দীর্ঘ সময়ের মন্দাভাব কাটিয়ে জাতীয় সঞ্চয়পত্রের বিক্রি আবারও ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। টানা দুই মাস ধরে এই খাতে নতুন বিনিয়োগের পরিমাণ আগের আসল ও মুনাফা পরিশোধের তুলনায় বেশি থাকছে। এতে একদিকে যেমন সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে, অন্যদিকে সরকারের জন্যও সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মে মাসে জাতীয় সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ২৩৪ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ, ওই মাসে যেসব সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে, তা থেকে আসল ও মুনাফা পরিশোধের পর সরকারের হাতে অতিরিক্ত এই পরিমাণ অর্থ এসেছে। এর আগে এপ্রিল মাসেও সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ছিল ইতিবাচক। ওই মাসে নিট বিক্রির পরিমাণ দাঁড়ায় ২ হাজার ২৬০ কোটি ৫৭ লাখ টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে অর্থাৎ জুলাই থেকে মে পর্যন্ত সঞ্চয়পত্রের মোট নিট বিক্রি হয়েছে ৮০৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ, বছরের অধিকাংশ সময়েই বিক্রির পরিমাণ আসল ও মুনাফা পরিশোধের তুলনায় বেশি ছিল।
কেন বাড়ছে সঞ্চয়পত্রে আগ্রহ:
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের কয়েকটি ব্যাংকের অনিয়ম ও আর্থিক দুর্বলতার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাংকিং খাত নিয়ে কিছুটা অনাস্থা তৈরি হয়েছে। এর ফলে অনেক বিনিয়োগকারী তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে আবারও জাতীয় সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকছেন।
যদিও সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক আমানতের সুদের হার বেড়েছে, তবে সব গ্রাহকের আস্থা এখনো পুরোপুরি ফিরেনি। পাশাপাশি পুঁজিবাজারেও কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতা না আসায় ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগ হিসেবে সঞ্চয়পত্রের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সঞ্চয়পত্রের সর্বোচ্চ মুনাফার হার ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ করা হয়। এই আকর্ষণীয় মুনাফার হারও বিনিয়োগ বৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এর আগে টানা দুই অর্থবছর সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট ঋণ নেওয়ার পরিমাণ নেতিবাচক ছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নতুন সঞ্চয়পত্র বিক্রির তুলনায় আসল ও মুনাফা পরিশোধ বেশি হওয়ায় সরকারের নিট পরিশোধ দাঁড়ায় ৬ হাজার ৬৩ কোটি টাকা। এর আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকারের নিট পরিশোধের পরিমাণ ছিল ২১ হাজার ১২৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।
তবে চলতি অর্থবছরে পরিস্থিতির পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে সংশোধিত বাজেটে এই লক্ষ্য কমিয়ে ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা করা হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শেষ পর্যন্ত সঞ্চয়পত্রের ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছরে সরকার এই খাত থেকে কিছুটা নিট ঋণ নিতে সক্ষম হতে পারে।
যদিও সাম্প্রতিক সময়ে বিক্রিতে কিছুটা গতি ফিরেছে, তবে গত কয়েক বছরের দুর্বল অবস্থার কারণে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা আরও কমানো হয়েছে। নতুন অর্থবছরে এ খাত থেকে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, একক মাসের পাশাপাশি সামগ্রিক হিসাবেও জাতীয় সঞ্চয়পত্রের বিক্রি এখন ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। দীর্ঘদিনের স্থবিরতার পর নিরাপদ বিনিয়োগের এই মাধ্যমটিতে সাধারণ মানুষের আগ্রহ আবারও বাড়তে শুরু করেছে।

