সরকারি ভবন নির্মাণ প্রকল্পে আমদানি করা পণ্যের পরিবর্তে দেশীয়ভাবে তৈরি টাইলস ও লিফট ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছে সরকার। দেশের শিল্প খাতকে শক্তিশালী করা এবং স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের নথি অনুযায়ী, গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে বিষয়টি বাস্তবায়নের জন্য সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগে নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন দেশীয় নির্মাণসামগ্রী উৎপাদনকারীরা। তাদের মতে, সরকারি ক্রয়ে স্থানীয় পণ্যের ব্যবহার বাড়লে শিল্পে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
দেশীয় পণ্য ব্যবহারের বিষয়টি অবশ্য নতুন নয়। সরকারি ক্রয় নীতিতেও স্থানীয় উৎপাদনকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা আছে। এর আগে পদ্মা সেতু ও ঢাকা মেট্রোরেলসহ বড় প্রকল্পে দেশীয় প্রতিষ্ঠান থেকে বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ করা হয়েছে। তবে এবারের নির্দেশনায় বিশেষভাবে লিফট ও টাইলস খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ, বর্তমানে এই দুই খাতেই চাহিদা কমে যাওয়া এবং সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের গতি ধীর হওয়ায় উৎপাদকরা চাপের মধ্যে রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, সরকারি ক্রয় স্থানীয় শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে। অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে বড় বিনিয়োগ করলেও বাজারে চাহিদার ঘাটতি এবং আমদানিকৃত পণ্যের প্রতিযোগিতার কারণে তারা সমস্যায় পড়ছে।
তিনি বলেন, ঢাকার তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো জাপানি ঠিকাদারের নির্ধারিত মান অনুযায়ী সিমেন্ট, ইস্পাত, ইট ও বালুসহ বিভিন্ন উপকরণ সরবরাহ করেছে। এতে প্রমাণ হয়েছে, মান বজায় রেখে দেশীয় শিল্পও বড় প্রকল্পের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম। তার মতে, বিশ্বমানের অবকাঠামো নির্মাণ করতে হলে স্থানীয় শিল্পকে আন্তর্জাতিক মান অর্জনের সুযোগ দিতে হবে। স্থানীয় প্রতিষ্ঠান যদি নির্ধারিত মান অনুযায়ী পণ্য উৎপাদন করতে পারে, তাহলে অপ্রয়োজনীয় আমদানির প্রয়োজন নেই।
তিনি আরও বলেন, উচ্চমূল্যের প্রযুক্তিপণ্য যেমন লিফটের ক্ষেত্রে দেশে সংযোজন সক্ষমতা বাড়ানো দরকার। বিদেশ থেকে পুরোপুরি তৈরি লিফট আনার পরিবর্তে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমদানি করে দেশে সংযোজন করা হলে খরচ কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে প্রযুক্তি জ্ঞান ও দক্ষতাও বাড়বে।
লিফট উৎপাদনে সক্ষম দেশীয় প্রতিষ্ঠান:
দেশের বড় লিফট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, সরকারি প্রকল্পের চাহিদা পূরণের মতো সক্ষমতা তাদের রয়েছে। আরএফএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরএন পল জানান, তাদের প্রতিষ্ঠান যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের বিভিন্ন ধরনের লিফটসহ মাসে প্রায় ১০০টি লিফট উৎপাদন করতে পারে।
অন্যদিকে ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজের মাসিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৬০টি লিফট। দুই প্রতিষ্ঠান মিলে মাসে প্রায় ১৬০টি লিফট উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। যেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মাসিক প্রয়োজন ৫০টিরও কম। আরএন পল বলেন, দেশীয় লিফট ব্যবহার করলে সরকারি প্রকল্পের ব্যয় অন্তত ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দেশের অভ্যন্তরে মূল্য সংযোজন বাড়বে। ওয়ালটন হাই-টেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম মাহবুবুল আলম বলেন, তাদের তৈরি লিফট ইতোমধ্যে শ্রীলঙ্কায় রপ্তানি হচ্ছে।
তিনি বলেন, সরকারি প্রকল্পে দেশীয় লিফটের পাশাপাশি কেবল, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, ভিআরএফ ব্যবস্থা ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ব্যবহার করা হলে এসব পণ্যের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। এতে ভবিষ্যতে রপ্তানির নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
টাইলস শিল্পেও নতুন আশার আলো:
দেশের সিরামিক শিল্পের উদ্যোক্তারাও একনেকের সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, বাংলাদেশের টাইলস, স্যানিটারি পণ্য ও টেবিলওয়্যার শিল্প এখন আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছেছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান বিদেশেও পণ্য রপ্তানি করছে। তারা বলছেন, মানের দিক থেকে দেশীয় টাইলস এখন আর পিছিয়ে নেই। তারপরও সরকারি প্রকল্পে দীর্ঘদিন ধরে আমদানিকৃত পণ্যের ব্যবহার বেশি ছিল।
এক্স সিরামিক গ্রুপের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মামুনুর রশীদ বলেন, নতুন সিদ্ধান্তে স্থানীয় টাইলসের চাহিদা বাড়বে। বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে কাজ করছে এবং ঋণের কিস্তি ও পরিচালন ব্যয় মেটাতে মূল্যছাড় দিতে বাধ্য হচ্ছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের আবহাওয়ার জন্য দেশীয় টাইলস বেশি উপযোগী এবং অনেক আমদানিকৃত পণ্যের তুলনায় এর মানও ভালো। মামুনুর রশীদ বলেন, “এটি স্থানীয় উৎপাদকদের জন্য ভালো খবর। আমদানি কমলে দেশীয় টাইলসের বাজার বাড়বে।”
নির্মাণসামগ্রী খাতের অন্যান্য উদ্যোক্তারাও সরকারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের মতে, দেশীয় পণ্যের ব্যবহার বাড়লে অর্থ দেশের মধ্যেই থাকবে, রাজস্ব আয় বাড়বে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
বিআরবি কেবল ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক (বিপণন ও বিক্রয়) মো. রফিকুল ইসলাম রনি বলেন, স্থানীয় পণ্য আমদানির বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হলে দেশের অর্থনীতি লাভবান হবে। এতে শিল্পের বিকাশ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশীয় উৎপাদন বাড়বে। তিনি বলেন, দেশের কেবল উৎপাদনকারীরা স্থানীয় চাহিদা পূরণে সক্ষম। আমদানিকৃত পণ্য সবসময় উন্নত—এমন ধারণা সঠিক নয়; অনেক ক্ষেত্রে দেশীয় পণ্যের মান আরও ভালো।

