দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলায় অবস্থিত তাদের ১১টি ভারী শিল্পকারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত হাজার হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিককে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট, ব্যাংকিং জটিলতা এবং কাঁচামাল আমদানিতে অক্ষমতাই এই সিদ্ধান্তের মূল কারণ বলে জানা গেছে।
শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, গত বছরের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকেই গ্রুপটির ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে শুরু করে। ব্যাংক হিসাব পরিচালনা, নতুন ঋণ সুবিধা এবং আর্থিক লেনদেন জটিল হয়ে পড়ায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে উৎপাদন সক্ষমতা হারাতে থাকে। পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে নতুন ঋণপত্র খুলে বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করাও সম্ভব হয়নি। ফলে একপর্যায়ে উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ করে কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।
বন্ধ হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ, এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস, ইনফিনিটি সিআর স্ট্রিপস ইন্ডাস্ট্রিজ, এস আলম স্টিল, এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস (এনওএফ), চেমন ইস্পাত, গ্যালকো স্টিল, এস আলম ব্যাগ লিমিটেড, এস আলম সিমেন্ট, এস আলম ভেজিটেবল অয়েল মিলসসহ আরও কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এসব কারখানার অধিকাংশই ইস্পাত, চিনি, সিমেন্ট ও ভোজ্যতেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
স্থানীয় ও কারখানা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক পরিবর্তনের আগে কর্ণফুলীর এসব কারখানায় প্রায় ৪ হাজার শ্রমিক কাজ করতেন। এর মধ্যে প্রায় আড়াই হাজার ছিলেন স্থায়ী এবং দেড় হাজার অস্থায়ী কর্মী। কিন্তু উৎপাদন কমে যাওয়ার পর ধাপে ধাপে কর্মীসংখ্যা কমানো শুরু হয়। কখনও ৩০০, কখনও ৪০০, আবার কখনও ৫০০ জন করে শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার কারখানার নোটিশ বোর্ডে চূড়ান্ত ছাঁটাই তালিকা প্রকাশ করা হয় এবং ১ আগস্ট থেকে সব কারখানার কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
এই সিদ্ধান্তে শ্রমিকদের মধ্যে চরম অনিশ্চয়তা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। অনেকের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে কারখানায় কাজ করার পর হঠাৎ করেই চাকরি হারাতে হয়েছে। তারা বলছেন, কোনো বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় পরিবার নিয়ে বড় ধরনের সংকটে পড়তে হবে।
এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজের কয়েকজন শ্রমিক জানান, নোটিশে ১ আগস্ট থেকে তালিকাভুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরি থেকে অব্যাহতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আকস্মিক এই সিদ্ধান্তে অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
কারখানার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘ সময় ধরে উৎপাদন বন্ধ থাকায় প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা আর সম্ভব হচ্ছিল না। তাই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিজ নিজ দায়িত্বে চলে যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
মানবসম্পদ বিভাগের এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, গত প্রায় দুই বছর নানা ধরনের ব্যাংকিং জটিলতা সত্ত্বেও শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করে কারখানা চালিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে গ্রুপটির হাতে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ নেই, ব্যাংক থেকেও নতুন অর্থায়ন পাওয়া যাচ্ছে না। একই সঙ্গে বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন সচল রাখার কোনো বাস্তবসম্মত উপায় অবশিষ্ট ছিল না।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর একসঙ্গে এতগুলো কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া শুধু সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের জন্য নয়, স্থানীয় অর্থনীতি, সরবরাহব্যবস্থা এবং শিল্প খাতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। ইস্পাত, চিনি, সিমেন্ট ও ভোজ্যতেলের মতো খাতে উৎপাদন কমে গেলে বাজারে সরবরাহ ও কর্মসংস্থানের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে এটি দেশের শিল্পখাতে ব্যাংকনির্ভর অর্থায়ন, তারল্য সংকট এবং কাঁচামাল আমদানির সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

