দেশের বাজারে সুগন্ধি চালের দাম নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে বিভিন্ন মানের সুগন্ধি চালের প্রতি কেজিতে ৬০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। বাজারে এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ ক্রেতারা যেমন চাপে পড়েছেন, তেমনি সামনে উৎসব ও সামাজিক অনুষ্ঠানের মৌসুমকে ঘিরে আরও দাম বাড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, আগে যে খোলা পোলাওয়ের চাল ১৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতো, এখন একই চালের দাম মানভেদে ১৭০ থেকে ২০০ টাকায় পৌঁছেছে। অন্যদিকে প্যাকেটজাত সুগন্ধি চালের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও কেজিপ্রতি প্রায় ২১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা সাধারণ ভোক্তাদের জন্য বেশ ব্যয়বহুল।
খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে সুগন্ধি চালের রপ্তানি বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাজারে সরবরাহের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এর প্রভাব প্রথমে পাইকারি বাজারে পড়ে, পরে সেই বাড়তি দাম খুচরা বাজারেও চলে আসে। ফলে আগের তুলনায় বেশি দামে চাল কিনতে হচ্ছে ক্রেতাদের।
পাইকারি ব্যবসায়ীদের মতে, বিশেষ করে বিদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের মধ্যে চিনিগুড়া চালের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই বাড়তি চাহিদার কারণে রপ্তানিও বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত লাভের আশায় চাল মজুত করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে, যা বাজারে সরবরাহ আরও সংকুচিত করছে।
তবে ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মূল্যায়ন ভিন্ন। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামান মনে করেন, বাজারে চালের প্রকৃত কোনো ঘাটতি নেই। তাঁর মতে, অতিরিক্ত মুনাফার উদ্দেশ্যে কিছু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে রাখছেন। তাই বাজারে নিয়মিত নজরদারি ও কার্যকর তদারকি বাড়ানো প্রয়োজন।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুই দফায় মোট ২৩ হাজার ৯৫৯ টন সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়ীদের একটি অংশের মতে, এই রপ্তানি দেশের কৃষি ও বৈদেশিক আয়ের জন্য ইতিবাচক হলেও অভ্যন্তরীণ বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত না করলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কোনো পণ্যের রপ্তানি বাড়লে তা দেশের জন্য ইতিবাচক হতে পারে, তবে একই সঙ্গে স্থানীয় বাজারের ভারসাম্য বজায় রাখাও জরুরি। উৎপাদন, মজুত ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ না করলে ভোক্তাদের ওপর মূল্যবৃদ্ধির চাপ আরও বাড়বে। তাই বাজারে স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করা, অবৈধ মজুতদারি নিয়ন্ত্রণ করা এবং প্রয়োজন হলে রপ্তানি ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার মধ্যে সমন্বয় করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সুগন্ধি চাল ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। বাজারে যদি সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হয় এবং মূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তাহলে আগামী সপ্তাহগুলোতে এই চালের দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

