দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অর্থ বিভাগের সাম্প্রতিক এক মূল্যায়নে দেখা গেছে, দেশের ১২২টি সরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার মধ্যে মাত্র ১১টি প্রতিষ্ঠানকে আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এই চিত্র দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ঋণের চাপ এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
অর্থ বিভাগের মূল্যায়ন অনুযায়ী, যেসব প্রতিষ্ঠানকে আর্থিকভাবে শক্তিশালী বলা হয়েছে, তাদের হাতে থাকা নগদ অর্থ ও সহজে ব্যবহারযোগ্য সম্পদের পরিমাণ মোট ঋণের চেয়ে বেশি। অর্থাৎ এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণের তুলনায় সম্পদের অবস্থান ভালো এবং তাদের ঋণভার নেতিবাচক পর্যায়ে রয়েছে, যা সাধারণত আর্থিক সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়।
অন্যদিকে, বাকি অধিকাংশ সরকারি প্রতিষ্ঠান আর্থিক চাপ, ঋণের বোঝা এবং সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতার মধ্যে রয়েছে।
কোন ১১ প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে শক্তিশালী
অর্থ বিভাগের মূল্যায়নে আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হিসেবে চিহ্নিত ১১টি প্রতিষ্ঠান হলো বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন, বাংলাদেশ শিল্প কারিগরি সহায়তা কেন্দ্র, ইস্টার্ন লুব্রিক্যান্টস ব্লেন্ডার্স, হোটেলস ইন্টারন্যাশনাল, যমুনা সার কারখানা, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ, নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ, পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন কোম্পানি, রাজশাহী ওয়াসা, এসএমই ফাউন্ডেশন এবং টিএসপি কমপ্লেক্স।
এই প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক অবস্থান তুলনামূলকভাবে ভালো হওয়ার পেছনে কয়েকটি বিষয় কাজ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে কার্যকর অর্থ ব্যবস্থাপনা, স্থিতিশীল আয়, সুশাসন এবং বাজারে নির্ভরযোগ্য অবস্থান।
সরকারি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা যাচাই
অর্থ বিভাগের সরকারি প্রতিষ্ঠান শাখা এই মূল্যায়ন করেছে। এতে ১২২টি সরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার আর্থিক কার্যক্রম, ঋণের পরিমাণ, সম্ভাব্য আর্থিক দায় এবং পরিচালন ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনা করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান কৌশলগত পণ্য ও সেবা সরবরাহ করে, বাজারে প্রতিযোগিতার ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে সরকারের নীতি বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখে।
তবে একই সঙ্গে অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে লোকসান, অদক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং ঋণের চাপের কারণে আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
এসএমই ফাউন্ডেশনের ভালো অবস্থানের কারণ
আর্থিকভাবে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি এসএমই ফাউন্ডেশন। প্রতিষ্ঠানটির হিসাব ও তহবিল ব্যবস্থাপনা, গবেষণা ও নীতি সহায়তা, যোগাযোগ এবং ব্র্যান্ডিং বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসাইন জানিয়েছেন, সঠিক তহবিল ব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিষ্ঠানটি আর্থিকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে।
তিনি জানান, ফাউন্ডেশনের প্রায় ৯০ শতাংশ অর্থ সরকারি ট্রেজারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করা হয়েছে। এসব বিনিয়োগ থেকে প্রায় ১২ শতাংশ হারে আয় পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি আরও জানান, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিতরণ করা ঋণের অর্থ ফেরতের হার প্রায় ১০০ শতাংশের কাছাকাছি। এর মাধ্যমে উপকারভোগীদের মধ্যে ভালো ঋণ পরিশোধের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
এসএমই ফাউন্ডেশনের এই আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠানটির স্থিতিশীল অবস্থানের অন্যতম কারণ।
ইস্টার্ন লুব্রিক্যান্টসের সাফল্যের পেছনে সুশাসন
আর্থিকভাবে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলোর আরেকটি হলো ইস্টার্ন লুব্রিক্যান্টস ব্লেন্ডার্স।
প্রতিষ্ঠানটির কোম্পানি সচিব আবু মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন জানিয়েছেন, ভালো করপোরেট ব্যবস্থাপনা, শক্তিশালী গ্রাহকভিত্তি এবং বাজারে স্থিতিশীল চাহিদার কারণে প্রতিষ্ঠানটি ভালো অবস্থানে রয়েছে।
তিনি বলেন, সরকারি মালিকানাধীন এই প্রতিষ্ঠান পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা পেট্রোলিয়াম কোম্পানির বিপণন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে পণ্য বাজারজাত করে। একই সঙ্গে সীমিতসংখ্যক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতাও করছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইস্টার্ন লুব্রিক্যান্টস নিয়মিতভাবে ভালো করপোরেট ব্যবস্থাপনা বজায় রাখে এবং বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কাজ করছে বলে তিনি জানান।
অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের সামনে আর্থিক চ্যালেঞ্জ
মাত্র ১১টি প্রতিষ্ঠানের আর্থিকভাবে স্বচ্ছল অবস্থান সরকারি খাতের সামগ্রিক চিত্রকে ইতিবাচক দেখাচ্ছে না।
দেশের অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠান এখনো নিয়মিত আয় দিয়ে পরিচালন ব্যয় মেটাতে পারছে না। ফলে তাদের সরকারি সহায়তা, ভর্তুকি কিংবা ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
কিছু প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের লোকসান জমে বড় আর্থিক দায় তৈরি হয়েছে। আবার কোথাও অতিরিক্ত জনবল, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তিগত পিছিয়ে থাকা এবং বাজার পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারার কারণে সমস্যা তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সরকারি অর্থ সহায়তা দিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং বাজারভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ।
সরকারি প্রতিষ্ঠানে সংস্কারের প্রয়োজন
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও সব প্রতিষ্ঠান একইভাবে কার্যকর নয়। কিছু প্রতিষ্ঠান জাতীয় স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সরাসরি লাভজনক না হলেও তাদের প্রয়োজন রয়েছে। তবে সেসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনা স্বচ্ছ ও দক্ষ হওয়া জরুরি।
অন্যদিকে যেসব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে লোকসান করছে, তাদের ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রয়োজন। কোথায় খরচ কমানো যায়, কোথায় আয় বাড়ানো সম্ভব এবং কোন খাতে বিনিয়োগ করলে প্রতিষ্ঠান কার্যকর হবে—এসব বিষয় গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের সফলতার মাপকাঠি শুধু লাভ নয়। জনগণকে মানসম্মত সেবা দেওয়া, জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদে আর্থিকভাবে টেকসই থাকা—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থ বিভাগের এই মূল্যায়ন সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে।যেসব প্রতিষ্ঠান ভালো করছে, তাদের ব্যবস্থাপনার ইতিবাচক দিকগুলো অন্য প্রতিষ্ঠানে প্রয়োগ করা যেতে পারে। একই সঙ্গে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আলাদা সংস্কার পরিকল্পনা প্রয়োজন।
আর্থিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, দক্ষ নেতৃত্ব এবং নিয়মিত মূল্যায়নের মাধ্যমে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর করা সম্ভব।
কারণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শুধু সরকারের সম্পদ নয়, এগুলো জনগণের সম্পদ। তাই এসব প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক শক্তি বাড়ানো মানে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করা।

