যশোর বিমানবন্দরে এক সময় ছিল ব্যস্ততা। প্রতিদিন চলত একাধিক ফ্লাইট। ঢাকা-যশোর আকাশপথে যাত্রীদের ছিল নিয়মিত যাতায়াত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। পদ্মা সেতু চালুর পর সড়ক ও রেল যোগাযোগ সহজ হওয়ায় কমতে শুরু করেছে আকাশপথের যাত্রী। এর প্রভাব পড়েছে বিমান চলাচলে।
যাত্রী সংকটের কারণে সর্বশেষ যশোর রুট থেকে ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বেসরকারি উড়োজাহাজ সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স। এর আগে একই কারণে ফ্লাইট স্থগিত করে নভোএয়ার। বর্তমানে এই বিমানবন্দর থেকে সপ্তাহে মাত্র দুটি ফ্লাইট পরিচালনা করছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স।
বিমানবন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পদ্মা সেতু চালুর আগে ঢাকা-যশোর রুটে আকাশপথের ওপর নির্ভরতা ছিল বেশি। তখন প্রতিদিন প্রায় নয়টি ফ্লাইট চলত। কিন্তু সড়ক ও রেল যোগাযোগ উন্নত হওয়ায় ধীরে ধীরে যাত্রী কমতে থাকে। ফলে বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলোর জন্য এই রুট ব্যবসায়িকভাবে টেকসই রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
গত ১৬ জুলাই থেকে যশোর রুটে সাময়িকভাবে ফ্লাইট বন্ধ করেছে ইউএস-বাংলা। এর আগে প্রতিষ্ঠানটি সপ্তাহের প্রতিদিন ঢাকা-যশোর রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করত। যাত্রী কমে যাওয়ার কারণে ধাপে ধাপে ফ্লাইট সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়।
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক কামরুল ইসলাম বলেন, যাত্রী সংকটের কারণেই এই রুটে ফ্লাইট সাময়িক বন্ধ করা হয়েছে। একসময় ঢাকা-যশোর রুটে প্রতিদিন ছয়টি পর্যন্ত ফ্লাইট পরিচালনা করা হলেও পরে তা কমিয়ে দিনে একটিতে নামিয়ে আনা হয়। কিন্তু সেটিও লাভজনক করা সম্ভব হয়নি।
তিনি জানান, একটি ফ্লাইট পরিচালনা লাভজনক রাখতে উড়োজাহাজের আসনের অন্তত ৭০ শতাংশ যাত্রী প্রয়োজন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই রুটে যাত্রী পাওয়া যাচ্ছিল ৫০ শতাংশেরও কম। এতে জ্বালানি, কর্মীসহ অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
চার বছরে কমেছে সাড়ে তিন লাখের বেশি যাত্রী:
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তথ্য অনুযায়ী, পদ্মা সেতু চালুর পর থেকেই যশোর বিমানবন্দরে যাত্রী সংখ্যা কমতে শুরু করে। ২০২১-২২ অর্থবছরে এই বিমানবন্দর দিয়ে যাতায়াত করেন ৪ লাখ ৫ হাজার ৯০০ যাত্রী। এর মধ্যে ঢাকা থেকে যশোরে যান ২ লাখ ১ হাজার ৬৯১ জন এবং যশোর থেকে ঢাকায় আসেন ২ লাখ ৪ হাজার ২০৯ জন।
তবে পরবর্তী অর্থবছরেই যাত্রী সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে যাত্রী সংখ্যা নেমে আসে ২ লাখ ২১ হাজার ৭০ জনে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যশোর বিমানবন্দরের যাত্রী সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪৮ হাজার ৪০৮ জনে। অর্থাৎ চার অর্থবছরের ব্যবধানে যাত্রী কমেছে সাড়ে তিন লাখের বেশি।
সড়ক ও রেল যোগাযোগে বদলে গেছে হিসাব:
যশোরের বাসিন্দাদের অনেকেই বলছেন, পদ্মা সেতু চালুর আগে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগে বড় বাধা ছিল নদী পারাপার। বিশেষ করে ফেরিঘাটে দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে অনেকেই বাধ্য হয়ে বিমানে যাতায়াত করতেন।
ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জামিল খান বলেন, আগে সড়কপথে যশোর যেতে অনেক সময় লাগত। ফেরির জন্য অপেক্ষাও করতে হতো। তাই সামর্থ্যবান অনেক মানুষ বিমান ব্যবহার করতেন। কিন্তু পদ্মা সেতু চালুর পর অল্প সময়েই সড়কপথে যাতায়াত সম্ভব হচ্ছে। ফলে বিমান ব্যবহারের প্রয়োজন কমে গেছে।
একই কথা বলছেন ট্রাভেল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও। ঢাকার উত্তরার একটি ট্রাভেল এজেন্সির স্বত্বাধিকারী সামিউল ইসলাম জানান, আগে যশোরগামী অনেক যাত্রী বিমান টিকিট নিতেন। তাদের বড় অংশের ব্যক্তিগত গাড়ি রয়েছে। এখন তারা পরিবার নিয়ে নিজেদের গাড়িতে যাতায়াত করছেন। তার ভাষ্য, বিমানের একমুখী ভাড়া যেখানে প্রায় সাড়ে চার হাজার টাকা, সেখানে ব্যক্তিগত গাড়িতে তুলনামূলক কম খরচে পুরো পরিবার নিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে।
বরিশালেও একই চিত্র:
পদ্মা সেতুর প্রভাব শুধু যশোরে নয়, পড়েছে বরিশাল বিমানবন্দরেও। যাত্রী সংকটের কারণে সেখান থেকেও বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলো ধীরে ধীরে ফ্লাইট কমিয়ে দিয়েছে। বর্তমানে বরিশাল রুটে সপ্তাহে মাত্র তিনটি ফ্লাইট পরিচালনা করছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স।
বিমান খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, সিলেট, সৈয়দপুর ও যশোর—এই পাঁচটি অভ্যন্তরীণ রুটে একসময় যাত্রী চাপ ছিল বেশি। কিন্তু পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের যাতায়াত সহজ হয়ে যায়। পরে পদ্মা সেতু হয়ে রেল যোগাযোগ চালু এবং ঢাকা-যশোর সরাসরি ট্রেন চলাচল শুরু হওয়ায় আকাশপথের ওপর নির্ভরতা আরও কমে যায়।
লোকসানেও ফ্লাইট চালাচ্ছে বিমান:
বেসরকারি সংস্থাগুলো বাণিজ্যিক বিবেচনায় ফ্লাইট বন্ধ করলেও সরকারি প্রতিষ্ঠান বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এখনো যশোর রুট চালু রেখেছে।
বিমান সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, যশোর ও বরিশাল রুটে লোকসান দিয়েই ফ্লাইট পরিচালনা করছে বিমান। সপ্তাহে কয়েকটি ফ্লাইট চললেও ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ আসন খালি থাকছে। তবে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের আকাশপথের যোগাযোগ ধরে রাখতে এসব রুট চালু রাখা হয়েছে।
যশোর বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক মো. আইয়ুব আলী বলেন, কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন এয়ারলাইন্স প্রতিষ্ঠান একে একে ফ্লাইট কমিয়েছে। তারা চিঠিতে বাণিজ্যিক কারণ দেখিয়ে ফ্লাইট বন্ধের কথা জানিয়েছে।
তিনি বলেন, বিমানবন্দরের সেবা কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। বর্তমানে প্রতি মঙ্গলবার ও শুক্রবার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের দুটি ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে। যাত্রীদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।

