দেশজুড়ে তীব্র হয়ে ওঠা গ্যাস সংকট এবার সরাসরি আঘাত হেনেছে ওষুধশিল্পে। বিশেষ করে বহুল ব্যবহৃত প্যারাসিটামল তৈরির মূল কাঁচামাল উৎপাদন কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উৎপাদকদের ব্যয় বেড়েছে। যদিও জরুরি ভিত্তিতে আমদানি অব্যাহত থাকায় এখনই ওষুধের বাজারে সংকট দেখা দেয়নি, তবে পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শুধু ওষুধশিল্প নয়, গ্যাসের স্বল্পতার কারণে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের কারখানাগুলোর উৎপাদনও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও উৎপাদন কমে গেছে, কোথাও আবার সাময়িকভাবে কারখানা বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে মালিকপক্ষ।
ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদনকারী দেশের অন্যতম প্রতিষ্ঠান গণস্বাস্থ্য বেসিক কেমিক্যাল লিমিটেড গত ১৫ দিন ধরে প্যারাসিটামলের মূল কাঁচামাল (অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট বা এপিআই) উৎপাদন করতে পারছে না। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবিএম জামাল উদ্দিন জানান, তাদের কারখানার বয়লার প্রাকৃতিক গ্যাসে চলে। বয়লার বন্ধ হয়ে গেলে চিলার, রিঅ্যাক্টরসহ পুরো উৎপাদন ব্যবস্থাই অচল হয়ে পড়ে। ফলে প্রতিদিন যেখানে প্রায় চার টন এপিআই উৎপাদন হতো, সেখানে বর্তমানে উৎপাদন কার্যত শূন্যে নেমে এসেছে।
তিনি আরও জানান, শুধু গ্যাস সংকটই নয়, চীন থেকে আমদানি করা প্রধান কাঁচামালের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগে প্রতি টনের দাম ছিল প্রায় ২ হাজার ৩০০ ডলার। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ ডলারে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতাকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি মাসে প্রায় ৬৫০ টন প্যারাসিটামল এপিআইয়ের চাহিদা রয়েছে। উৎপাদন বন্ধ হওয়ার আগে গণস্বাস্থ্য মাসে প্রায় ৯০ টন সরবরাহ করত। বাকি চাহিদা পূরণ হতো আমদানি এবং অন্যান্য স্থানীয় উৎপাদকদের মাধ্যমে।
প্রতিষ্ঠানটি বেক্সিমকো, এসিএমই, এসিআই, ইবনে সিনা, হেলথকেয়ার ও ইনসেপ্টাসহ দেশের বেশিরভাগ বড় ওষুধ কোম্পানিকে এপিআই সরবরাহ করে। তবে স্কয়ার নিজস্ব কারখানায় এই কাঁচামাল উৎপাদন করায় তাদের ওপর নির্ভরশীল নয়। জামাল উদ্দিন বলেন, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত উৎপাদন কবে শুরু হবে, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশে প্রায় ৯৮ শতাংশ প্রস্তুত ওষুধ দেশেই তৈরি হলেও এসব ওষুধ উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত প্রায় ৯৫ শতাংশ কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এর বেশিরভাগই আসে চীন ও ভারত থেকে।
২০১৮ সালে এপিআই নীতি গ্রহণ এবং এপিআই শিল্পপার্ক প্রতিষ্ঠা করা হলেও নীতিগত, আর্থিক, প্রযুক্তিগত ও নিয়ন্ত্রক নানা সীমাবদ্ধতার কারণে এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হয়নি।
জামাল উদ্দিনের মতে, সরকারের সমন্বিত উদ্যোগে এসব বাধা দূর করা গেলে বিদেশি কাঁচামালের ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। বর্তমানে বছরে প্রায় ১৫০ কোটি ডলারের এপিআই আমদানি করা হয়, যা কমিয়ে প্রায় ১০০ কোটি ডলারে নামিয়ে আনা যেতে পারে।
বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের নির্বাহী পরিচালক (সংগ্রহ) মো. শাহ ইমরান জানান, তাদের নিজস্ব এপিআই উৎপাদন সুবিধা থাকলেও প্রয়োজনে গণস্বাস্থ্য থেকেও কাঁচামাল সংগ্রহ করা হতো। বর্তমানে গণস্বাস্থ্যের উৎপাদন বন্ধ থাকায় তারা নিজেদের উৎপাদনের ওপর নির্ভর করছে। তিনি বলেন, দেশে ব্যবহৃত প্যারাসিটামলের প্রায় ৭০ শতাংশ বেক্সিমকো সরবরাহ করে। ফলে দীর্ঘদিন দেশীয় এপিআই উৎপাদন বন্ধ থাকলে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জানান, পাবনায় অবস্থিত তাদের এপিআই কারখানায় পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ থাকায় উৎপাদন স্বাভাবিক রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি একাই দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ প্যারাসিটামল এপিআইয়ের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম। তবে অন্যান্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করা তাদের পক্ষেও সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির সভাপতি এবং ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ওষুধ উৎপাদন অব্যাহত রাখতে সরকার জরুরি ভিত্তিতে এপিআই আমদানির অনুমতি দিচ্ছে।
হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হালিমুজ্জামান জানান, যেসব প্রতিষ্ঠান সাধারণত দেশীয় কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল, তারাও এখন আমদানির অনুমোদনের জন্য আবেদন করছে। তিনি বলেন, ওষুধ কোম্পানিগুলো সাধারণত দুই থেকে তিন মাসের কাঁচামাল মজুত রাখে। কারণ বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি, মান পরীক্ষা এবং উৎপাদনে ব্যবহার—সব মিলিয়ে দীর্ঘ সময় লাগে। তাই অতিরিক্ত বা কম আমদানি—দুটিই প্রতিষ্ঠানের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
গ্যাস সংকটের প্রভাব এখন দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলেও স্পষ্ট। বাংলাদেশের দুটি ভাসমান এলএনজি সংরক্ষণ ও পুনরায় গ্যাসীকরণ ইউনিটের একটি প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে বন্ধ থাকায় প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে, যা জাতীয় সরবরাহের প্রায় ১৭ শতাংশ।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ২ হাজার ৬২০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমে প্রায় ২ হাজার ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমেছে। অথচ দেশের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এই ঘাটতির কারণে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে রপ্তানি চালান বিলম্বিত হচ্ছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে নিম্নচাপের কারণে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। প্যারাগন সিরামিকস জানিয়েছে, এক মাসের বেশি সময় ধরে তারা তীব্র গ্যাস সংকটে রয়েছে। বিকল্প হিসেবে সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করলেও পর্যাপ্ত সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। এরই মধ্যে বেশ কয়েকজন বড় ক্রেতার অর্ডারও হারাতে হয়েছে।
কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের গাজীপুর কার্যালয়ের উপমহাপরিদর্শক এম এম মামুন উর রশিদ বলেন, কোনো কারখানা আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ না হলেও অন্তত সাত থেকে আটটি কারখানার উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের গাজীপুর মহানগর শাখার সভাপতি শফিউল আলম জানান, উৎপাদন কমে যাওয়ায় শ্রমিকদের অতিরিক্ত কাজের সুযোগ কমে গেছে। সংকট দীর্ঘায়িত হলে কিছু কারখানায় কর্মী ছাঁটাইয়ের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
বেঙ্গল গ্রুপের সহসভাপতি মো. জসিম উদ্দিন জানান, গ্যাসের অভাবে ইউরোপের একটি বড় ক্রেতার ডেনিম পোশাকের অর্ডার ঝুঁকিতে পড়লেও তারা গাজীপুরের দুটি পোশাক কারখানার উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছেন। তার ভাষায়, আকাশপথে পণ্য পাঠানোর খরচ অত্যন্ত বেশি হওয়ায় সেটি বাস্তবসম্মত নয়।
নারায়ণগঞ্জের প্লামি ফ্যাশনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল হক বলেন, সংকট কাটাতে ডিজেল বা শিল্প খাতে ব্যবহৃত তরল গ্যাস ব্যবহার করা গেলেও এতে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক জানান, গ্যাস সংকটের কারণে চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় কিছু কারখানা সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। তার মতে, দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে দেশের উৎপাদনশিল্পের জন্য এটি বড় ধরনের সংকটে পরিণত হতে পারে।

