বাংলাদেশ যখন শিল্প সম্প্রসারণ, রফতানি বৃদ্ধি এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি সংকট। বিশেষ করে গ্যাসের ঘাটতি এখন শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা নয়, বরং দেশের উৎপাদন ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস সংকট শিল্প উৎপাদন, রফতানি সক্ষমতা এবং বিনিয়োগ পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এর প্রভাব পড়ছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও অন্যান্য খাতেও।
দেশে কয়েক বছর ধরেই গ্যাসের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় কম ছিল। তবে সম্প্রতি কক্সবাজারের মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও সংকটপূর্ণ হয়ে ওঠে। বর্তমানে দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২১৩ থেকে ২১৫ কোটি ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যা মোট চাহিদার প্রায় ৪৪ শতাংশ।
এই ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে শিল্প, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও আবাসিক খাতে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে উৎপাদনমুখী শিল্প, যা দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
শিল্পাঞ্চলে ব্যাহত উৎপাদন
দেশের বড় শিল্প এলাকাগুলোতে গ্যাস সংকট এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে। গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, ভালুকা, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লার বহু কারখানায় উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। শিল্পকারখানায় স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য সাধারণত ১০ থেকে ১৫ পিএসআই গ্যাসচাপ প্রয়োজন হয়। কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠান বর্তমানে মাত্র ১ থেকে ৩ পিএসআই চাপ পাচ্ছে। দিনের বিভিন্ন সময়ে গ্যাসের চাপ পুরোপুরি কমে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
এ পরিস্থিতিতে অনেক কারখানা উৎপাদন ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিয়েছে। ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অনেকগুলো উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ডিজেলচালিত জেনারেটর, এলপিজি ও অন্যান্য বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তবে এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাচ্ছে।
চট্টগ্রামের টি কে গ্রুপের কর্ণফুলী স্টিল মিলসের পরিস্থিতিও সংকটের চিত্র তুলে ধরে। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব ১২ মেগাওয়াট ক্ষমতার ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকলেও গ্যাসের অভাবে সেটি চালানো যাচ্ছে না। ফলে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আর বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা হলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
রফতানিমুখী শিল্পে বাড়ছে উদ্বেগ:
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস তৈরি পোশাক, বস্ত্র, স্পিনিং, নিটওয়্যার ও ডাইং শিল্প। এসব খাতে গ্যাসের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ডাইং ও ফিনিশিং কারখানায় উৎপাদনের মাঝপথে গ্যাসের চাপ কমে গেলে পুরো প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। স্পিনিং মিলগুলোও পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। শিল্প সংশ্লিষ্টদের দাবি, ইতোমধ্যে অনেক স্পিনিং মিল বন্ধ হয়ে গেছে অথবা সীমিত সক্ষমতায় চলছে।
এর ফলে নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে উঠছে। সময়মতো পণ্য দিতে না পারলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ক্রয়াদেশ বাতিল বা অন্য দেশে স্থানান্তরের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়তে পারে দেশের রফতানি আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে।
গ্যাসের ঘাটতি পূরণে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ডিজেল, এলপিজি কিংবা আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে আগের তুলনায় ব্যয় দুই থেকে তিন গুণ পর্যন্ত বাড়ছে কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের দাম ইচ্ছামতো বাড়ানোর সুযোগ নেই। ফলে অতিরিক্ত খরচ উদ্যোক্তাদেরই বহন করতে হচ্ছে। এতে কমছে মুনাফা, বাড়ছে লোকসানের চাপ এবং দুর্বল হচ্ছে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাস সংকট যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে শুধু উৎপাদন নয়, দেশের শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের গতিও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল করা না গেলে অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শিল্প থেকে অর্থনীতি—গ্যাস সংকটের প্রভাব ছড়াচ্ছে সবখানে:
গ্যাস সংকট এখন আর শুধু কারখানার উৎপাদন কমে যাওয়ার বিষয় নয়। এর প্রভাব ধীরে ধীরে দেশের রফতানি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, রাজস্ব আয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। শিল্প উদ্যোক্তা, অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত সংকট মোকাবিলা করা না গেলে বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
তাদের মতে, সাময়িকভাবে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ বর্তমান সংকট দেশের উৎপাদন ব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্ট করে তুলেছে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, দেশের পোশাক ও বস্ত্র খাত একসঙ্গে একাধিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গ্যাস সংকটের পাশাপাশি অর্থায়ন ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিও শিল্পের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তিনি বলেন, অনেক কারখানা উৎপাদন বন্ধ বা সীমিত করেও শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করছে। এতে প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর মূলধনের ওপর চাপ বাড়ছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের টিকে থাকা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
শওকত আজিজ রাসেলের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সংকটের কারণে ইতোমধ্যে দেশের ১২১টি স্পিনিং মিল উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। তার মতে, শিল্পের স্বাভাবিক কার্যক্রম ধরে রাখতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, বর্তমান গ্যাস সংকট আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়। দীর্ঘদিনের জ্বালানি পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতা, কাঠামোগত দুর্বলতা এবং সংস্কারের ঘাটতির ফলেই পরিস্থিতি জটিল হয়েছে।
তিনি বলেন, অতীতে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর বেশি নির্ভরতা তৈরি হলেও পর্যাপ্ত বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়নি। এর সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, শুধু উদ্যোক্তাদের ওপর এই সংকটের আর্থিক চাপ চাপিয়ে দিলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হবে। গ্যাস সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক করা সম্ভব না হলে সরকারকে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পের জন্য আর্থিক সহায়তা, কর সুবিধা বা অন্যান্য নীতিগত সহায়তার বিষয় বিবেচনা করতে হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলায় টেকসই জ্বালানি অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
গ্যাসনির্ভর অন্যান্য শিল্পেও একই ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শেখ মাসাদুল আলম মাসুদ বলেন, গ্যাসের চাপ এতটাই কমে গেছে যে অনেক স্টিল মিল স্বাভাবিক উৎপাদন চালাতে পারছে না।
বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মইনুল ইসলাম বলেন, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সংকট সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে বিনিয়োগ, উৎপাদন এবং রফতানি খাতে নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়বে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, গ্যাস সংকট এখন গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছেছে। তিনি বলেন, আগে কিছু কারখানা সিএনজি স্টেশন থেকে গ্যাস এনে উৎপাদন চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করত। কিন্তু এখন সেই সুযোগও সীমিত হয়ে গেছে। ফলে ডাইং, ফিনিশিং ও আয়রনিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এর প্রভাব পড়ছে রফতানি কার্যক্রমে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা ক্রয়াদেশ স্থগিত, বাতিল কিংবা পণ্যের দাম কমানোর মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, দেশের গ্যাস ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত বিকল্প সক্ষমতা না থাকায় একটি এলএনজি টার্মিনালে সমস্যা দেখা দিলেই পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় চাপ তৈরি হয়। তিনি মনে করেন, জ্বালানি অবকাঠামোতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের ঘাটতির কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হওয়ায় বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে ঝুঁকি কমাতে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ এবং বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দিতে হবে।
অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি গ্যাস সংকট:
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, গ্যাস সংকট এখন শিল্প খাতের জন্য বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। কোথাও উৎপাদন কমানো হচ্ছে, আবার কোথাও সাময়িকভাবে কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, রফতানি আদেশ সময়মতো পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমছে। তার মতে, এর প্রভাব শুধু শিল্প মালিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা, আয় এবং কর্মসংস্থানও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
ড. ফাহমিদা খাতুন আরও বলেন, উদ্বেগের বিষয় হলো—শিল্প উদ্যোক্তারা গ্যাসের উচ্চ মূল্য পরিশোধ করেও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ পাচ্ছেন না। এতে নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, শুধু এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে। তাই শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহের জন্য বাস্তবসম্মত অগ্রাধিকার নীতি, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বৃদ্ধি, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন, অবৈধ সংযোগ বন্ধ এবং জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। গ্যাস সংকটের সমাধান শুধু শিল্প সচল রাখার জন্য নয়, দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও জরুরি।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, দেশের বর্তমান জ্বালানি সংকটের পেছনে দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতা এবং অতিরিক্ত এলএনজি নির্ভরতার ভূমিকা রয়েছে।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতের জ্বালানি পরিকল্পনা কোনোভাবেই শুধু এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়। বরং ভোলা ও বরিশালের গ্যাস দ্রুত জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানির (বাপেক্স) নতুন কূপ খনন কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়া এবং দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে।
জ্বালানি সংকটের কারণে নতুন শিল্পে গ্যাস সংযোগ দেওয়া কার্যত বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে দেশের ছয়টি গ্যাস বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে নতুন শিল্প সংযোগের জন্য ১ হাজার ৮৫৭টি আবেদন জমা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫৫০টি প্রতিষ্ঠান গ্যাস সংযোগের সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অর্থ জমা দিলেও এখনো সংযোগ পায়নি। সংকট না কমা পর্যন্ত নতুন শিল্পে গ্যাস সংযোগ এবং বিদ্যমান শিল্পে গ্যাসের লোড বাড়ানোর কার্যক্রম স্থগিত রেখেছে সরকার। এর ফলে আটকে আছে হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ। উদ্যোক্তারা বলছেন, কারখানা নির্মাণ শেষ করেও উৎপাদনে যেতে না পারায় তাদের ঋণের সুদ, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ এবং অন্যান্য ব্যয় বহন করতে হচ্ছে।
কুমিল্লা অর্থনৈতিক অঞ্চলে মেঘনা গ্রুপ ৭ হাজার ৩২০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে দুটি বড় শিল্পকারখানা নির্মাণ করেছে। কিন্তু গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় এখনো উৎপাদন শুরু করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। শুধু ব্যাংকঋণের সুদ বাবদ প্রতি মাসে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে বলে জানা গেছে। একইভাবে সিটি গ্রুপের প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগও গ্যাস সংকটে আটকে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব অর্থায়নে পাইপলাইন নির্মাণ করেও গ্যাস সংযোগ পায়নি।
এছাড়া স্কয়ার গ্রুপ নতুন বস্ত্র কারখানা চালু করতে পারছে না। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ ভোলায় প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার শিল্পপার্ক বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, একদিকে সরকার বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে, অন্যদিকে শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারায় বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি দ্বৈত বার্তা যাচ্ছে। এতে নতুন বিনিয়োগের আগ্রহ কমে যেতে পারে।
কর্মসংস্থানে তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা:
বাংলাদেশের শিল্প খাত লাখো মানুষের কর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান উৎস। কিন্তু উৎপাদন কমে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়ছে শ্রমবাজারে। অনেক কারখানায় শ্রমিকদের স্বাভাবিক কাজের সময় কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কোথাও শ্রমিকদের অলস বসিয়ে রাখা হচ্ছে, আবার কোথাও বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হচ্ছে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে কর্মী ছাঁটাইয়ের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। শুধু বিদ্যমান কর্মসংস্থান নয়, নতুন শিল্প চালু না হওয়ায় সম্ভাব্য চাকরির সুযোগও আটকে যাচ্ছে।
স্কয়ার গ্রুপের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ পেলে আগামী পাঁচ বছরে তাদের নতুন প্রকল্পে প্রায় ২০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে প্রাণ-আরএফএলের পরিকল্পিত শিল্পপার্কে ২৫ হাজারের বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে।
শিল্প খাতের বড় অংশই ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু উৎপাদন কমে গেলে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিক্রি ও নগদ প্রবাহ কমে যায়। এতে ঋণের কিস্তি পরিশোধে সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাস সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুর্বলতা বাড়বে। এর প্রভাব পড়তে পারে ব্যাংক খাতেও। বাড়তে পারে খেলাপি ঋণ, কমে যেতে পারে নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা অর্থাৎ জ্বালানি সংকটের প্রভাব শুধু কারখানার উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, তা আর্থিক খাতেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর পড়তে পারে। ডিজেল, এলপিজি বা তুলনামূলক ব্যয়বহুল বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদন চালাতে হলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পণ্যের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করবে। এতে নির্মাণসামগ্রী, পোশাক, ভোগ্যপণ্যসহ বিভিন্ন শিল্পপণ্যের দাম বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের যে প্রচেষ্টা চলছে, গ্যাস সংকট তা আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
বর্তমানে দেশের বেসরকারি খাত একসঙ্গে দুটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে—অর্থায়নের সংকট এবং জ্বালানি সংকট। বাংলাদেশ বিজনেস ইনডেক্স ২০২৪-২৫ অনুযায়ী, ব্যবসায়িক পরিবেশের ১১টি সূচকের মধ্যে অর্থায়নের সুযোগ সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গ্যাস সংকট, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে শিল্প খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।
ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, সহজ শর্তে অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে নতুন বিনিয়োগের গতি ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। তাদের মতে, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো—একটি দীর্ঘমেয়াদি, নির্ভরযোগ্য ও টেকসই জ্বালানি পরিকল্পনা গ্রহণ করা।
উন্নয়নের স্বপ্ন যত বড় হচ্ছে, ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে জ্বালানি নিরাপত্তা। কারণ কারখানা বন্ধ হলে শুধু উৎপাদন থামে না, থেমে যায় বিনিয়োগের আস্থা, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং অর্থনীতির গতিও। তাই গ্যাস সংকটের সমাধান এখন আর শুধু জ্বালানি খাতের বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পথ নির্ধারণের প্রশ্ন।

