ঢাকার সঙ্গে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ আরও দ্রুত, নিরাপদ ও আধুনিক করতে নেওয়া হয়েছিল ‘সাসেক ঢাকা-সিলেট করিডোর সড়ক উন্নয়ন’ প্রকল্প। কিন্তু বড় এই অবকাঠামো প্রকল্প এখন নিজেই আটকে আছে নানা জটিলতায়। মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এসেও কাজের গতি আশানুরূপ নয়। প্রকল্পের প্রায় ৮৯ শতাংশ সময় শেষ হলেও ভৌত অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে মাত্র ২১ শতাংশে।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে প্রকল্পটির ধীরগতি, পরিকল্পনার দুর্বলতা এবং সমন্বয়হীনতার নানা চিত্র। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুরুতেই পর্যাপ্ত কারিগরি প্রস্তুতি না নেওয়া, মাটির নিচের অবস্থা যথাযথভাবে যাচাই না করা এবং ইউটিলিটি লাইনের তথ্য সংগ্রহে ঘাটতির কারণে বাস্তবায়ন পর্যায়ে বড় সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে নেওয়া এই প্রকল্পের আওতায় নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর থেকে সিলেট পর্যন্ত ২০৯ দশমিক ৩২৮ কিলোমিটার মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর সঙ্গে থাকছে সার্ভিস লেন, সেতু, কালভার্ট, ফ্লাইওভারসহ বিভিন্ন অবকাঠামো।
প্রকল্পটির কাজ শুরু হয় ২০২১ সালের জানুয়ারিতে। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে এটি শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু সময় শেষ হওয়ার পথে থাকলেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়ায় প্রকল্পটি নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের দুই পাশে এবং মাটির নিচে ছড়িয়ে রয়েছে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও টেলিফোনসহ বিভিন্ন ইউটিলিটি লাইন। এসব লাইন স্থানান্তরের বিষয়টি শুরুতেই পর্যাপ্তভাবে চিহ্নিত না করায় নির্মাণকাজ বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে প্রয়োজনীয় সমীক্ষা ও মাটির নিচের স্তর পরীক্ষা যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়নি। ফলে নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পর অনেক জায়গায় নতুন করে সমস্যা দেখা দেয়। কোথাও মাটি ভারবহন উপযোগী নয়, কোথাও পাওয়া যাচ্ছে অপ্রত্যাশিত কাদামাটি। এসব কারণে নকশায় পরিবর্তন আনতে হচ্ছে, বাড়ছে সময় ও ব্যয়।
প্রকল্পের মূল সড়ক নির্মাণের অগ্রগতি এখন পর্যন্ত মাত্র ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ। সার্ভিস লেনের কাজ হয়েছে ১৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ। তুলনামূলকভাবে সেতু নির্মাণে অগ্রগতি ৩১ দশমিক ১৪ শতাংশ এবং কালভার্ট নির্মাণে ৫৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ।
তবে সেতু ও কালভার্টের কাজ কিছুটা এগিয়েছে, কারণ এসব স্থানের অনেকগুলো আগে থেকেই আংশিকভাবে প্রস্তুত ছিল। অন্যদিকে ফ্লাইওভার ও ওভারপাস নির্মাণের অগ্রগতি মাত্র ৩০ দশমিক ৭৭ শতাংশ। সড়ক নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইউটার্ন, রাউন্ডঅ্যাবাউট ও ফুটওভারব্রিজ নির্মাণের কাজ এখনো শুরু হয়নি।
বিদ্যুৎ-গ্যাস লাইন স্থানান্তরে দীর্ঘসূত্রতা:
প্রকল্পের সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে ইউটিলিটি স্থানান্তর। আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ লাইনের স্থানান্তর কাজ কিছুটা এগোলেও গ্যাস পাইপলাইন স্থানান্তরে বড় ধরনের ধীরগতি রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদ্যুৎ সংক্রান্ত ইউটিলিটি স্থানান্তরের অগ্রগতি প্রায় ৪৬ দশমিক ২০ শতাংশ। কিন্তু তিতাস গ্যাসের পাইপলাইন স্থানান্তরের কাজ হয়েছে মাত্র ০ দশমিক ৭৮ শতাংশ। জালালাবাদ গ্যাসের ক্ষেত্রে অগ্রগতি ১৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ। গ্যাস ও বিদ্যুৎ লাইনের কারণে সড়কের বিভিন্ন অংশে নির্মাণকাজ শুরু করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে ফ্লাইওভার, ফুটওভারব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় পাইলিং কাজে বাধা তৈরি হচ্ছে।
আইএমইডি মনে করছে, ইউটিলিটি স্থানান্তরের গতি বাড়াতে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, তিতাস গ্যাস ও জালালাবাদ গ্যাসের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। প্রতিটি সংস্থায় প্রকল্পের জন্য নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা থাকলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ দ্রুত হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ লাইন সরানোর ক্ষেত্রে অনুমোদন, অর্থ পরিশোধ, রাস্তা খননের অনুমতি এবং মাঠপর্যায়ের কারিগরি সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একটি সংস্থার কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত অন্য সংস্থার কাজ শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না।
সচল বিদ্যুৎ লাইনে কাজ করতে হলে প্রয়োজন হয় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিদ্যুৎ বন্ধ রাখার অনুমোদন। কিন্তু সেই অনুমোদন পেতে দেরি হওয়ায় মাঠপর্যায়ের কাজ থেমে থাকে।
শিল্পাঞ্চল হওয়ায় অনেক জায়গায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে কাজ করার অনুমতি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে পুরো লাইন পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া যাচ্ছে না।

