার ছাদ ব্যবহার করে দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।
তিনি আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি কমাতে জ্বালানি আমদানির উৎস বাড়ানো এবং দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক বিদ্যুৎ গ্রিড ব্যবস্থার মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সংরক্ষণ প্রযুক্তি উন্নয়ন, অদক্ষ যন্ত্রপাতির ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তিতে সুবিধা দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
কনক্লেভে উপস্থিত বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান বিভাগের পরিচালক জ্যঁ পেম বলেন, জ্বালানি শুধু একটি খাত নয়, এটি দেশের বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ সুবিধা সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। তবে জ্বালানি খাতে এখনো বেশ কিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
জ্বালানি সরবরাহে আমদানিনির্ভরতা এবং প্রকৃত উৎপাদন ব্যয় ও গ্রাহক পর্যায়ের দামের মধ্যে দীর্ঘদিনের ব্যবধানকে অন্যতম সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। জ্যঁ পেম বলেন, বাংলাদেশের গ্যাসের প্রায় ৩০ শতাংশ, তেলের ৯৫ শতাংশ এবং কয়লার ৯০ শতাংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ওঠানামা, সরবরাহ বিঘ্ন এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হয়। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বৈশ্বিক ঘটনাগুলো আবারও দেখিয়েছে, অতিরিক্ত আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, শুধু আমদানির ওপর নির্ভরতা নয়, একই সঙ্গে দেশের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়াও বড় উদ্বেগের বিষয়। পাশাপাশি অতীতের বিদ্যুৎ উৎপাদন সংক্রান্ত বিভিন্ন চুক্তির ব্যয়ও বর্তমানে খাতটির আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এখনই কার্যকর পরিকল্পনা ও সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বলেন, যেকোনো নীতি প্রণয়নের আগে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করা জরুরি। নীতির স্বচ্ছতা না থাকলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়। তিনি বলেন, সৌরবিদ্যুৎ খাতে শুল্ক সুবিধা নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে এখনো স্পষ্টতা নেই। সুবিধা কমার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে ব্যয় বেড়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
আজম জে চৌধুরী বলেন, নীতি প্রণয়নের আগে অংশীজনদের মতামত নেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কারণ বিনিয়োগকারীরা বড় অংকের অর্থ বিনিয়োগ করার পর যদি জ্বালানি সংযোগ ও সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েন, তাহলে এর নেতিবাচক প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়ে।
তিনি বলেন, শিল্প খাতে গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে পূর্বানুমানযোগ্য নীতিকাঠামো প্রয়োজন। সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা থাকলে উৎপাদন ব্যাহত হয়, বাড়ে খরচ এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের সরবরাহ ব্যবস্থা।
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এমসিসিআই) সহসভাপতি ও ট্রান্সকম গ্রুপের গ্রুপ সিইও সিমিন রহমান বলেন, শিল্প খাতের বর্তমান বড় চ্যালেঞ্জ শুধু জ্বালানির প্রাপ্যতা নয়, এর নির্ভরযোগ্যতা ও মান নিশ্চিত করাও জরুরি। তিনি বলেন, বিদ্যুতের ঘাটতি, ভোল্টেজের ওঠানামা এবং আকস্মিক বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে পরিচালন ব্যয় বাড়ছে এবং ব্যবসায়িক পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।
সিমিন রহমান বলেন, ভবিষ্যৎ উপযোগী একটি স্থিতিশীল জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে দেশের শিল্প খাত আরও শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে। এর মাধ্যমে নতুন বিনিয়োগ বাড়বে, দক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং অর্থনৈতিক রূপান্তরের গতি বাড়বে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল হাসিব চৌধুরী বলেন, দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় শুধু নিরাপত্তা বা এলএনজি নির্ভরতার বিষয়টি বিবেচনা করলে হবে না। সীমিত জমি ও বিপুল মানবসম্পদের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। তিনি বলেন, কৃষিসহ উৎপাদনশীল খাতের দক্ষতা বাড়িয়ে সামগ্রিক শক্তি ব্যবহারের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অধ্যাপক হাসিব চৌধুরী বলেন, বর্তমানে বাসাবাড়িতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় প্রায় ছয় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে। পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই শক্তির আরও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব। তিনি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে মেট্রোরেল, রেলস্টেশনসহ বিভিন্ন স্থাপনার ছাদ ব্যবহার করে সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থার মতো নতুন উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন। তার মতে, জাতীয় গ্রিডের সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পিতভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি যুক্ত করতে হবে।
বিদ্যুৎ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে আধুনিক মূল্য কাঠামো চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এম রিজওয়ান খান। তিনি বলেন, সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় দ্রুত কমছে। ফলে ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির বিস্তার ঠেকানো সম্ভব হবে না। তাই জাতীয় গ্রিডের ভারসাম্য রক্ষা এবং বড় বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বর্তমান বিদ্যুৎ মূল্য কাঠামোতে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
তিনি তিন স্তরের সময়ভিত্তিক বিদ্যুৎ মূল্য ব্যবস্থা চালুর ওপর গুরুত্ব দেন। তার মতে, বিদ্যুতের চাহিদার সময় অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণ করা গেলে গ্রাহকরা কম খরচের সময়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার বা ব্যাটারি চার্জে উৎসাহিত হবেন। ব্যাটারি সংরক্ষণ প্রযুক্তি এবং নেট মিটারিং ব্যবস্থা সহজ করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দ্রুত এগোতে হবে। তিনি বলেন, তবে নীতিগত জটিলতা, ধীরগতির অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং কর কাঠামোর অস্পষ্টতার কারণে এ খাতে বিদেশি বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় আসছে না।
তিনি অভিযোগ করেন, বাজেটে শূন্য কর সুবিধার কথা বলা হলেও বাস্তবে মূলধনি যন্ত্রপাতির ওপর মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও অগ্রিম আয়কর আরোপের কারণে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধা তৈরি হচ্ছে। মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, শুধু সমুদ্রের গ্যাস বা কয়লা উত্তোলনের অপেক্ষায় না থেকে এখনই সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হবে। এ জন্য সরকারের দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমগীর মোরসেদ বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে টেকসই অর্থায়ন নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি কমাতে আন্তর্জাতিক গ্যারান্টি ব্যবস্থার সহায়তায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে স্থানীয় মুদ্রায় দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে।
গৃহস্থালি পর্যায়ে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে সহজ ঋণ সুবিধা চালুর পাশাপাশি বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত সম্প্রসারণে শুধু প্রযুক্তি নয়, সহজ অর্থায়ন ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ওমেরা রিনিউয়েবল এনার্জির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুদুর রহিম বলেন, দেশের অব্যবহৃত ছাদগুলো কাজে লাগিয়ে পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের বেশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি বলেন, কিন্তু নীতিগত জটিলতা ও দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে এ সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। তার মতে, এনবিআরের বিভিন্ন শর্তের কারণে সৌরবিদ্যুৎ খাতে ব্যয় বেড়েছে। এ ধরনের বাধা দূর করে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
মাসুদুর রহিম বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে আমদানিনির্ভরতা কমাতে হবে। পাশাপাশি দেশে উৎপাদিত প্রযুক্তি ও সৌর প্যানেল ব্যবহারে নীতিগত সুবিধা দেওয়া প্রয়োজন। এতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পও বিকশিত হবে।

