পরিবর্তিত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে টিকে থাকতে নতুন সম্ভাবনাময় খাত খুঁজছে বাংলাদেশ। দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাক শিল্প ও প্রবাসী আয়ের ওপর দেশের অর্থনীতি বড়ভাবে নির্ভরশীল। তবে ভবিষ্যতে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে প্রচলিত খাতের পাশাপাশি নতুন অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি জরুরি হয়ে উঠেছে। সেই সম্ভাবনার জায়গা থেকেই ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ বা সৃজনশীল অর্থনীতির বিষয়টি সামনে এসেছে।
জুন মাসে জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী সৃজনশীল অর্থনীতির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। এরপর থেকেই বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দেশের অর্থনীতিকে বহুমুখী করতে হলে মেধা, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনভিত্তিক খাতগুলোর বিকাশে গুরুত্ব দিতে হবে।
ক্রিয়েটিভ ইকোনমি বলতে বোঝায় মানুষের জ্ঞান, সৃজনশীলতা, কল্পনাশক্তি ও সাংস্কৃতিক সক্ষমতাকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করা। এর মাধ্যমে নতুন পণ্য ও সেবা তৈরি হয়, সৃষ্টি হয় কর্মসংস্থান এবং বাড়ে আয়ের নতুন সুযোগ। বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে এই খাতকে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গড়ে তুলেছে।
বাংলাদেশের জন্যও এই খাত নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে। কারণ তরুণ জনগোষ্ঠী, প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য দেশের সৃজনশীল অর্থনীতির বড় শক্তি হতে পারে। শিল্প, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম, বিনোদন, ডিজাইন, প্রকাশনা, বিজ্ঞাপন, সফটওয়্যার ও ডিজিটাল সেবাসহ নানা ক্ষেত্র এই অর্থনীতির আওতায় পড়ে।
তবে শুধু নীতিগত ঘোষণা দিলেই সৃজনশীল অর্থনীতি বিকশিত হবে না। এ জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দক্ষতা উন্নয়ন, বিনিয়োগের সুযোগ এবং উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক পরিবেশ। সরকারের উদ্যোগ যেন কেবল সভা-সেমিনার বা নীতিপত্রে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং বাস্তব কর্মপরিকল্পনায় রূপ নেয়—এটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সৃজনশীল অর্থনীতিকে শুধু শিল্প ও সংস্কৃতির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রাখলে এর সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাবে না। আধুনিক বিশ্বে প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতার সমন্বয়েই নতুন অর্থনৈতিক শক্তি তৈরি হচ্ছে। তাই এই খাতকে বৃহত্তর অর্থনৈতিক কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
তবে এই খাতের বিকাশে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। সৃজনশীল ক্ষেত্র যেন রাজনৈতিক বা অন্য কোনো স্বার্থে ব্যবহৃত না হয়, সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ সৃজনশীল অর্থনীতির মূল শক্তি হলো স্বাধীন চিন্তা, উদ্ভাবন ও বৈচিত্র্য।
বিশ্ব অর্থনীতিতে এখন জ্ঞান ও সৃজনশীলতার গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। এক দেশের সংস্কৃতি, প্রযুক্তি ও চিন্তার সঙ্গে অন্য দেশের আদান-প্রদান নতুন সুযোগ তৈরি করছে। বাংলাদেশকেও এই বৈশ্বিক প্রবাহের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে। দেশের মেধাবী তরুণদের সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারলে সৃজনশীল অর্থনীতি ভবিষ্যতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও কর্মসংস্থানের একটি বড় উৎস হয়ে উঠতে পারে। তবে এটি কেবল একটি আকর্ষণীয় ধারণা, নাকি বাস্তব অর্থনৈতিক সম্ভাবনা—তা নির্ভর করবে কার্যকর উদ্যোগ, সঠিক পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের ওপর।
সৃজনশীল অর্থনীতি বা ক্রিয়েটিভ ইকোনমির বিকাশে শুধু প্রতিভা ও সম্ভাবনা থাকলেই হবে না, প্রয়োজন শক্তিশালী অবকাঠামো এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনা। মানসম্মত অবকাঠামো তৈরিতে বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন হলেও সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তা দীর্ঘমেয়াদে আয় ও রাজস্বের বড় উৎস হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে সৃজনশীল খাতকে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করেছে। লন্ডন এর অন্যতম উদাহরণ। সেখানে সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল অবকাঠামোকে পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিচালনা করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশেও ক্রিয়েটিভ ইকোনমির অবকাঠামো নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তবে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, এর পরিচালন কাঠামো নিয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ দক্ষ ব্যবস্থাপনা ছাড়া বড় স্থাপনাও দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না।
এ ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের বিভিন্ন মডেল কাজে লাগানো যেতে পারে। দেশের কিছু প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে এমন ব্যবস্থাপনার উদাহরণ তৈরি করেছে। হোটেল সোনারগাঁও এবং হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকা–এর মতো প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কাঠামো দেখায়, সঠিক ব্যবস্থাপনায় সরকারি সম্পদও বাণিজ্যিকভাবে সফল করা সম্ভব।
অন্যদিকে কিছু সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এখনো প্রচলিত আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হচ্ছে। ফলে সেগুলোর সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি বা বিভিন্ন সরকারি উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত সাংস্কৃতিক কার্যক্রম থাকলেও সেগুলোকে রাজস্ব আয়, দর্শক ব্যবস্থাপনা ও টেকসই অর্থনৈতিক মডেলের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।
ক্রিয়েটিভ ইকোনমির ক্ষেত্রে শুধু সরকারি কর্মকর্তা বা অস্থায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মাধ্যমে পরিচালনা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর নাও হতে পারে। কারণ এ ধরনের খাতে প্রয়োজন বিশেষায়িত দক্ষতা, বাজার সম্পর্কে ধারণা এবং সৃজনশীল ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা। এ খাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্র্যান্ডিং। বাংলাদেশের সংস্কৃতি, সৃজনশীল পণ্য ও মেধাভিত্তিক সেবাকে আন্তর্জাতিক বাজারে তুলে ধরতে শক্তিশালী ব্র্যান্ড পরিচিতি তৈরি করতে হবে। এ জন্য সরকারের নীতিগত সহায়তাও প্রয়োজন।
বিশেষ করে করনীতি, মেধাস্বত্ব বা ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি অধিকার এবং লাইসেন্সিং ব্যবস্থায় সংস্কার জরুরি। কারণ সৃজনশীল শিল্পের বড় শক্তি হলো মানুষের মেধা ও সৃষ্টিশীলতা। সেই সৃষ্টির ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে কপিরাইট সুরক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক, শিল্পী, নির্মাতা ও অন্যান্য সৃজনশীল পেশাজীবীরা যেন তাদের কাজের জন্য যথাযথ রয়্যালটি পান, সে জন্য কার্যকর মেধাস্বত্ব ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। পাশাপাশি লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ করাও জরুরি। কর, কপিরাইট ও লাইসেন্সিং—এই তিনটি বিষয়ে সমন্বিত নীতি তৈরি করতে পারলে বাংলাদেশের সৃজনশীল অর্থনীতি শক্তিশালী ভিত্তি পেতে পারে। তখন এটি শুধু সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও বৈদেশিক আয়ের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে সক্ষম হবে।
সৃজনশীল অর্থনীতি বা ক্রিয়েটিভ ইকোনমিকে শুধু শিল্পী, নির্মাতা বা সৃজনশীল ব্যক্তিদের কর্মক্ষেত্র হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত সম্ভাবনা বোঝা যাবে না। এই খাতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত সৃজনশীল কর্মীদের পাশাপাশি পর্দার আড়ালে কাজ করা বিপুল সংখ্যক মানুষের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনা নিয়ে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।
ক্রিয়েটিভ ইকোনমিতে কর্মসংস্থানের পরিধি অনেক বিস্তৃত। শিল্পী, লেখক, ডিজাইনার, নির্মাতা কিংবা উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি প্রযুক্তিবিদ, ব্যবস্থাপক, প্রযোজনা কর্মী, বিপণনকর্মীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ এই খাতের অংশ। ফলে সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশ হলে নতুন ধরনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে এই খাতকে এগিয়ে নিতে দক্ষ জনবল তৈরি বড় চ্যালেঞ্জ। সৃজনশীল কাজের সঙ্গে যুক্ত অনেকের যেমন আধুনিক দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে, তেমনি পর্দার আড়ালে কাজ করা সহায়ক কর্মীদের ক্ষেত্রেও রয়েছে দক্ষতার সংকট। তাই শুধু প্রতিভা নয়, প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং বাজার উপযোগী দক্ষতা উন্নয়ন।
ক্রিয়েটিভ ইকোনমির জন্য দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং খাতসংশ্লিষ্টদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কোন ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন, কোথায় ঘাটতি রয়েছে এবং কীভাবে তা পূরণ করা যায়—এসব বিষয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা দরকার।
এ ছাড়া এই খাতের সাংগঠনিক কাঠামো নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে। সৃজনশীল অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষা, নীতিগত সহায়তা এবং কার্যকর সমন্বয়ের জন্য একটি শক্তিশালী কাঠামো প্রয়োজন। সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তব অগ্রগতির জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের অংশগ্রহণ জরুরি।
বাংলাদেশের মতো দেশে অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোগ থাকলেও বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব প্রায়ই বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই ক্রিয়েটিভ ইকোনমির ক্ষেত্রে শুধু সরকারি উদ্যোগের ওপর নির্ভর না করে খাতসংশ্লিষ্টদেরও নিজেদের কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও নির্দিষ্ট প্রস্তাব সরকারের নীতি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ক্রিয়েটিভ ইকোনমি কোনো সাময়িক আলোচনার বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি সম্ভাবনাময় নতুন ক্ষেত্র। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ।
রাষ্ট্র, সৃজনশীল খাতের মানুষ এবং সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশে ক্রিয়েটিভ ইকোনমি শক্তিশালী ভিত্তি পেতে পারে। তখন এটি শুধু সংস্কৃতি বা বিনোদনের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং কর্মসংস্থান, রাজস্ব আয় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।
সৃজনশীল অর্থনীতি বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি নতুন অর্থনৈতিক ধারণা নয়, এটি হতে পারে ভবিষ্যতের একটি বিকল্প পথ। তবে সম্ভাবনা আর বাস্তবতার মধ্যে দূরত্ব কমাতে হলে প্রয়োজন কার্যকর পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি। প্রশ্ন হলো, আমরা কি শুধু সৃজনশীলতার কথা বলব, নাকি সেই সৃজনশীলতাকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়ার মতো পরিবেশও তৈরি করব?

