বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা আমূল বদলে দিতে পারে এমন দুটি বড় সেতু নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে জাপানের নির্মাণ প্রতিষ্ঠান মিয়াগাওয়া কেনসেতসু কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের আওতায় বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তাবিত ভোলা-বরিশাল সেতু এবং শরীয়তপুর-চাঁদপুর সেতু প্রকল্পকে ঘিরে ইতোমধ্যে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্প দুটি বাস্তবায়িত হলে শুধু যোগাযোগ সহজ হবে না, বরং দক্ষিণাঞ্চলের শিল্প, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানে নতুন গতি আসবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজধানীতে অনুষ্ঠিত অষ্টম বাংলাদেশ-জাপান যৌথ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব প্ল্যাটফর্ম বৈঠকে জাপানি প্রতিষ্ঠানটি আনুষ্ঠানিকভাবে এই দুই প্রকল্প বাস্তবায়নের আগ্রহের কথা জানায়। বৈঠকে দুই দেশই প্রকল্পগুলোকে যৌথ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের আওতায় এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান তুলে ধরে।
দুই সেতু নির্মাণে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা, যা প্রায় ৩ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রকল্প দুটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করে ২০৩২ ও ২০৩৩ সালের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের নীতিমালা অনুযায়ী সেতু নির্মাণে বেসরকারি বিনিয়োগ এলেও জমি অধিগ্রহণের ব্যয় বহন করবে বাংলাদেশ সরকার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় অবকাঠামো নির্মাণে সরকারি অর্থের ওপর চাপ কমাতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব মডেলের ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ত করা সম্ভব হলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন আরও দ্রুত ও কার্যকর হতে পারে।
সবচেয়ে বড় প্রকল্পটি হচ্ছে ভোলা-বরিশাল সেতু। প্রায় ১০ দশমিক ৮৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতু নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা। নির্মাণ শেষ হলে এটি হবে বাংলাদেশের দীর্ঘতম সেতু। দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্ন থাকা দ্বীপ জেলা ভোলার সঙ্গে বরিশালের স্থায়ী সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হবে, যা দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের যাতায়াত এবং পণ্য পরিবহনে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে।
এই সেতু নিয়ে ২০২৪ সালে করা সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে, আগামী ৩০ বছরে এটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে শূন্য দশমিক ৮৬ শতাংশ পর্যন্ত অবদান রাখতে পারে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নতুন শিল্প স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ সহজ করার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বর্তমানে সরকারের লক্ষ্য ২০৩৩ সালের মধ্যে সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ করা।
অন্যদিকে, শরীয়তপুর-চাঁদপুর সেতু হবে প্রায় ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ। মেঘনা নদীর ওপর নির্মিতব্য এই সেতুর সম্ভাব্য ব্যয় ১৫ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা। পরিকল্পনা অনুযায়ী এটি চাঁদপুরের হরিনা ফেরিঘাট এবং শরীয়তপুরের সখিপুরকে যুক্ত করবে।
এই সেতু নির্মিত হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলা সরাসরি দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ১১টি জেলার সঙ্গে যুক্ত হবে। ফলে ফেরিনির্ভর যোগাযোগের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং খুলনা থেকে চট্টগ্রাম যেতে প্রায় ৯০ কিলোমিটার পথ কম অতিক্রম করতে হবে। এতে রাজধানীকেন্দ্রিক যানবাহনের চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রকল্পটি ২০৩২ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কোনো প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি কাজ দেওয়া হবে না। প্রথমে একজন লেনদেন পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হবে, যিনি প্রকল্পের আর্থিক ও কারিগরি সম্ভাব্যতা মূল্যায়ন করবেন। এরপর আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব আহ্বান করা হবে। সব প্রস্তাব মূল্যায়নের পরই চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের দিকে এগোবে সরকার। অর্থাৎ পুরো প্রক্রিয়াটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ও যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়েই সম্পন্ন হবে।
বাংলাদেশে মিয়াগাওয়া কেনসেতসুর স্থানীয় অংশীদার হিসেবে কাজ করছে স্ট্যালিয়ন ক্যাপিটাল লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান সাঈদ ইব্রাহিম আহমেদের মতে, ভোলা-বরিশাল সেতু কেবল একটি যোগাযোগ প্রকল্প নয়; এটি দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
বৈঠকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে ভোলা-লক্ষ্মীপুর সেতুর ধারণাও জাপানি প্রতিনিধিদের সামনে উপস্থাপন করা হয়। জাপানের পক্ষ থেকে এই প্রকল্পেও আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ভবিষ্যতে এই সেতু নির্মিত হলে মেঘনা নদীর দুই পাড়ের বিস্তীর্ণ অঞ্চল আরও কার্যকরভাবে সংযুক্ত হবে এবং দক্ষিণাঞ্চলের বাণিজ্যিক কার্যক্রম নতুন গতি পাবে।
বৈঠকে শুধু সেতু নয়, চট্টগ্রামে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প এবং বাংলাদেশের পুরোনো রেলসেতুগুলো আধুনিকায়নে জাপানের কারিগরি সহযোগিতার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি কমলাপুর বহুমুখী পরিবহন কেন্দ্র, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ, আউটার রিং রোড এবং স্থানীয় সেতু উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হয়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে যোগাযোগ অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা দীর্ঘদিন ধরেই শিল্প ও বিনিয়োগের বড় বাধা। যদি প্রস্তাবিত সেতু প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে পণ্য পরিবহনের সময় ও খরচ কমবে, নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হবে এবং পর্যটন, কৃষি ও রপ্তানি খাতও নতুন গতি পাবে। একই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।

