জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি অর্জনের পথে বাংলাদেশের সামনে বড় ধরনের অর্থায়ন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে নির্ধারিত লক্ষ্যগুলো পূরণ করতে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত প্রায় ৪২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থের ব্যবস্থা করতে হবে বলে সরকারি এক মূল্যায়নে উঠে এসেছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) উদ্যোগে আয়োজিত উন্নয়ন অর্থায়ন মূল্যায়ন ও এসডিজি অর্থায়নবিষয়ক জাতীয় কর্মশালায় এই তথ্য প্রকাশ করা হয়। রোববার ঢাকায় অনুষ্ঠিত এই কর্মশালায় জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) এবং বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয় কার্যালয়ের সহযোগিতায় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থায়ন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করা হয়।
কর্মশালায় উন্নয়ন অর্থায়ন মূল্যায়ন প্রতিবেদনের ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। এই মূল্যায়ন কাঠামোর মাধ্যমে একটি দেশের উন্নয়ন লক্ষ্য, অর্থায়ন নীতি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং অর্থের প্রবাহকে জাতীয় অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য করার বিষয় বিশ্লেষণ করা হয়।
সরকারি মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ২০২৬ থেকে ২০৩০ অর্থবছর পর্যন্ত এসডিজির বাকি সময়সীমা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে উন্নয়ন লক্ষ্য পূরণে প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
ইআরডি সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী কর্মশালায় বলেন, এসডিজি বাস্তবায়নের জন্য সামনে থাকা সময় খুবই সীমিত এবং অর্থায়নের ঘাটতিও বড়। একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। তবে সঠিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ, সমন্বিত উদ্যোগ, উন্নত শাসনব্যবস্থা এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পারে বলে তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান কর্মশালায় প্রতিবেদনের মূল বিষয় তুলে ধরেন। তিনি বাংলাদেশের পরিবর্তিত অর্থায়ন পরিস্থিতি এবং সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাত থেকে কীভাবে আরও বেশি অর্থ সংগ্রহ করা যায়, সে বিষয়ে আলোচনা করেন।
তিনি জানান, ২০২৬ থেকে ২০৩০ অর্থবছরের মধ্যে এসডিজি অর্জনের জন্য বাংলাদেশের অতিরিক্ত ৪২১ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন প্রয়োজন হবে। এই বিপুল অর্থের বড় অংশ দেশের অভ্যন্তরীণ সরকারি ও বেসরকারি খাত, জলবায়ু অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে সংগ্রহ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বড় অর্থের প্রয়োজনীয়তা বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রার বাস্তব চিত্র তুলে ধরছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য কমানো, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং কর্মসংস্থান তৈরির মতো খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন। এসব লক্ষ্য পূরণে শুধু সরকারি অর্থের ওপর নির্ভর করলে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন কঠিন হবে।
বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক ক্যারল ফ্লোর-স্মেরেজনিয়াক বলেন, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে উন্নয়ন অর্থায়নের সুযোগ আগের তুলনায় কমে আসছে। তাই বাংলাদেশের জন্য নিজস্ব অর্থ সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, দেশের কর ও মোট দেশজ উৎপাদনের অনুপাত বাড়াতে হবে এবং বেসরকারি খাতকে এসডিজির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে হবে। তার মতে, অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ বাড়ানো এখন বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে। ইআরডির অতিরিক্ত সচিব এবং কর্মশালার সভাপতি এ এইচ এম জাহাঙ্গীর বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য একটি সমন্বিত অর্থায়ন পরিকল্পনা তৈরি করা জরুরি।
ইউএনডিপির উপ-আবাসিক প্রতিনিধি সোনালি দয়ারত্নে বলেন, বর্তমানে অর্থায়নের বিষয়টি শুধু নতুন অর্থ সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং সরকার, উন্নয়ন সহযোগী, বেসরকারি খাত এবং নাগরিক সমাজ—সব পক্ষকে শুরু থেকেই পরিকল্পনা প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে হবে।
তিনি মনে করেন, এসডিজির অর্থায়ন ঘাটতি পূরণ করতে হলে শক্তিশালী নীতি, কার্যকর অংশীদারিত্ব এবং উন্নত ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
কর্মশালায় সরকারি কর্মকর্তা, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, ব্যাংকার, শিক্ষাবিদ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সেখানে এসডিজি অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন কাঠামো, ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ পরিকল্পনা এবং আর্থিক কৌশল নিয়ে আলোচনা করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ৪২১ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা বাংলাদেশের জন্য যেমন বড় চ্যালেঞ্জ, তেমনি এটি নতুন সুযোগও তৈরি করতে পারে। কারণ এই অর্থ সংগ্রহের জন্য সরকারকে কর ব্যবস্থার উন্নয়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং নতুন অর্থায়ন পদ্ধতি চালুর দিকে আরও বেশি মনোযোগ দিতে হবে।
বিশেষ করে এলডিসি উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক সহায়তার ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে। তাই বাংলাদেশের জন্য এখন থেকেই নিজস্ব সম্পদ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
এসডিজি অর্জনের পথে বাংলাদেশের সামনে সময় কম, প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণও বিশাল। তবে সঠিক পরিকল্পনা, কার্যকর নীতি এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এই অর্থায়ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আগামী পাঁচ বছর বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রার জন্য তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে যাচ্ছে।

