চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে আয়কর আদায়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তনের পথে হাঁটছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সংস্থাটি এবার মোট আয়করের প্রায় ৮৩ শতাংশ সংগ্রহ করতে চায় উৎসে কর এবং অগ্রিম আয়কর থেকে। গত অর্থবছরেও মোট আয়করের ৮৫ শতাংশের বেশি এই দুই উৎস থেকেই এসেছে। এবার সেই ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত ও কার্যকর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এনবিআরের কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরে আয়কর আদায়ে গত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৫৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্যে উৎসে কর ও অগ্রিম আয়কর মিলিয়ে ১ লাখ ৮৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
এর মধ্যে উৎসে কর থেকে ১ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, যা গত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৫১ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে অগ্রিম আয়কর থেকে ৩২ হাজার কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫৪ শতাংশ বেশি।
এনবিআরের এই পরিকল্পনা সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। কর্মকর্তাদের মতে, কঠোর নজরদারি, তথ্যভিত্তিক কর প্রশাসন এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করা হবে।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। ফলে উন্নয়ন ব্যয় ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অর্থ জোগাতে সরকারকে ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে ২০৩০ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে এনবিআর। এর আগে মধ্যমেয়াদে ১০ শতাংশে পৌঁছানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে কর প্রশাসনকে পুরোপুরি ডিজিটাল রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এনবিআর মুখোমুখি যোগাযোগবিহীন (ফেসলেস) করব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে, যাতে করদাতা ও কর্মকর্তার সরাসরি যোগাযোগ কমে এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ে।
একই সঙ্গে আয়কর, মূল্য সংযোজন কর এবং শুল্ক বিভাগের তথ্যভান্ডার একীভূত করা হবে। বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও তৃতীয় পক্ষের তথ্য মিলিয়ে করের আওতার বাইরে থাকা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তথ্য শনাক্ত করা হবে। এনবিআরের দাবি, এতে করের হার না বাড়িয়েও রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি সম্ভব হবে।
ডিজিটাল ব্যবস্থার পাশাপাশি বকেয়া কর আদায়েও কঠোর অবস্থান নিয়েছে সংস্থাটি। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বকেয়া করের অন্তত ৮০ শতাংশ আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া চলতি অর্থবছরে ভ্রমণ কর থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা গত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৪১ শতাংশ বেশি।
কর ফাঁকি রোধ, বন্ধ হয়ে থাকা কর মামলার পুনরুজ্জীবন, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি এবং উচ্চ আদালতে ঝুলে থাকা মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির মাধ্যমেও অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে এনবিআরের এই কৌশল নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের একাংশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, উৎসে করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বাড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত সেই অতিরিক্ত ব্যয় পণ্যের দামের মাধ্যমে ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।
বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট (বিল্ড)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে ১১১টি পৃথক বিধানের মাধ্যমে উৎসে কর কাটা হয়, যার মধ্যে ৪০টি ক্ষেত্রে এই কর ফেরতযোগ্য নয়। বাকি ৭১টি বিধানে ফেরতের সুযোগ থাকলেও বাস্তবে মাত্র ০.২৯ শতাংশ কর ফেরত পাওয়া গেছে। অর্থাৎ প্রায় ৯৯.৭১ শতাংশ উৎসে কর কার্যত ন্যূনতম কর হিসেবেই থেকে যায়, যা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বিশ্লেষকদের মতে, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা রাজস্ব আদায়ে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে একই সঙ্গে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখতে উৎসে কর কাঠামোর সংস্কার এবং ফেরতযোগ্য কর দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

