বাংলাদেশের সাইকেল শিল্প এখন শুধু সংযোজন বা অ্যাসেম্বলিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছে না। বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে স্থানীয়ভাবে যন্ত্রাংশ উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছেন উদ্যোক্তারা। তবে শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর রপ্তানি সুবিধা ধরে রাখতে হলে স্থানীয় মূল্য সংযোজন আরও বাড়াতে হবে।
রপ্তানিকারকদের মতে, এলডিসি সুবিধা শেষ হওয়ার পর নতুন বাণিজ্য নীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে উৎপাদনে দেশীয় উপকরণের ব্যবহার বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। এ লক্ষ্যেই অনেক প্রতিষ্ঠান এখন আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব কারখানায় সাইকেলের বিভিন্ন অংশ তৈরি করছে।
এদিকে দীর্ঘ মন্দার পর দেশের সাইকেল রপ্তানি খাতে কিছুটা গতি ফিরেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে সাইকেল রপ্তানি হয়েছে ১৫ কোটি ১০ লাখ ডলারের। আগের অর্থবছরে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১১ কোটি ৬০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরে রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ।
শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, তুলনামূলক কম খরচে পণ্য তৈরি এবং ইউরোপের বাজারে দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক—এসব কারণে রপ্তানি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে।
তবে আরএফএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরএন পল মনে করেন, বর্তমান প্রবৃদ্ধি পুরোপুরি বাজার পুনরুদ্ধারের চিত্র নয়। বরং গত বছরের দুর্বল অবস্থার তুলনায় কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তিনি বলেন, “রপ্তানি বেড়েছে ঠিকই, তবে ২০২২ সালসহ তিন-চার বছর আগের অবস্থানে এখনো ফিরতে পারেনি বাজার। এটি বড় ধরনের উত্থান নয়, বরং খারাপ পরিস্থিতি থেকে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়া।”
তার মতে, নতুন কোনো বড় বাজার তৈরি হওয়ার কারণে নয়, বরং দীর্ঘ সময়ের স্থবিরতার পর কিছু পুরোনো বিদেশি ক্রেতা আবার অর্ডার দেওয়া শুরু করায় রপ্তানি বাড়ছে। আরএন পল বলেন, বিশ্ববাজারে সাধারণ সাইকেলের চাহিদা আগের মতো নেই। অনেক ক্রেতা এখন বৈদ্যুতিক সাইকেলের (ই-বাইক) দিকে ঝুঁকছেন। তবে ই-বাইকের দাম সাধারণ সাইকেলের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি হওয়ায় বাজারের বিস্তার প্রত্যাশামতো হচ্ছে না। তিনি বলেন, “ই-বাইকের দিকে পরিবর্তন শুরু হয়েছে, কিন্তু এর বিক্রি এখনো প্রত্যাশিত গতিতে বাড়ছে না।” আরএফএল দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে ই-বাইক বাজারজাত শুরু করেছে বলেও জানান তিনি। তবে এখনো এর চাহিদা সীমিত।
স্থানীয় উৎপাদনে বাড়ছে বিনিয়োগ:
চাহিদার ধীরগতির মধ্যেও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে স্থানীয় উৎপাদন বাড়াচ্ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। মেঘনা গ্রুপ অব কোম্পানিজের টায়ার বিভাগের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা মো. লুৎফুল বারী বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠান সাইকেলের অধিকাংশ যন্ত্রাংশ দেশেই তৈরি করে। এর মধ্যে রয়েছে ফ্রেম, ফর্ক, রিম, টায়ার, টিউব, প্যাডেল, স্যাডেল, হ্যান্ডেলবার ও গ্রিপ।
তবে কিছু বিশেষ ধরনের উপকরণ এখনো আমদানি করতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে বিশেষায়িত রং এবং মাল্টি-গিয়ার সাইকেলের জন্য জাপানি ব্র্যান্ডের গিয়ার সিস্টেম। তিনি জানান, বাংলাদেশে বিশেষ ধরনের সাইকেল রং উৎপাদন হয় না। এটি আমদানি করতে প্রায় ৬০ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়, ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদার কারণে মাল্টি-গিয়ার সাইকেলে পরিচিত ব্র্যান্ডের গিয়ার ব্যবহার করা হয়। এজন্য এসব যন্ত্রাংশ আমদানি করতে হয়। লুৎফুল বারীর ভাষ্য অনুযায়ী, সাইকেলের ধরন ও বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে তাদের প্রতিষ্ঠানে স্থানীয় মূল্য সংযোজনের হার ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত।
মেঘনা গ্রুপের সাইকেল রপ্তানিতে ধীরে ধীরে গতি ফিরছে। প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে বড় বাজার জার্মানি। এরপর রয়েছে ডেনমার্ক। ইউরোপের নতুন বাজারেও প্রবেশের চেষ্টা করছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে ইতালিতে রপ্তানি কিছুটা কমেছে। তিনি বলেন, “রপ্তানি আদেশ ধীরে ধীরে বাড়ছে। আশা করছি, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা আরও ফিরবে।”
মেঘনা কয়েক বছর আগে কার্বন ফাইবারের উন্নত মানের ফ্রেম ও ফর্ক উৎপাদন শুরু করেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, দক্ষিণ এশিয়ায় তারাই প্রথম এ ধরনের উৎপাদন শুরু করে। শিগগিরই সম্পূর্ণ কার্বন ফাইবার সাইকেল উৎপাদনের পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের।
এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিতে নতুন বিনিয়োগ:
এলডিসি পরবর্তী বাণিজ্য পরিস্থিতি মাথায় রেখে নতুন উদ্যোক্তারাও বড় বিনিয়োগ করছেন। নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আকিজ বাইসাইকেল ইন্ডাস্ট্রিজ স্থানীয় মূল্য সংযোজন বাড়ানোর কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ জয়নুল আবেদিন জানান, দুই বছর ধরে উৎপাদন অবকাঠামো তৈরির পর চলতি বছরের মার্চ থেকে তারা সাইকেল রপ্তানি শুরু করেছেন। তিনি বলেন, “এখন পর্যন্ত নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড ও জার্মানিতে সাইকেল রপ্তানি করেছি। বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে ভালো সাড়া পাচ্ছি এবং হাতে বেশ কিছু রপ্তানি আদেশ রয়েছে।”
চলতি বছর প্রায় এক লাখ সাইকেল রপ্তানির লক্ষ্য রয়েছে বলে জানান তিনি। টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে সাইকেল উৎপাদন প্রকল্পে জমি কেনা ও কারখানা উন্নয়নে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে আকিজ। জয়নুল আবেদিন বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর রপ্তানি সুবিধা ধরে রাখতে স্থানীয় মূল্য সংযোজন বাড়ানো এখন বড় কৌশলগত বিষয়।
তিনি বলেন, “বর্তমানে প্রায় ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজন থাকলেই রপ্তানি সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে। এলডিসি উত্তরণের পর এ হার প্রায় ৫০ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। এজন্য আমরা টায়ার উৎপাদনে বিনিয়োগ করছি। আগামী বছর বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হলে স্থানীয় মূল্য সংযোজন আরও বাড়বে।” বর্তমানে আকিজের কারখানায় প্রায় ৮০০ শ্রমিক কাজ করছেন। বছরের শেষ নাগাদ এ সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে যাবে বলে জানান তিনি।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের সাইকেল খাতের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো এলডিসি পরবর্তী বাজারে টিকে থাকা। এজন্য শুধু রপ্তানি বাড়ানো নয়, উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে দেশীয় সক্ষমতা তৈরি করাই হবে ভবিষ্যতের মূল লক্ষ্য।

