বিশ্বের পোশাক রপ্তানি বাজারে দীর্ঘদিনের শীর্ষস্থানীয় দেশ চীনের প্রভাব ধীরে ধীরে কমছে। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সুবিধা নিচ্ছে ভিয়েতনাম। অন্যদিকে বৈশ্বিক বাজার সম্প্রসারিত হলেও সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ। ফলে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান এখন আগের তুলনায় বেশি প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ২০২৫ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন চিত্র তুলে ধরেছে পোশাক খাতভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস (বিএভি)। সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল তথ্যগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
ডব্লিউটিওর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বে মোট পোশাক রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৭৪ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। আগের বছরের তুলনায় এ খাতে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ। তবে একই সময়ে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ। বিপরীতে ভিয়েতনামের রপ্তানি বেড়েছে ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ার ১৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে চীনের বাজার অংশীদারত্বে। ২০২৫ সালে দেশটি ১৫৭ দশমিক ১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পোশাক রপ্তানি করলেও আগের বছরের তুলনায় তাদের রপ্তানি কমেছে ৪ দশমিক ৯২ শতাংশ। এর ফলে বিশ্ববাজারে চীনের অংশীদারত্ব নেমে এসেছে ২৭ দশমিক ৩৫ শতাংশে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০২১ সালে এই অংশ ছিল ৩১ দশমিক ৭১ শতাংশ। অর্থাৎ চার বছরে চীন প্রায় সাড়ে ৪ শতাংশ পয়েন্ট বাজার হারিয়েছে।
চীনের এই কমে যাওয়া বাজারের বড় অংশ দখল করছে ভিয়েতনাম। ২০২৫ সালে দেশটির পোশাক রপ্তানি বেড়ে ৩৭ দশমিক ৫১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে বিশ্ববাজারে তাদের অংশীদারত্ব বেড়ে হয়েছে ৬ দশমিক ৫৩ শতাংশ। অন্যদিকে বাংলাদেশের রপ্তানি হয়েছে ৩৮ দশমিক ৮২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ফলে দুই দেশের রপ্তানির ব্যবধান এখন মাত্র ১ দশমিক ৩১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
বর্তমানে বাংলাদেশ এখনও বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। তবে দেশের বাজার অংশীদারত্ব ৬ দশমিক ৭৬ শতাংশে প্রায় স্থির রয়েছে। অর্থাৎ বিশ্ববাজারের আকার বাড়লেও অতিরিক্ত চাহিদার বড় অংশ প্রতিযোগী দেশগুলো নিজেদের দখলে নিতে সক্ষম হয়েছে।
অন্যান্য প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ২০২৫ সালে ভারত ৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে ১৭ দশমিক ২৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। একই সময়ে পাকিস্তানের রপ্তানি বেড়েছে ৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার ৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ। তবে তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক রপ্তানি যথাক্রমে ৬ দশমিক ১০ শতাংশ ও ৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ কমেছে।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, চীনের বাজার অংশ কমলেও সেই সুযোগ বাংলাদেশ প্রত্যাশিতভাবে কাজে লাগাতে পারেনি। বরং ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া নতুন বাজারে প্রবেশ, উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদন এবং দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের বেশি আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের দ্বিতীয় অবস্থান আরও বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শুধু রপ্তানির পরিমাণ বাড়ালেই দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রাখা সম্ভব হবে না। এজন্য শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, বন্দর ও কাস্টমস ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং উচ্চমূল্যের ও ম্যান-মেইড ফাইবারভিত্তিক পোশাক উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। অন্যথায় চীনের হারানো বাজারের বড় অংশ প্রতিযোগী দেশগুলোর দখলে চলে যাবে এবং বাংলাদেশের ওপর প্রতিযোগিতার চাপ আরও বাড়বে।

