বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় লাগাতার বেড়ে যাওয়ায় সরকারের ভর্তুকির চাপও ক্রমেই বাড়ছে। বিদ্যুতের দাম কয়েক দফা সমন্বয় করা হলেও আয়-ব্যয়ের ব্যবধান কমানো সম্ভব হয়নি। ফলে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) আর্থিক সংকট আরও গভীর হয়েছে। গত ছয় বছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি বাবদ সরকারের ব্যয় দুই লাখ কোটি টাকারও বেশি হলেও, প্রয়োজনের তুলনায় বরাদ্দ কম থাকায় প্রতিবছর নতুন করে বকেয়া তৈরি হচ্ছে।
সম্প্রতি বিদ্যুৎ বিভাগের এক বৈঠকে উঠে এসেছে, অর্থ মন্ত্রণালয় চাহিদা অনুযায়ী সময়মতো ভর্তুকির অর্থ ছাড় করতে পারছে না। এর ফলে এক অর্থবছরের ভর্তুকির একটি অংশ পরের অর্থবছরে পরিশোধ করতে হচ্ছে। এই ধারাবাহিকতার কারণে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিশেষ করে স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদকদের (আইপিপি) পাওনা দ্রুত বাড়ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছর শেষে আইপিপি কেন্দ্রগুলোর কাছে পিডিবির বকেয়া দাঁড়িয়েছে ৫৩ হাজার ২৪৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা।
তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে রেকর্ড ৫৯ হাজার ৬০০ কোটি ৬ লাখ টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। তবে এই অর্থের বড় অংশই আগের বছরের বকেয়া পরিশোধে ব্যয় হয়। এর মধ্যে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বকেয়া ছিল ২৭ হাজার ৪৩৯ কোটি ২৩ লাখ টাকা, আর ওই অর্থবছরের জন্য নতুন ভর্তুকি ছিল ৩২ হাজার ১৬০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।
অন্যদিকে সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে মোট ৪৩ হাজার ১৯৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা ছাড় করা হয়েছে। কিন্তু এরও ৬ হাজার ৪৭৪ কোটি ৯৪ লাখ টাকা ছিল আগের বছরের বকেয়া। ফলে চলতি অর্থবছরের প্রকৃত চাহিদা পূরণে বরাদ্দ যথেষ্ট হয়নি। এই ঘাটতির কারণে আবারও বকেয়া পরের অর্থবছরে গড়ানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, ভর্তুকি ব্যবস্থার এই অসামঞ্জস্য স্পষ্টভাবে শুরু হয় ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে। ওই বছর সংস্থাটির লোকসান হঠাৎ বেড়ে ৪২ হাজার ৭৬৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা হলেও ভর্তুকি দেওয়া হয়েছিল মাত্র ২৯ হাজার ৬৫৮ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। এরপর থেকে প্রতিবছর লোকসান ও ভর্তুকির ব্যবধান আরও বড় হতে থাকে।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পিডিবির লোকসান ছিল ৮ হাজার ১৪১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, বিপরীতে ভর্তুকি পেয়েছিল ৭ হাজার ৯৬৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরে লোকসান কমে ৭ হাজার ৪৪৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকা হলেও প্রায় সমপরিমাণ ভর্তুকি দেওয়া হয়েছিল। ২০২০-২১ অর্থবছরে লোকসান বেড়ে ১১ হাজার ৬৪৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকা হলেও ভর্তুকি ছিল ১১ হাজার ৭৭৭ কোটি ৯১ লাখ টাকা, ফলে সে সময় বড় ধরনের আর্থিক সংকট তৈরি হয়নি।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে পিডিবির লোকসান বেড়ে ৫১ হাজার ৩০০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা হলেও ভর্তুকি বরাদ্দ ছিল ৩৯ হাজার ৫৩৪ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে লোকসান কিছুটা কমে ৪৭ হাজার ৫৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকা হলেও ভর্তুকি দেওয়া হয় ৩৮ হাজার ২৮৯ কোটি ২৮ লাখ টাকা। এরপর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে লোকসান আবার বেড়ে দাঁড়ায় ৫৫ হাজার ৬৫৮ কোটি ১৩ লাখ টাকা, যেখানে ভর্তুকি ছিল ৩৮ হাজার ৬৩৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।
সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পিডিবির লোকসান নতুন রেকর্ড গড়ে ৫৬ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা ছাড়াতে পারে। যদিও এ অর্থবছরের জন্য ভর্তুকি বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৪৪ হাজার ৩৪২ কোটি ৮৬ লাখ টাকা, যা সম্ভাব্য ঘাটতি পূরণে যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ খাতে লোকসান বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ ডলারের বিনিময় হার অনুযায়ী পরিশোধ করতে হয়। টাকার মান কমে যাওয়ায় একই পরিমাণ ডলার পরিশোধে এখন অনেক বেশি অর্থ ব্যয় হচ্ছে। পাশাপাশি নতুন বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হওয়ায় ক্যাপাসিটি চার্জের পরিমাণও বেড়েছে।
এ ছাড়া ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির বিলও ডলারে পরিশোধ করতে হয়। বিশেষ করে আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার পর আমদানি ব্যয় আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিও উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, লোকসানি প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও পিডিবির পাইকারি বিদ্যুৎ বিক্রির ওপর ৬ শতাংশ অগ্রিম আয়কর আরোপ রয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগ একাধিকবার এই কর প্রত্যাহারের অনুরোধ জানালেও এখন পর্যন্ত তা কার্যকর হয়নি। ফলে সংস্থাটির আর্থিক চাপ আরও বেড়েছে।
জ্বালানি খাত বিশ্লেষকদের মতে, কেবল ভর্তুকি বাড়িয়ে এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, ক্যাপাসিটি চার্জের কাঠামো পুনর্বিবেচনা, জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং বিতরণ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানোর মতো কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া বিদ্যুৎ খাতে আর্থিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। একই সঙ্গে সময়মতো ভর্তুকি ছাড় নিশ্চিত না হলে পিডিবির বকেয়া আরও বাড়বে এবং পুরো বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে।

