চট্টগ্রামে সংকটে থাকা ২১টি তৈরি পোশাক কারখানা পুনরুজ্জীবিত করতে নতুন পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। আর্থিক সংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও ব্যবসায়িক জটিলতায় বন্ধ হয়ে যাওয়া এসব কারখানাকে আবার উৎপাদনে ফেরাতে সরকারি বন্ধ শিল্প-কারখানার অব্যবহৃত বা লিজ দেওয়া জায়গায় মাল্টি-ফ্যাক্টরি হাব গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি।
বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম অঞ্চলে তাদের সদস্যভুক্ত ২১টি তৈরি পোশাক কারখানা বর্তমানে বড় ধরনের আর্থিক সংকটের মধ্যে রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোতেই উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে, আবার কিছু কারখানা চলছে সীমিত পরিসরে।
সংগঠনটির মতে, ভাড়া করা ভবনে কারখানা পরিচালনা, পর্যাপ্ত কার্যকরী মূলধনের অভাব, ব্যাংকিং জটিলতা, ঋণসংক্রান্ত নেতিবাচক প্রতিবেদন, আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা এবং কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির কারণে এসব প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে।
বিজিএমইএর হিসাব বলছে, সংকটে থাকা ২১টি কারখানার বিপরীতে নেওয়া ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৯৭৬ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। তবে এখনো প্রায় ৫৫০ কোটি টাকার ঋণ মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। কারখানাভেদে ঋণের পরিমাণে রয়েছে বড় পার্থক্য। কোনো প্রতিষ্ঠানের ঋণ যেখানে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা, সেখানে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের দায় দাঁড়িয়েছে ৫১৫ কোটি ৬৫ লাখ টাকা পর্যন্ত। এই পরিস্থিতিতে কারখানাগুলোকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দিতে বন্ধ বা বেসরকারীকরণের অপেক্ষায় থাকা সরকারি শিল্প প্লট ব্যবহারের সুযোগ চেয়েছে বিজিএমইএ।
বিজিএমইএ নেতারা বলছেন, চট্টগ্রামে অধিকাংশ কারখানা ভাড়া করা ভবনে পরিচালিত হচ্ছে। এতে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী নিরাপত্তা, পরিবেশ ও অন্যান্য মানদণ্ড বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। তাদের মতে, মিরসরাইসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলে স্থানান্তরের সুযোগ থাকলেও ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সেখানে নতুন করে বিনিয়োগ করা ব্যয়বহুল। ফলে কম খরচে বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে কারখানাগুলোকে পুনরায় চালু করাই কার্যকর সমাধান হতে পারে।
বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি এস এম আবু তৈয়ব বলেন, দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামে থাকায় এখান থেকে পোশাক রপ্তানিতে সময় ও পরিবহন ব্যয় কমানোর বড় সুযোগ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে নতুন কারখানা গড়ে ওঠার পরিবর্তে অনেক প্রতিষ্ঠান অন্য অঞ্চলে চলে যাচ্ছে। তিনি বলেন, চট্টগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে পোশাক কারখানা সংকুচিত হওয়ার বিষয়টি আন্তর্জাতিক বাজারে নেতিবাচক বার্তা তৈরি করছে। একই সঙ্গে এটি আঞ্চলিক অর্থনীতির জন্যও উদ্বেগের কারণ।
বিজিএমইএর পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রামের বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য বিনিয়োগের সুযোগ এখনো পর্যাপ্ত সহজ নয়। অনেক ক্ষেত্রে কঠিন শর্ত ও জটিল প্রক্রিয়ার কারণে ব্যবসায়ীরা আগ্রহ হারাচ্ছেন।
তার মতে, সহজ শর্তে জমি ও প্রয়োজনীয় সুবিধা দেওয়া হলে চট্টগ্রামে তৈরি পোশাক শিল্প আরও সম্প্রসারিত হতে পারত। বরং বর্তমানে অনেক কারখানা বন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে।
তিনি বলেন, স্থানীয় উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার দিয়ে অর্থনৈতিক অঞ্চলের নীতিমালা সহজ করা হলে চট্টগ্রামে নতুন বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি হবে। এতে শুধু পোশাক শিল্প নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিও লাভবান হবে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের আশা, সরকারি সহযোগিতা পাওয়া গেলে মাল্টি-ফ্যাক্টরি হাবের মাধ্যমে বন্ধ কারখানাগুলো আবার উৎপাদনে ফিরতে পারবে। পাশাপাশি চট্টগ্রামের পোশাক শিল্পের হারানো গতি ফিরিয়ে আনারও সুযোগ তৈরি হবে।

