নতুন অর্থবছরের শুরুতেই প্রবাসী আয়ের প্রবাহ ইতিবাচক ধারায় রয়েছে। ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রবণতা অব্যাহত থাকায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। যদিও একই সময়ে আমদানি ব্যয় এবং ডলারের দামের ঊর্ধ্বগতি অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করছে, তবুও প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিক বৃদ্ধি সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ের ২৬ তারিখ পর্যন্ত প্রবাসীরা মোট ২৪৪ কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এটি ৫০ কোটি ডলার বা ২৬ দশমিক ০৭ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ নতুন অর্থবছরের শুরুতেই রেমিট্যান্স প্রবাহে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত মিলছে।
গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে এসেছে ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স। আগের অর্থবছরের তুলনায় যা ৫২৬ কোটি ডলার বা ১৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেশি। এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও রেমিট্যান্স বেড়েছিল ৬৪২ কোটি ডলার, যা ছিল ২৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। টানা দুই অর্থবছর ধরে এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যান্য খাত একই রকম ইতিবাচক অবস্থানে নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত ১১ মাসে আমদানি প্রায় ৬ শতাংশ বেড়েছে, কিন্তু একই সময়ে রপ্তানি আয় ২ শতাংশের বেশি কমেছে। ফলে রেমিট্যান্সই বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে কাজ করছে।
চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের পাওনা বাবদ ১৪৮ কোটি ডলার পরিশোধ করার পরও দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক অবস্থানে রয়েছে। সর্বশেষ হিসাবে গ্রস রিজার্ভ ৩৬ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাবপদ্ধতি অনুযায়ী রিজার্ভ ৩১ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার।
কয়েক বছর আগের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করলে এই উন্নতি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২১ সালের আগস্টে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রথমবারের মতো ৪৮ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করলেও পরবর্তী সময়ে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচারের মতো নানা কারণে রিজার্ভ দ্রুত কমতে থাকে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় তা ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছিল। পরে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হয়। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে রিজার্ভ দাঁড়ায় ৩১ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার, আর জুনের শেষে তা বেড়ে ৩৩ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
তবে ইতিবাচক রেমিট্যান্স প্রবাহের মধ্যেও ডলারের বাজার পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়। গত এক মাসে ডলারের বিনিময় মূল্য প্রায় এক টাকা বেড়েছে। সর্বশেষ আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলার ১২৩ টাকা ৮০ পয়সা দরে লেনদেন হয়েছে, যা আমদানিনির্ভর ব্যবসা ও উৎপাদন খাতের জন্য অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণ হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর পরিবেশ উন্নত হওয়া, অর্থ পাচার রোধে কঠোর নজরদারি এবং সরকারের প্রণোদনা নীতির কারণে প্রবাসীরা আগের তুলনায় বেশি পরিমাণে ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করছেন। এতে একদিকে হুন্ডির ব্যবহার কমছে, অন্যদিকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারও শক্তিশালী হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রেমিট্যান্সের এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে শুধু নগদ প্রণোদনা নয়, প্রবাসী কর্মীদের জন্য আরও সহজ, দ্রুত ও কম খরচে অর্থ পাঠানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং ডলারের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সমন্বিত নীতি গ্রহণ করা গেলে দেশের সামগ্রিক বৈদেশিক মুদ্রা পরিস্থিতি আরও শক্তিশালী হবে।

