বাংলাদেশের রপ্তানি খাত আবারও বড় ধরনের লজিস্টিক সংকটের মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো বাংলাদেশ থেকে রপ্তানির জন্য কনটেইনার বুকিং উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেওয়ায় পণ্য পাঠাতে হিমশিম খাচ্ছেন রপ্তানিকারক, বায়িং হাউস ও ফ্রেইট ফরোয়ার্ডাররা। এর ফলে শুধু পণ্য পাঠাতে বিলম্বই হচ্ছে না, একই সঙ্গে পরিবহন ব্যয়ও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে এবং ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা অন্য দেশের দিকে ঝুঁকতে পারেন।
খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, আগে যেখানে রপ্তানি কনটেইনারের বুকিং তুলনামূলক সহজে পাওয়া যেত, এখন অনেক ক্ষেত্রেই বুকিং মিলছে না। কোথাও কোথাও বুকিং পাওয়া গেলেও পণ্য পাঠাতে অতিরিক্ত দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগছে। অর্থাৎ ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর নির্ধারিত সময়ে ক্রেতার কাছে পণ্য পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সবচেয়ে বড় চাপ পড়েছে পরিবহন ব্যয়ে। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্রগামী একটি কনটেইনার পাঠানোর খরচ প্রায় আড়াই গুণ বেড়েছে। আগে যেখানে প্রতি কনটেইনারের জন্য প্রায় ৪ হাজার ৫০০ ডলার ব্যয় হতো, এখন একই কনটেইনার পাঠাতে ১১ হাজার ডলারেরও বেশি গুনতে হচ্ছে। ইউরোপের বিভিন্ন গন্তব্যেও একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে, জার্মানির হামবুর্গে একটি কনটেইনার পাঠাতে আগে যেখানে প্রায় ২ হাজার ৫০০ ডলার লাগত, বর্তমানে সেই ব্যয় বেড়ে প্রায় ৬ হাজার ডলারে পৌঁছেছে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন যেসব রপ্তানিকারক ডেলিভারড ডিউটি পেইড পদ্ধতিতে পণ্য সরবরাহ করেন। এ ব্যবস্থায় বিদেশি ক্রেতার গুদাম পর্যন্ত পণ্য পৌঁছে দেওয়ার পুরো পরিবহন ব্যয় রপ্তানিকারককেই বহন করতে হয়। ফলে ফ্রেইট রেট বেড়ে যাওয়ার পুরো চাপ তাদের ওপরই পড়ছে। অন্যদিকে ফ্রি অন বোর্ড পদ্ধতিতে রপ্তানির ক্ষেত্রে সমুদ্রপথের ভাড়া সাধারণত বিদেশি ক্রেতারা বহন করায় তারা তুলনামূলক কম চাপের মধ্যে রয়েছেন।
দেশের অন্যতম বড় পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি স্প্যারো গ্রুপ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রগামী কনটেইনার বুকিং পাওয়া এখন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। তাদের ভাষ্য, সময়মতো পণ্য পৌঁছাতে না পারলে একদিকে যেমন প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হবে, অন্যদিকে ভবিষ্যতের ক্রয়াদেশও ঝুঁকির মুখে পড়বে। একই সঙ্গে বাড়তি পরিবহন ব্যয় উৎপাদন খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
একটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বায়িং হাউসের ঢাকা কার্যালয় জানিয়েছে, তারা প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে ১০টি কনটেইনারের বুকিং নিশ্চিত করার চেষ্টা করেও সফল হয়নি। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে অনেক বেশি ভাড়ায় বুকিং নিতে হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অন্তত দুই থেকে তিন সপ্তাহ দেরিতে পণ্য ক্রেতার কাছে পৌঁছাবে, যা ভবিষ্যতের ব্যবসায়িক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
রপ্তানিকারক ও ফ্রেইট ফরোয়ার্ডারদের একটি অংশের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে কনটেইনারের জায়গা সীমিত করে পরিবহন ভাড়া বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করছে। তাদের দাবি, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের চেষ্টা চলছে। যদিও এ অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে শিপিং কোম্পানিগুলো।
শিপিং কোম্পানিগুলোর ব্যাখ্যা ভিন্ন। তাদের দাবি, মধ্যপ্রাচ্য ও লোহিত সাগরের চলমান সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক নৌপরিবহনে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। অনেক জাহাজ বিকল্প পথে চলাচল করায় পরিবহন সক্ষমতা কমে গেছে। একই সময়ে চীন থেকে বিপুল পরিমাণ কনটেইনার বুকিং আসায় সেসব রুটে বেশি জায়গা বরাদ্দ দিতে হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের জন্য বরাদ্দ কমে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো এখান থেকে অধিকাংশ কনটেইনার সরাসরি বড় জাহাজে ওঠে না। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ছোট জাহাজে করে কনটেইনার প্রথমে শ্রীলঙ্কার কলম্বো, মালয়েশিয়ার পোর্ট ক্লাং কিংবা সিঙ্গাপুরের মতো আঞ্চলিক বন্দরে নেওয়া হয়। এরপর সেখান থেকে বড় জাহাজে ইউরোপ ও আমেরিকার গন্তব্যে পাঠানো হয়। বর্তমানে এই হাব বন্দরগুলোতে চীনা পণ্যের চাপ বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের কনটেইনারের জন্য জায়গা আরও কমে গেছে।
ব্যবসায়ীরা সতর্ক করে বলেছেন, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে অনেক রপ্তানিকারক সময় বাঁচাতে আকাশপথে পণ্য পাঠাতে বাধ্য হতে পারেন। কিন্তু বিমানপথে পণ্য পরিবহনের খরচ সমুদ্রপথের তুলনায় অনেক বেশি। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, লাভ কমবে এবং শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা দুর্বল হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু সাময়িক পরিবহন সংকট নয়; বরং দেশের রপ্তানি খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, সীমিত সমুদ্রবন্দর সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক শিপিং বাজারে বাংলাদেশের তুলনামূলক দুর্বল অবস্থান এই সংকটকে আরও প্রকট করে তুলেছে। যদি কনটেইনার সংকট ও অতিরিক্ত ফ্রেইট ব্যয় দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়, তাহলে ক্রেতারা বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকতে পারেন। ফলে তৈরি পোশাকসহ দেশের প্রধান রপ্তানি খাতগুলোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

