দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা গত এক দশকে দ্রুত বেড়েছে। একসময় বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল জাতীয় জীবনের অন্যতম বড় সমস্যা। সেই সংকট মোকাবিলায় বহু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি চাহিদা, জ্বালানি সরবরাহ, সঞ্চালনব্যবস্থা এবং ক্রয়মূল্যের আর্থিক প্রভাব যথাযথভাবে বিবেচনা না করায় এখন সেই সক্ষমতাই বিদ্যুৎ খাতের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে সদ্যবিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ বছরে বিদ্যুৎ খাতে মোট লোকসান হয়েছে ২ লাখ ৫৩ হাজার ৪৮৪ কোটি ৬২ লাখ টাকা। এই অঙ্ক শুধু বিদ্যুৎ খাতের জন্য নয়, পুরো জাতীয় অর্থনীতির জন্যই বড় উদ্বেগের বিষয়।
তুলনা করলে সংকটের গভীরতা আরও পরিষ্কার হয়। ২০০৮-০৯ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত দীর্ঘ ১৩ বছরে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের মোট লোকসান ছিল ৭৭ হাজার ৭৭১ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। অথচ পরবর্তী পাঁচ বছরেই লোকসানের পরিমাণ আড়াই লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ প্রতিবেদনে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরের লোকসান আগের ১৩ বছরের তুলনায় ৩৩০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
এই বিপুল আর্থিক ক্ষতির পেছনে শুধু বিদ্যুতের বিক্রয়মূল্য কম থাকা দায়ী নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপরিকল্পিত উৎপাদন সক্ষমতা, উচ্চ ক্যাপাসিটি চার্জ, জ্বালানি সংকট, কেন্দ্রের কম ব্যবহার, ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি এবং উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় কম পাইকারি মূল্য।
পরিকল্পনা ছাড়াই বেড়েছে উৎপাদন সক্ষমতা
হাসিনা সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে, বিশেষ করে ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে, একের পর এক বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়। সেই সময় দেশে ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ চাহিদা বাড়বে—এমন ধারণার ভিত্তিতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বড় প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু এসব কেন্দ্রের অনুমোদনের সময় বিদ্যুতের প্রকৃত চাহিদা কত দ্রুত বাড়বে, শিল্প খাতে ব্যবহার কী পরিমাণ বাড়বে, নতুন কেন্দ্রগুলোর জন্য পর্যাপ্ত কয়লা ও গ্যাস পাওয়া যাবে কি না এবং উৎপাদিত বিদ্যুৎ সঞ্চালনের সক্ষমতা থাকবে কি না—এসব প্রশ্নের যথেষ্ট সমন্বিত মূল্যায়ন হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুমোদিত কেন্দ্রগুলোর অনেকগুলো ২০২১ সাল থেকে ধীরে ধীরে উৎপাদনে আসতে শুরু করে। ফলে কাগজে-কলমে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়। কিন্তু একই হারে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়েনি। এর ফলে অনেক কেন্দ্রকে বছরের দীর্ঘ সময় বসিয়ে রাখতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন না করলেও চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট অর্থ পরিশোধ করতে হয়। এই অর্থ ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে পরিচিত। অর্থাৎ কেন্দ্র প্রস্তুত থাকলে, বিদ্যুৎ নেওয়া হোক বা না হোক, নির্দিষ্ট ব্যয়ের একটি অংশ সরকারকে দিতে হয়। বহু কেন্দ্রের ক্ষেত্রে এই চার্জ তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ব্যয় দ্রুত বাড়ছে।
উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের ব্যবধান
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বেসরকারি কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনার পর বিতরণ সংস্থাগুলোর কাছে পাইকারি দরে বিক্রি করে। উৎপাদন ও ক্রয়মূল্যের তুলনায় এই পাইকারি মূল্য কম হলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বিক্রিতে লোকসান হয়।
২০২০-২১ অর্থবছরে বিদ্যুতের গড় পাইকারি মূল্য ছিল প্রতি ইউনিট ৫ টাকা ১৭ পয়সা। একই সময়ে উৎপাদন ব্যয় ছিল গড়ে ৬ টাকা ২৭ পয়সা। অর্থাৎ প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বিক্রিতে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের লোকসান ছিল ১ টাকা ১০ পয়সা।
পরের অর্থবছর থেকেই এই ব্যবধান দ্রুত বাড়তে থাকে। ২০২১-২২ অর্থবছরে বিদ্যুতের পাইকারি মূল্য দাঁড়ায় ৬ টাকা ৭০ পয়সা। কিন্তু সে সময় গড় উৎপাদন ব্যয় বেড়ে প্রায় সাড়ে ৮ টাকায় পৌঁছে যায়। ফলে প্রতি ইউনিটে লোকসান প্রায় ২ টাকার কাছাকাছি চলে যায়।
২০২২-২৩ অর্থবছরে গড় উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে ১১ টাকা ৩ পয়সা হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা সামান্য কমে ১০ টাকা ৯৬ পয়সায় দাঁড়ায়। কিন্তু এই স্বস্তি স্থায়ী হয়নি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন ব্যয় আবার বেড়ে প্রতি ইউনিট ১১ টাকা ৮৩ পয়সায় পৌঁছায়।
সদ্যবিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের গড় ব্যয় ১২ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ পাইকারি মূল্য বাড়ানোর পরও উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে বড় ব্যবধান থেকে যাচ্ছে।
দাম বাড়িয়েও কমছে না আর্থিক চাপ
লোকসান কমানোর উদ্যোগ হিসেবে গত জুনে বিদ্যুতের গড় পাইকারি মূল্য প্রতি ইউনিট ৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা করা হয়েছে। এতে পাইকারি মূল্য প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে।
এর আগে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিদ্যুতের পাইকারি দাম ৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে গড় মূল্যহার বাড়িয়ে ৬ টাকা ৭০ পয়সা করা হয়। তারও আগে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে পাইকারি মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ৬ টাকা ২০ পয়সা।
২০২০ সালের মার্চে পাইকারি বিদ্যুতের মূল্য বাড়িয়ে প্রতি ইউনিট ৫ টাকা ১৭ পয়সা করা হয়েছিল।
এভাবে কয়েক ধাপে পাইকারি মূল্য বাড়ানো হলেও উৎপাদন ব্যয় তার চেয়ে দ্রুত বেড়েছে। ফলে মূল্যবৃদ্ধি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের লোকসান কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলেও সমস্যার মূল কারণ দূর করতে পারেনি।
পাইকারি মূল্য বাড়ানোর অর্থ শেষ পর্যন্ত বিতরণ সংস্থাগুলোর ব্যয় বেড়ে যাওয়া। এই বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ খুচরা পর্যায়ে গ্রাহকের ওপরও পড়তে পারে। কিন্তু শুধু বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান করা কঠিন। কারণ কেন্দ্র বসিয়ে রেখে ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া, উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কেনা এবং জ্বালানি সংকটে উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হওয়ার মতো কাঠামোগত সমস্যাগুলো থেকে গেলে লোকসান আবারও বাড়বে।
বছরভিত্তিক লোকসানের চিত্র
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান গত পাঁচ বছরে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।
২০২১-২২ অর্থবছরে বিদ্যুৎ বিক্রি করে সংস্থাটির লোকসান হয় ৪২ হাজার ৭৬৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।
২০২২-২৩ অর্থবছরে লোকসান আরও বেড়ে ৫১ হাজার ৩০০ কোটি ৪৪ লাখ টাকায় পৌঁছায়।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে লোকসান কিছুটা কমে ৪৭ হাজার ৫৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকা হয়।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে আবার বড় ধরনের বৃদ্ধি ঘটে। ওই অর্থবছরে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের লোকসান দাঁড়ায় ৫৫ হাজার ৬৫৮ কোটি ১৩ লাখ টাকা।
সদ্যবিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সাময়িক হিসাবে লোকসান হয়েছে ৫৬ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা, যা এখন পর্যন্ত রেকর্ড সর্বোচ্চ। এই হিসাবে আগের অর্থবছরের তুলনায় লোকসান প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা বাড়তে পারে।
অন্যদিকে, ২০২০-২১ অর্থবছরে লোকসান ছিল মাত্র ১১ হাজার ৬৪৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এই অঙ্ক ছিল আরও কম—৭ হাজার ৪৪৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।
এই পরিসংখ্যান দেখায়, ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক অবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, জ্বালানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি এবং ক্যাপাসিটি চার্জ—সবকিছু মিলিয়ে লোকসান কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
বড় কেন্দ্র আছে, কিন্তু পূর্ণ উৎপাদন নেই
২০১৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে মাতারবাড়ী, পায়রা, রামপাল, আদানি ও এস আলমের বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। পাশাপাশি সামিট, ইউনিক, রিলায়েন্স ও ইউনাইটেডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রও অনুমোদন পায়।
কয়লাভিত্তিক বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা ৭ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। কিন্তু পর্যাপ্ত কয়লা সরবরাহ না থাকায় এসব কেন্দ্রের কোনো কোনোটি মাঝেমধ্যে বন্ধ রাখতে হয় অথবা সীমিত সক্ষমতায় চালাতে হয়।
একইভাবে গ্যাস সংকটের কারণে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোও নিয়মিত পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হচ্ছে না। অনেক কেন্দ্র বছরে এক মাসও টানা পূর্ণ ক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে না।
এখানেই বিদ্যুৎ খাতের বড় অসামঞ্জস্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে উৎপাদন সক্ষমতা আছে, অন্যদিকে সেই সক্ষমতা ব্যবহারের জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি নেই। আবার জ্বালানি থাকলেও সবসময় চাহিদা বা সঞ্চালন সক্ষমতা থাকে না। কেন্দ্র বন্ধ থাকলেও চুক্তি অনুযায়ী ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হয়।
ফলে কেন্দ্র যত কম চলে, প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের কার্যকর ব্যয় তত বেশি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। স্থায়ী খরচ কম পরিমাণ উৎপাদনের ওপর ভাগ হয়ে যাওয়ায় উৎপাদিত প্রতিটি ইউনিটের প্রকৃত ব্যয় বেড়ে যায়।
ক্যাপাসিটি চার্জ কেন বড় সমস্যা
ক্যাপাসিটি চার্জের মূল উদ্দেশ্য হলো বিদ্যুৎকেন্দ্রকে উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত রাখা এবং বিনিয়োগকারীর নির্দিষ্ট ব্যয় নিশ্চিত করা। বিদ্যুতের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেলে প্রস্তুত কেন্দ্র দ্রুত উৎপাদনে যেতে পারে। তাই সঠিক পরিকল্পনা ও যুক্তিসংগত চুক্তির মধ্যে ক্যাপাসিটি চার্জ অস্বাভাবিক কোনো ব্যবস্থা নয়।
সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন প্রয়োজনের তুলনায় বেশি কেন্দ্র অনুমোদন দেওয়া হয়, চুক্তিতে চার্জের হার বেশি থাকে অথবা জ্বালানি ও সঞ্চালনব্যবস্থার অভাবে কেন্দ্র ব্যবহার করা যায় না।
যদি একটি কেন্দ্র বছরের অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকে, কিন্তু তার বিপরীতে নিয়মিত বড় অঙ্কের অর্থ দিতে হয়, তাহলে সেই ব্যয় বিদ্যুতের সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয় বাড়ায়। এই অর্থ সরকারকে সরাসরি ভর্তুকি হিসেবে দিতে হয় অথবা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের লোকসানের সঙ্গে যুক্ত হয়।
দীর্ঘদিন এই ব্যবস্থা চললে লোকসান শুধু বিদ্যুৎ খাতের হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে না। সরকারি বাজেট, ব্যাংক ঋণ, জ্বালানি আমদানি, বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা এবং জনগণের ওপর মূল্যবৃদ্ধির চাপ—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়ে।
জাতীয় অর্থনীতিতে লোকসানের প্রভাব
পাঁচ বছরে ২ লাখ ৫৩ হাজার ৪৮৪ কোটি ৬২ লাখ টাকার লোকসান অত্যন্ত বড় অঙ্ক। এই অর্থের বড় অংশ সরকারি ভর্তুকি, ঋণ অথবা বকেয়া পরিশোধের মাধ্যমে সামাল দিতে হয়।
বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি বাড়লে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অবকাঠামোর মতো খাতে বাজেট বরাদ্দের ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে। আবার সরকার যদি ঋণ নিয়ে লোকসান মেটায়, তাহলে সুদ ব্যয়সহ ভবিষ্যতের আর্থিক দায়ও বাড়ে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সময়মতো বেসরকারি কেন্দ্রের বিল পরিশোধ করতে না পারলে বকেয়া জমে যায়। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক এবং জ্বালানি সরবরাহকারী সংস্থার আর্থিক ব্যবস্থাপনাতেও সমস্যা দেখা দিতে পারে।
অন্যদিকে লোকসান কমাতে বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা দাম বাড়ালে শিল্প উৎপাদনের ব্যয় বাড়ে। শিল্প খাতে বিদ্যুতের ব্যয় বাড়লে পণ্যের উৎপাদনমূল্যও বেড়ে যেতে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত বাজারদর, রপ্তানি প্রতিযোগিতা এবং সাধারণ ভোক্তার জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর পড়ে।
তাই বিদ্যুৎ খাতের লোকসানকে শুধু একটি সংস্থার হিসাবগত ক্ষতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি জাতীয় অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং জনগণের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
শুধু দাম বাড়ানো সমাধান নয়
বিদ্যুতের পাইকারি মূল্য বাড়ানো হলে উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের ব্যবধান কিছুটা কমে। তবে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ না করে শুধু মূল্য বাড়ালে সংকটের বোঝা গ্রাহকের কাছে স্থানান্তরিত হয়।
বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক অবস্থার উন্নতির জন্য প্রথমে কেন্দ্রভিত্তিক প্রকৃত ব্যয় যাচাই করা প্রয়োজন। কোন কেন্দ্র কতদিন চলে, কত ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, প্রতি ইউনিটের কার্যকর ব্যয় কত, কত টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হয় এবং কোন কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনা তুলনামূলকভাবে বেশি ব্যয়বহুল—এসব তথ্য নিয়মিতভাবে পর্যালোচনা করা দরকার।
একই সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তিগুলো পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। বিশেষ করে যেসব কেন্দ্র দীর্ঘ সময় বসে থাকে, জ্বালানি সংকটে চালানো যায় না অথবা বাজারের তুলনায় বেশি দামে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে, সেসব কেন্দ্রের চুক্তির শর্ত সংশোধনের সুযোগ খুঁজতে হবে।
ভবিষ্যতে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদনের আগে শুধু উৎপাদন সক্ষমতার লক্ষ্য নয়, বরং প্রকৃত চাহিদা, জ্বালানি সরবরাহ, সঞ্চালন সক্ষমতা, পরিবেশগত ব্যয় এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকির সমন্বিত মূল্যায়ন প্রয়োজন।
চুক্তি পর্যালোচনার দাবি
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের মতে, অতীতে অপরিকল্পিতভাবে দেওয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের লাইসেন্স ও ক্রয়চুক্তির আর্থিক দায় এখন বহন করতে হচ্ছে। অনেক কেন্দ্রের বিপরীতে উচ্চ হারে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে, যদিও সেগুলো নিয়মিত বা পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না।
বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত চুক্তি পর্যালোচনা না করলে লোকসান কমানো কঠিন হবে। তবে চুক্তি সংশোধনের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও আইনসম্মত হওয়া প্রয়োজন। সরকারকে কেন্দ্রের প্রয়োজনীয়তা, উৎপাদন ব্যয়, বিনিয়োগের শর্ত এবং দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা বিবেচনা করে আলোচনা করতে হবে।
একই সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতে তথ্য প্রকাশের পরিধি বাড়ানো দরকার। কেন্দ্রভিত্তিক ক্যাপাসিটি চার্জ, উৎপাদনের পরিমাণ, বিদ্যুৎ ক্রয়মূল্য এবং চুক্তির মেয়াদ জনগণের সামনে প্রকাশ করা হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে জবাবদিহি বাড়বে।
সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
দেশের বিদ্যুৎ খাত এখন এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় বেশি, অন্যদিকে জ্বালানি সংকটে সেই সক্ষমতার বড় অংশ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। আবার কেন্দ্র বন্ধ থাকলেও চুক্তির অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে নতুন কেন্দ্র নির্মাণের চেয়ে বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোর কার্যকর ব্যবহার, কম ব্যয়ের জ্বালানি নিশ্চিত করা, সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থা উন্নত করা এবং অপ্রয়োজনীয় আর্থিক দায় কমানোর দিকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
বিদ্যুতের দাম বাড়ানো সাময়িকভাবে লোকসানের ব্যবধান কমাতে পারে। কিন্তু অপরিকল্পিত সক্ষমতা, উচ্চ ক্যাপাসিটি চার্জ এবং ব্যয়বহুল চুক্তি বহাল থাকলে আর্থিক সংকট স্থায়ীভাবে কমবে না।
পাঁচ বছরে আড়াই লাখ কোটি টাকার বেশি লোকসান স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে, বিদ্যুৎ খাতে শুধু উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, বাস্তবসম্মত চাহিদা নিরূপণ, সাশ্রয়ী জ্বালানি, স্বচ্ছ চুক্তি এবং শক্তিশালী জবাবদিহি।
দ্রুত কার্যকর সংস্কার নেওয়া না হলে বিদ্যুৎ খাতের লোকসান ভবিষ্যতে আরও বড় হতে পারে। আর সেই লোকসানের চূড়ান্ত চাপ পড়বে রাষ্ট্রীয় বাজেট, শিল্প খাত এবং সাধারণ গ্রাহকের ওপর।

