বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি খাত নতুন এক আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছে। রাশিয়ায় পোশাক রপ্তানি করেও ৯টি বাংলাদেশি বায়িং হাউস এখনো তাদের পাওনা অর্থ বুঝে পায়নি। দীর্ঘদিন ধরে অর্থ আদায়ের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো আইনের আশ্রয় নেওয়ার পাশাপাশি সরকারের সহযোগিতাও চেয়েছে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, আটকে থাকা অর্থের পরিমাণ ৫০ কোটি টাকারও বেশি।
ঘটনার সূত্রপাত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চলাকালে। সে সময় বাংলাদেশের অন্যতম বড় আন্তর্জাতিক পোশাক ক্রেতা পোল্যান্ডভিত্তিক ফ্যাশন প্রতিষ্ঠান এলপিপি তাদের আগের সরবরাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনে। আগে প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন দেশের নিজস্ব বিক্রয়কেন্দ্রে বাংলাদেশ থেকে পোশাক সরবরাহ নিত। কিন্তু যুদ্ধের সময় তারা বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের ই-মেইলের মাধ্যমে অনুরোধ জানায়, রাশিয়ার খুচরা বিক্রেতা এফইএস রিটেইলের কাছে পণ্য পাঠাতে। একই সঙ্গে আশ্বাস দেওয়া হয়, পণ্যের মূল্য যথাসময়ে পরিশোধ করা হবে।
ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের সেই আশ্বাসের ভিত্তিতেই বাংলাদেশি বায়িং হাউসগুলো রাশিয়ায় পোশাক পাঠায়। অভিযোগ অনুযায়ী, পণ্য ঠিকই গ্রহণ করেছে এফইএস রিটেইল, কিন্তু প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করা হয়নি। রপ্তানিকারকদের দাবি, এই লেনদেনে অর্থ পরিশোধের দায়িত্ব ছিল এলপিপির। কিন্তু বারবার যোগাযোগ করেও তারা কোনো সন্তোষজনক সমাধান পাননি।
পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলো আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। একই সঙ্গে তারা সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতাও চেয়েছে, যাতে কূটনৈতিক ও আইনি উভয় পর্যায়ে বিষয়টির সমাধান সম্ভব হয়।
বাংলাদেশ বায়িং হাউস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুল হামিদ জানিয়েছেন, সংগঠনের পক্ষ থেকে একাধিকবার এলপিপির সঙ্গে যোগাযোগ করে পাওনা অর্থ পরিশোধের অনুরোধ জানানো হলেও ইতিবাচক কোনো সাড়া মেলেনি। তার ভাষ্য, ৯টি বায়িং হাউসের আটকে থাকা মোট অর্থের পরিমাণ ৫০ কোটি টাকারও বেশি।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত রপ্তানিকারকরা পররাষ্ট্র, বাণিজ্য, অর্থ এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সহায়তা চেয়েছেন। পাশাপাশি বিষয়টি বাংলাদেশে রাশিয়া ও পোল্যান্ডের দূতাবাসকেও অবহিত করা হয়েছে, যাতে দ্রুত সমাধানের পথ বের করা যায়।
ব্যবসায়িক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা শুধু কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতির বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অর্থ পরিশোধের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা কিংবা ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার সময় আন্তর্জাতিক লেনদেনে ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। তাই ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে রপ্তানিকারকদের জন্য আরও শক্তিশালী অর্থপ্রদানের নিশ্চয়তা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি সহায়তা কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো এই বিরোধের সমাধান না হলে শুধু তৈরি পোশাক খাত নয়, বাংলাদেশের অন্যান্য রপ্তানি খাতের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে চুক্তির শর্ত, অর্থপ্রদানের নিশ্চয়তা এবং ঝুঁকি মূল্যায়নের বিষয়গুলো ভবিষ্যতে আরও কঠোরভাবে বিবেচনা করার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।

