বাংলাদেশের ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির খরচে এবার যুক্ত হতে যাচ্ছে নতুন একটি চার্জ। আন্তঃদেশীয় বিদ্যুৎ লেনদেনের গ্রিড পরিচালনা, সময়সূচি নির্ধারণ, মিটার পাঠ, বিদ্যুৎ হিসাব এবং লেনদেন নিষ্পত্তির খরচ মেটাতে এ চার্জ নেওয়া হবে। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য এ বাবদ দিতে হবে ০.০০৫ ভারতীয় রুপি।
পরিমাণের দিক থেকে চার্জটি খুবই ছোট মনে হলেও বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় ধরে ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ আমদানি করায় সামগ্রিক ব্যয়ের ওপর এর প্রভাব একেবারে উপেক্ষা করার মতো নয়। বিশেষ করে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস সংকট, জ্বালানি আমদানির বাড়তি ব্যয় এবং স্থানীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতিবেশী দেশ থেকে বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা যখন বাড়ছে, তখন নতুন এই ব্যয়টি বিদ্যুৎ আমদানির হিসাবকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলছে।
প্রতি ইউনিটে ০.০০৫ ভারতীয় রুপি নতুন ব্যয়
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এবং ভারতের রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান এনটিপিসি বিদ্যুৎ ব্যাপার নিগম লিমিটেডের মধ্যে এ বিষয়ে একটি চুক্তি করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রস্তাবিত চুক্তিকে কেন্দ্র করে ১৮ আগস্ট বিদ্যুৎ বিভাগ অর্থ বিভাগের মতামত চেয়েছে।
সংশ্লিষ্ট এক জ্যেষ্ঠ অর্থ কর্মকর্তা জানান, ভারত শুরুতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য এক পয়সা ভারতীয় রুপি হারে এই চার্জ নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছিল। আলোচনার পর বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড হারটি কমিয়ে ০.০০৫ ভারতীয় রুপিতে আনতে সক্ষম হয়েছে। অর্থাৎ প্রাথমিক প্রস্তাবের অর্ধেক করা হয়েছে।
চার্জটি বিদ্যুতের মূল দামের অংশ নয়। বিদ্যুৎ আমদানির জন্য যে মূল্য বাংলাদেশকে দিতে হয়, তার বাইরে এই অর্থ দিতে হবে। মূলত আন্তঃদেশীয় বিদ্যুৎ সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত গ্রিড পরিচালনা এবং লেনদেনের হিসাব-নিকাশের ব্যয় মেটাতেই এ অর্থ নেওয়া হবে।
ছোট হার, বড় পরিমাণে বাড়বে মোট ব্যয়
প্রতি ইউনিটে ০.০০৫ ভারতীয় রুপি খুব সামান্য অর্থ। কিন্তু বিদ্যুৎ আমদানির পরিমাণ যখন ঘণ্টায় লাখ লাখ ইউনিটে পৌঁছায়, তখন একই ছোট চার্জও মোট হিসাবে উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠে।
প্রস্তাবিত চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ ভারত থেকে ১,১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করবে। এই পরিমাণ বিদ্যুৎ যদি পুরো সক্ষমতায় একটানা সরবরাহ করা হয়, তাহলে প্রতি ঘণ্টায় বাংলাদেশ পাবে ১.১৬ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ।
প্রতি ইউনিটে ০.০০৫ ভারতীয় রুপি হিসাবে প্রতি ঘণ্টায় শুধু এই নতুন চার্জ বাবদ ব্যয় হবে ৫,৮০০ ভারতীয় রুপি।
এক ইউনিট বিদ্যুৎ বলতে এক কিলোওয়াট-ঘণ্টা বোঝায়। অর্থাৎ ১,০০০ ওয়াট ক্ষমতার কোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্র এক ঘণ্টা একটানা চললে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, সেটিই এক ইউনিট।
ফলে প্রতি ইউনিটে কয়েক হাজার ভাগের এক ভাগ রুপির মতো মনে হলেও বিদ্যুৎ আমদানির বড় পরিমাণের কারণে দীর্ঘ মেয়াদে এর মোট আর্থিক প্রভাব তৈরি হবে।
কেন এই আলাদা চার্জ নেওয়া হচ্ছে
এই নতুন চার্জকে বিদ্যুতের দাম হিসেবে দেখলে বিষয়টি ভুলভাবে বোঝা হবে। মূলত আন্তঃদেশীয় বিদ্যুৎ বাণিজ্যের ক্ষেত্রে গ্রিড পরিচালনা এবং লেনদেনের বিভিন্ন হিসাব আলাদাভাবে পরিচালনার জন্য এ ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ভারতের কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রক কমিশন প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিদ্যুৎ বাণিজ্যে গ্রিড-সংক্রান্ত বিভিন্ন পাওনা নিষ্পত্তির জন্য এ ধরনের ব্যবস্থা চালু করেছে। এর আওতায় বিদ্যুৎ সরবরাহের সময়সূচি নির্ধারণ, মিটার থেকে তথ্য সংগ্রহ, উৎপাদন ও সরবরাহের হিসাব রাখা এবং নির্ধারিত পরিমাণের তুলনায় বাস্তবে কম-বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ হলে তার আর্থিক হিসাব নিষ্পত্তি করা হয়।
বাংলাদেশকে ভারতের বিদ্যুৎ গ্রিডের মধ্যে একটি পৃথক নিয়ন্ত্রণ এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই বাংলাদেশ থেকে বা বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে মিটার, বিদ্যুৎ হিসাব এবং লেনদেন নিষ্পত্তির জন্য আলাদা কাঠামো প্রয়োজন হয়। সেই ব্যবস্থার খরচই মূলত এই চার্জের মাধ্যমে আদায় করা হবে।
নেপাল ও ভুটানের ক্ষেত্রেও একই হার
বাংলাদেশের জন্য প্রস্তাবিত হারটি সম্পূর্ণ নতুন কোনো হার নয়। ভারত ইতোমধ্যে নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বিদ্যুৎ বাণিজ্যে প্রতি ইউনিট নির্ধারিত বিদ্যুতের জন্য ০.০০৫ ভারতীয় রুপি হারে একই ধরনের চার্জ নিচ্ছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই হার নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিদ্যুৎ বাণিজ্যে যে হার কার্যকর রয়েছে, সেটিই বাংলাদেশকে দেওয়ার ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
এ দিক থেকে দেখলে বাংলাদেশ আলোচনার মাধ্যমে প্রাথমিক প্রস্তাবিত এক পয়সা থেকে হারটি অর্ধেক করতে পেরেছে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে বিদ্যুৎ আমদানির পরিমাণ বাড়লে এই সামান্য চার্জের মোট অঙ্কও বাড়তে থাকবে।
চুক্তি করতে দেরি হলে বিদ্যুৎ আমদানিতে ঝুঁকি
সংশ্লিষ্ট অর্থ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভারতের বিদ্যুৎ-সংক্রান্ত বিধিবিধানের আওতায় এ ধরনের চুক্তি প্রয়োজন। ফলে চুক্তি স্বাক্ষরে অযথা বিলম্ব হলে ভারত থেকে বাংলাদেশে ১,১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানিতে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় ভারতীয় বিদ্যুৎ এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দেশে গ্যাসের সংকট, জ্বালানি আমদানির বাড়তি ব্যয় এবং বিভিন্ন স্থানীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন সীমাবদ্ধতার কারণে আমদানি করা বিদ্যুতের প্রয়োজন ক্রমেই বাড়ছে।
এই বাস্তবতায় নতুন চার্জের বিষয়টি শুধু অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের প্রশ্ন নয়। বরং এর সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহের ধারাবাহিকতা এবং আন্তঃদেশীয় বিদ্যুৎ বাণিজ্যের স্থিতিশীলতাও জড়িত।
ভারতের কাছ থেকে মোট ২,৬৫৬ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ব্যবস্থা
বিভিন্ন চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ বর্তমানে ভারত থেকে সর্বোচ্চ ২,৬৫৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির ব্যবস্থা রেখেছে।
এর মধ্যে এনটিপিসির একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে এনটিপিসি বিদ্যুৎ ব্যাপার নিগম লিমিটেডের মাধ্যমে ২৫০ মেগাওয়াট, দামোদর ভ্যালি করপোরেশন থেকে ৩০০ মেগাওয়াট, ত্রিপুরা স্টেট ইলেকট্রিসিটি করপোরেশন থেকে ১৬০ মেগাওয়াট, সেম্বকর্প এনার্জি ইন্ডিয়ার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে পিটিসি ইন্ডিয়ার মাধ্যমে ২০০ মেগাওয়াট এবং একই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আরও ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
এই পাঁচটি চুক্তির আওতায় মোট ১,১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ওপরই প্রস্তাবিত নতুন নিষ্পত্তি-সংক্রান্ত চার্জ প্রযোজ্য হবে।
অন্যদিকে ঝাড়খণ্ডের গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আদানি পাওয়ারের মাধ্যমে আরও ১,৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির আলাদা চুক্তি রয়েছে বাংলাদেশের।
আদানির বিদ্যুতের জন্য আলাদা চুক্তি লাগছে না
গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আমদানি করা ১,৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। সংশ্লিষ্ট এক বিদ্যুৎ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আদানি পাওয়ারের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যমান চুক্তির মধ্যেই এই নিষ্পত্তি-সংক্রান্ত চার্জ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তাই ওই বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য নতুন করে আলাদা চুক্তি করার প্রয়োজন হবে না।
এর ফলে প্রস্তাবিত নতুন ব্যবস্থা মূলত অন্যান্য পাঁচটি বিদ্যুৎ আমদানি চুক্তির আওতাধীন ১,১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে।
বিদ্যুৎ আমদানির ওপর নির্ভরতা কেন বাড়ছে
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় ভারতীয় বিদ্যুতের গুরুত্ব বাড়ার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। দেশে গ্যাসের সরবরাহ সংকট থাকায় অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রত্যাশিত মাত্রায় উৎপাদন করতে পারছে না। একই সঙ্গে তরল জ্বালানি আমদানির ব্যয়ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
ফলে দেশে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে আমদানি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হয়ে উঠেছে। ভারত থেকে দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা থাকায় দেশের জাতীয় গ্রিডে এ বিদ্যুৎ এখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তবে আমদানিনির্ভরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর খরচও বাড়ে। বিদ্যুতের মূল মূল্য, পরিবহন ও গ্রিড-সংক্রান্ত ব্যয়, মুদ্রা বিনিময়জনিত ঝুঁকি এবং এখন নতুন নিষ্পত্তি-সংক্রান্ত চার্জ—সবকিছু মিলিয়ে আমদানি করা বিদ্যুতের প্রকৃত ব্যয় নির্ধারিত হয়।
মূল প্রশ্ন এখন মোট আমদানি ব্যয় কতটা বাড়বে
নতুন চার্জের হার কম হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা কম। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশ যদি ভারত থেকে আরও বেশি বিদ্যুৎ নেয় এবং উচ্চমাত্রায় আমদানি অব্যাহত রাখে, তাহলে এই চার্জও নিয়মিত ব্যয়ের অংশ হয়ে দাঁড়াবে।
বিশেষ করে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় আমদানিনির্ভরতা বাড়তে থাকলে প্রতিটি অতিরিক্ত খরচের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। কারণ বিদ্যুৎ আমদানির মোট ব্যয় শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলে।
তবে এর বিপরীত দিকও রয়েছে। বিদ্যুৎ আমদানির মাধ্যমে যদি গ্যাসের সংকট বা স্থানীয় উৎপাদন ঘাটতির সময় জাতীয় গ্রিডে নির্ভরযোগ্য সরবরাহ বজায় রাখা যায়, তাহলে এ ধরনের সীমিত অতিরিক্ত ব্যয়কে বৃহত্তর বিদ্যুৎ নিরাপত্তার অংশ হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
অর্থাৎ বিষয়টি শুধু নতুন চার্জ যোগ হওয়ার নয়; বরং বাংলাদেশ কী দামে, কী শর্তে এবং কতটা নির্ভরতার সঙ্গে প্রতিবেশী দেশ থেকে বিদ্যুৎ সংগ্রহ করছে, সেটিই দীর্ঘমেয়াদে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রস্তাবিত চুক্তি কার্যকর হলে ১,১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যুতের মূল মূল্যের বাইরে নতুন এই চার্জ যুক্ত হবে। হারটি প্রতি ইউনিটে ০.০০৫ ভারতীয় রুপি হওয়ায় একক হিসাবে ব্যয় খুব বেশি নয়। কিন্তু বিদ্যুৎ আমদানির পরিমাণ বড় হওয়ায় দীর্ঘ সময় ধরে এর মোট ব্যয়ও জমতে থাকবে।
বাংলাদেশের জন্য তাই এখন প্রয়োজন শুধু বিদ্যুৎ আমদানির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা নয়, একই সঙ্গে প্রতিটি অতিরিক্ত ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব রাখা এবং আমদানির সঙ্গে দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও এগিয়ে নেওয়া। কারণ আমদানি সাময়িক ঘাটতি সামাল দিতে পারে, কিন্তু টেকসই বিদ্যুৎ নিরাপত্তার জন্য নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা, জ্বালানি সরবরাহ এবং দক্ষ বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

