বিদেশি বিনিয়োগকারী ও দেশীয় ব্যবসায়ীদের সুপারিশের পর ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং খাতের লাইসেন্স নবায়ন নীতিতে পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। নতুন বিধিমালায় এমন ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে, যাতে আগে থেকেই বৈধভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করা শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো লাইসেন্স নবায়নের সুযোগ পায়। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের নীতিগত ও আইনি অনিশ্চয়তা কাটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন বিধানে স্পষ্টতা এলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে। পাশাপাশি বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশও আরও ইতিবাচক হবে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং খাত:
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং খাত। এই খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো আমদানি-রপ্তানি পণ্যের আন্তর্জাতিক পরিবহন, কাস্টমস কার্যক্রম, প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত এবং পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে। দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের গতি ও দক্ষতা অনেকাংশেই নির্ভর করে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের ওপর। বিশেষ করে তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন এনবিআরের:
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, খসড়া ‘ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স বিধিমালা, ২০২৫’ নিয়ে দেশি-বিদেশি অংশীজনদের মতামত পর্যালোচনার জন্য পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। গত ২০ জুলাই এনবিআরের দ্বিতীয় সচিব মো. শাহাদাত জামিলের সই করা অফিস আদেশে এ কমিটি গঠনের কথা জানানো হয়। কমিটিকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে নির্দিষ্ট সুপারিশ জমা দিতে বলা হয়েছে। এসব সুপারিশের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত বিধিমালা তৈরি করা হবে।
কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে এনবিআরের প্রথম সচিব (শুল্ক অব্যাহতি ও প্রকল্প সুবিধা) মিলন শেখকে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন এনবিআরের সদস্য (কাস্টমস নীতি) মো. তারেক হাসান, অতিরিক্ত কমিশনার মহিববুর রহমান ভুঁইয়া এবং দ্বিতীয় সচিব (কাস্টমস মূল্যায়ন) জোবায়দা খানম। সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন দ্বিতীয় সচিব (কাস্টমস মামলা ও বিরোধ নিষ্পত্তি) মো. শাহাদাত জামিল।
বিদেশি প্রতিষ্ঠান নিয়ে তৈরি হয় জটিলতা:
বর্তমানে দেশে প্রায় ১ হাজার ২৬০টি লাইসেন্সধারী ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২০ থেকে ৩০টি বিদেশি বা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক শিপিং লাইন ও বৈশ্বিক ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করছে। জটিলতার শুরু হয় খসড়া ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স বিধিমালা, ২০২৫ প্রকাশের পর। এতে ২০০৮ সালের বিধিমালার আওতায় অনুমোদন পাওয়া শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্স নবায়নের বিষয়ে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা রাখা হয়নি।
এতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। ইউরোপীয় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোও আশঙ্কা প্রকাশ করে, বিষয়টি ভবিষ্যতে প্রশাসনিক জটিলতা ও আইনি বিরোধের কারণ হতে পারে।
বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত, ডেনমার্ক দূতাবাস এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (ইউরোচ্যাম) এনবিআরের কাছে চিঠি দিয়ে লাইসেন্স নবায়নের বিষয়টি স্পষ্ট করার অনুরোধ জানায়।
গত ৬ জুলাই ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার এনবিআর চেয়ারম্যান আহসান হাবিবকে দেওয়া চিঠিতে বলেন, বিষয়টি ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ইস্যু। নীতিগত অনিশ্চয়তা দূর হলে বাংলাদেশে ইউরোপীয় বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ডেনমার্ক দূতাবাসের চিঠিতেও বলা হয়, ২০০৮ সালের বিধিমালা অনুযায়ী শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু ২০১৫ সালের সংশোধনীতে বিদেশি মালিকানার সীমা নির্ধারণ করা হলেও আগে থেকে কার্যরত প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্স নবায়নের বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
গত ২৯ জুন ইউরোচ্যাম বাংলাদেশ এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো চিঠিতে জানায়, পুরোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্স নবায়নের বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন। সংগঠনটির মতে, ২০০৮ সালের বিধিমালার অধীনে অনুমোদন পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে নতুন শর্ত আরোপ করা হলে বিনিয়োগ সুরক্ষার নীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তারা প্রস্তাবিত বিধিমালায় এমন ধারা যুক্ত করার দাবি জানিয়েছে, যাতে আগে থেকে বৈধভাবে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলো আগের নিয়ম অনুযায়ী লাইসেন্স নবায়নের সুযোগ পায়।
বিজিএমইএর একাধিক প্রস্তাব:
ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স বিধিমালা, ২০২৫ নিয়ে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এনবিআরের কাছে বেশ কিছু সংশোধনী প্রস্তাব দিয়েছে। সংগঠনটি জানিয়েছে, আমদানি পণ্যের পরিবহন নথিতে ‘ফ্রেইট প্রিপেয়ার্ড’ উল্লেখ থাকলে গন্তব্যস্থলের কনটেইনার ইয়ার্ড বা কনটেইনার ফ্রেইট স্টেশনে পণ্য পৌঁছানো ও খালাসের জন্য অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা যাবে না।
এ ছাড়া বকেয়া পাওনা বা কোনো বিরোধের কারণে আমদানিকারকদের পণ্য আটকে রাখা যাবে না বলেও মত দিয়েছে সংগঠনটি। বিজিএমইএ আরও বলেছে, নির্ধারিত ডেলিভারি এজেন্টের মাধ্যমে দ্রুত পণ্য খালাস নিশ্চিত করতে একক সেবা ব্যবস্থা চালুর প্রয়োজন রয়েছে।
তবে নতুন করে শতভাগ বিদেশি মালিকানার সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে দেশীয় উদ্যোক্তাদের একটি অংশের আপত্তি রয়েছে। বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাফা) সাবেক সহসভাপতি নুরুল আমিন বলেন, আগে থেকেই বৈধভাবে পরিচালিত বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্স নবায়নে আপত্তির কারণ নেই। তবে নতুন করে এই খাত শতভাগ বিদেশি মালিকানার জন্য উন্মুক্ত করার প্রয়োজন নেই।
তার মতে, বর্তমানে দেশে এই খাতে পর্যাপ্ত দেশীয় উদ্যোক্তা ও দক্ষ জনবল রয়েছে। অন্যদিকে বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সচিব মেজর মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, খসড়া বিধিমালায় একাধিক সংশোধনী প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এসব পরিবর্তন হলে রপ্তানি বাণিজ্যের জটিলতা কমবে এবং ব্যবসায়ীদের হয়রানিও হ্রাস পাবে।
এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, অংশীজনদের মতামত বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সংশ্লিষ্টদের আশা, নতুন বিধিমালায় পুরোনো বৈধ বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য স্পষ্ট বিধান যুক্ত হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের আইনি জটিলতাও কমানো সম্ভব হবে।

