রাজধানীর বিভিন্ন গ্যাস ভরার কেন্দ্রের সামনে এখন প্রায় প্রতিদিন একই দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। কোথাও শত শত অটোরিকশা, ব্যক্তিগত গাড়ি ও ছোট যাত্রীবাহী যান দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে আছে। ভোরে শুরু হওয়া অপেক্ষা অনেক ক্ষেত্রে গড়াচ্ছে রাত পর্যন্ত। দুই বা তিন ঘণ্টা নয়, বহু চালককে তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা, এমনকি পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টাও লাইনে থাকতে হচ্ছে। এত দীর্ঘ অপেক্ষার পরও কেউ পাচ্ছেন ৭০ টাকার গ্যাস, কেউ ৮০ টাকা, আবার কারও ভাগ্যে জুটছে সর্বোচ্চ ২০০ টাকার গ্যাস।
প্রথম দেখায় এটিকে চালকদের ব্যক্তিগত দুর্ভোগ মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে সংকটটির প্রভাব আরও বিস্তৃত। প্রতিটি গাড়ি যতক্ষণ গ্যাসের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে, ততক্ষণ সেটি যাত্রী বহন করতে পারে না, পণ্য পৌঁছে দিতে পারে না এবং কোনো আয়ও তৈরি করতে পারে না। অর্থাৎ, প্রতিটি অপেক্ষার ঘণ্টা দেশের উৎপাদনশীল কর্মসময় থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।
এই ক্ষতি জাতীয় বাজেটের কোনো আলাদা খাতে দেখা যায় না। মোট দেশজ উৎপাদনের হিসাবেও প্রতিদিনের হারানো সময় সরাসরি ধরা পড়ে না। তবু এর প্রভাব ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে চালকের আয়, যাত্রীভাড়া, ব্যবসার ব্যয়, পণ্য পরিবহন, শিল্প উৎপাদন এবং বাজারের দামের ওপর।
সংকটের শুরু কোথায়
বর্তমান গ্যাস সংকটের বড় কারণ কক্সবাজারের মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস টার্মিনালে ঘটে যাওয়া অগ্নিকাণ্ড ও যান্ত্রিক ত্রুটি। ঘটনাটি ঘটে গত ২১ জুলাই। এর ফলে জাতীয় গ্যাস সরবরাহব্যবস্থায় প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ কমে গেছে।
দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। অথচ বর্তমান সরবরাহ নেমে এসেছে ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটে। আগে থেকেই চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ব্যবধান ছিল। টার্মিনালের সমস্যার কারণে সেই ঘাটতি আরও তীব্র হয়েছে। এর প্রভাব একসঙ্গে পড়ছে বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা, সার কারখানা, আবাসিক গ্রাহক এবং যানবাহনের গ্যাস সরবরাহের ওপর।
রাজধানীর তেজগাঁও, মগবাজার, মালিবাগ, গাবতলী, কাওরান বাজার, যাত্রাবাড়ী, বাড্ডা, উত্তরা, মিরপুর, বনশ্রী, খিলগাঁও, মতিঝিল ও সবুজবাগসহ প্রায় সব এলাকার গ্যাস ভরার কেন্দ্রেই দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে।
অনেক কেন্দ্রে এক থেকে দেড় ঘণ্টা গ্যাস সরবরাহের পর তা আবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে চালকেরা কখন গ্যাস পাবেন, তার কোনো নিশ্চয়তা থাকছে না। কেউ কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করে সামান্য গ্যাস পাচ্ছেন, আবার কেউ দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকেও খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন।
একজন চালকের কতটা সময় ও আয় হারাচ্ছে
স্বাভাবিক সময়ে একজন গ্যাসচালিত অটোরিকশাচালক দিনে প্রায় ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা গাড়ি চালাতে পারেন। এই সময়ে তিনি সাধারণত ১২ থেকে ১৫টি যাত্রা সম্পন্ন করেন। কিন্তু বর্তমানে গ্যাসের লাইনে দাঁড়িয়েই তার কর্মদিবসের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শেষ হয়ে যাচ্ছে।
প্রতিদিন তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা নষ্ট হওয়ার অর্থ হলো, একজন চালক আগের তুলনায় কয়েকটি যাত্রা কম করতে বাধ্য হচ্ছেন। যেখানে আগে একটি নির্দিষ্ট সময়ে তিন বা চারটি যাত্রা দেওয়া যেত, এখন সেই সময়টি কেটে যাচ্ছে গ্যাসের অপেক্ষায়।
ফলে চালকের আয় কমছে, অথচ গাড়ির মালিককে দৈনিক জমা, পরিবারের খরচ, খাবার, চিকিৎসা এবং অন্যান্য ব্যয় আগের মতোই বহন করতে হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জ্বালানির সন্ধানে একাধিক কেন্দ্রে ঘুরতে গিয়ে অতিরিক্ত সময় ও অর্থও ব্যয় হচ্ছে।
চালকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এখন প্রতিদিন তাদের আয় কয়েকশ টাকা পর্যন্ত কমে যাচ্ছে। সারা দিন রাস্তায় থেকেও অনেকে আগের মতো জমার টাকা তুলতে পারছেন না। এতে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ছেন সেই চালকেরা, যাদের পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় পুরোপুরি দিনের আয়ের ওপর নির্ভরশীল।
একদিনের আয় কমে গেলে নিম্ন আয়ের পরিবারে তার প্রভাব সঙ্গে সঙ্গেই পড়ে। বাজারের খরচ কমাতে হয়, ঋণ নিতে হয় অথবা চিকিৎসা ও শিক্ষার মতো প্রয়োজনীয় ব্যয় পিছিয়ে দিতে হয়।
প্রতিদিন কত কর্মঘণ্টা হারিয়ে যাচ্ছে
বাংলাদেশে নিবন্ধিত গ্যাসচালিত অটোরিকশা, ব্যক্তিগত গাড়ি, ছোট যাত্রীবাহী যান এবং অন্যান্য যানবাহনের সংখ্যা কয়েক লাখ। এর মধ্যে শুধু এক লাখ চালকও যদি প্রতিদিন গড়ে তিন ঘণ্টা করে গ্যাসের লাইনে দাঁড়ান, তাহলে একদিনেই প্রায় ৩ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়।
লাইনে থাকা চালকের সংখ্যা দুই লাখ হলে প্রতিদিনের হারানো কর্মঘণ্টা বেড়ে দাঁড়ায় ৬ লাখে।
এই হিসাবের মধ্যে শুধু চালকদের সময় ধরা হয়েছে। কিন্তু এর সঙ্গে যাত্রীদের অপেক্ষা, পণ্য পৌঁছাতে বিলম্ব, কর্মীদের কর্মস্থলে দেরিতে পৌঁছানো এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বাধার সময় যোগ করলে প্রকৃত ক্ষতি আরও অনেক বড় হতে পারে।
একজন চালকের তিন ঘণ্টা সময় নষ্ট হওয়া শুধু তিন ঘণ্টার ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়। ওই সময়ে তিনি যেসব যাত্রী বহন করতে পারতেন, তাদেরও বিকল্প যানবাহন খুঁজতে সময় ব্যয় করতে হচ্ছে। একইভাবে পণ্যবাহী কোনো যান আটকে থাকলে দোকান, বাজার বা কারখানায় পণ্য পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে।
অর্থনীতিতে সময়েরও একটি মূল্য রয়েছে। কর্মক্ষম মানুষ যখন উৎপাদনশীল কাজের পরিবর্তে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন, তখন দেশের সামগ্রিক দক্ষতা কমে যায়। হারানো এই সময় পরে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় না।
যাত্রীদের ভোগান্তিও বাড়ছে
গ্যাস সংকটের কারণে রাস্তায় গ্যাসচালিত যানবাহনের সংখ্যা কমে গেছে। অনেক চালক পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় পুরো দিন গাড়ি চালাতে পারছেন না। এর ফলে যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
যানবাহনের সরবরাহ কমে যাওয়ায় ভাড়াও বাড়ছে। অনেক চালক বলছেন, অল্প গ্যাস দিয়ে সীমিত সংখ্যক যাত্রা করতে হচ্ছে। আগের ভাড়ায় যাত্রী বহন করলে তাদের দৈনিক খরচ ও গাড়ির জমা উঠছে না।
ফলে সংকটের ব্যয় শেষ পর্যন্ত যাত্রীর ওপরও চাপছে। চালকের হারানো আয় বাড়তি ভাড়ার মাধ্যমে পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। যেসব মানুষ প্রতিদিন কাজ, শিক্ষা বা চিকিৎসার প্রয়োজনে গ্যাসচালিত যানবাহনের ওপর নির্ভর করেন, তাদের মাসিক যাতায়াত ব্যয় বাড়ছে।
একই সঙ্গে যানবাহনের সংখ্যা কমে যাওয়ায় সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে। একজন কর্মজীবী মানুষ দেরিতে অফিসে পৌঁছালে তার কর্মসময় কমে যায়। একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সময়মতো বাজারে পৌঁছাতে না পারলে তার বিক্রিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পরিবহন থেকে শিল্পে ছড়িয়ে পড়ছে চাপ
গ্যাস সংকট শুধু যানবাহনের জ্বালানি সরবরাহে সীমাবদ্ধ নেই। দেশের বিভিন্ন শিল্পকারখানায়ও পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও উৎপাদন কমিয়ে দিতে হচ্ছে, আবার কোথাও যন্ত্রপাতি দীর্ঘ সময় বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
তৈরি পোশাক, বস্ত্র, সিরামিক, ইস্পাত, কাচ এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পের বিভিন্ন ধাপে গ্যাসের প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে রং করা, ধোয়া, বাষ্প তৈরি, শুকানো এবং সমাপ্ত পণ্য প্রস্তুতের কাজে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ জরুরি।
গ্যাসের চাপ কমে গেলে উৎপাদনের ধারাবাহিকতা ভেঙে যায়। যন্ত্রপাতি ও শ্রমিক প্রস্তুত থাকলেও কাজ বন্ধ রাখতে হয়। কিন্তু শ্রমিকের মজুরি, কারখানার ভাড়া, ব্যাংকঋণের কিস্তি এবং অন্যান্য স্থায়ী ব্যয় চলতেই থাকে।
এতে প্রতিটি পণ্য উৎপাদনের ব্যয় বেড়ে যায়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রপ্তানি চালান প্রস্তুত করাও কঠিন হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা সময়মতো পণ্য না পেলে দেশের সরবরাহব্যবস্থার ওপর আস্থা হারাতে পারেন। এর প্রভাব ভবিষ্যতের ক্রয়াদেশেও পড়তে পারে।
বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর শিল্পে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি চালান কয়েক দিন দেরি হলে পণ্য উড়োজাহাজে পাঠাতে হতে পারে, যার পরিবহন ব্যয় জাহাজের তুলনায় অনেক বেশি। আবার নির্ধারিত মৌসুমে পণ্য না পৌঁছালে ক্রেতা মূল্য কমিয়ে দিতে পারে অথবা ক্রয়াদেশ বাতিল করতে পারে।
সুতরাং গ্যাসের সংকট শুধু বর্তমান উৎপাদন কমাচ্ছে না; এটি দেশের ভবিষ্যৎ রপ্তানি আয় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
সরবরাহব্যবস্থা ধীর হলে বাজারে কী ঘটে
পরিবহন খাত কোনো দেশের অর্থনীতির রক্তসঞ্চালনের মতো কাজ করে। কাঁচামাল, শ্রমিক, খাদ্যপণ্য এবং তৈরি পণ্য এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছানোর ওপর পুরো বাজারব্যবস্থা নির্ভর করে।
যখন হাজার হাজার যানবাহন ঘণ্টার পর ঘণ্টা গ্যাসের লাইনে আটকে থাকে, তখন পুরো সরবরাহশৃঙ্খল ধীর হয়ে যায়। সময়মতো কাঁচামাল না পৌঁছালে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়। পণ্য বাজারে পৌঁছাতে দেরি হলে দোকান ও পাইকারি বাজারে সরবরাহ কমে যেতে পারে।
সরবরাহ কমে গেলে এবং পরিবহন ব্যয় বাড়লে ব্যবসায়ীরা সাধারণত সেই বাড়তি ব্যয় পণ্যের দামের সঙ্গে যোগ করেন। ফলে গ্যাসের সংকট শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা দীর্ঘস্থায়ী হলে নতুন বিনিয়োগও নিরুৎসাহিত হয়। কোনো বিনিয়োগকারী যদি নিশ্চিত না হন যে তার কারখানায় নিয়মিত গ্যাস পাওয়া যাবে, তাহলে তিনি নতুন প্রকল্প শুরু করতে বা বিদ্যমান কারখানা সম্প্রসারণ করতে দ্বিধায় পড়বেন।
এর ফলে শিল্প সম্প্রসারণ কমে, নতুন কর্মসংস্থান তৈরির গতি ধীর হয় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা দুর্বল হয়ে পড়ে।
বাসাবাড়িতেও বাড়ছে দুর্ভোগ
রাজধানীর বনশ্রী, বাড্ডা, খিলগাঁও, যাত্রাবাড়ী, মিরপুর, মতিঝিল ও ফকিরাপুলসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনের বড় অংশে গ্যাসের চাপ থাকছে না।
অনেক পরিবার রান্নার জন্য বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে। এতে একদিকে পরিবারের বিদ্যুৎ ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে জাতীয় বিদ্যুৎব্যবস্থার ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
যেসব পরিবারে বৈদ্যুতিক চুলা নেই, তারা আরও বেশি সমস্যায় পড়ছেন। রান্নার সময় পরিবর্তন করতে হচ্ছে, বাইরে থেকে খাবার কিনতে হচ্ছে অথবা বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে।
ফলে গ্যাস সংকটের আর্থিক চাপ শুধু চালক ও শিল্পমালিকদের ওপর নয়; সাধারণ পরিবারের দৈনন্দিন জীবনেও ছড়িয়ে পড়েছে।
তাপপ্রবাহের ক্ষতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন সংকট
বাংলাদেশের উৎপাদনশীলতা আগে থেকেই তীব্র গরম ও তাপপ্রবাহের কারণে চাপে রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু ২০২৪ সালেই তীব্র গরমের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ১ দশমিক ৩ থেকে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতি হয়েছে।
ঢাকায় প্রতিবছর প্রায় ৪ লাখ ৬৫ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ কর্মঘণ্টা তাপের কারণে হারিয়ে যাচ্ছে। এই ক্ষতি ২০৮০ সালে বেড়ে ১৬ লাখ ৫০ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণে পৌঁছাতে পারে।
এই তাপজনিত ক্ষতির সঙ্গে এখন যুক্ত হচ্ছে গ্যাসের লাইনে অপেক্ষা, পরিবহন বিলম্ব এবং শিল্প উৎপাদন কমে যাওয়ার চাপ।
একজন চালক তীব্র গরমে পাঁচ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলে তিনি শুধু সময় হারাচ্ছেন না; তার শারীরিক সক্ষমতাও কমে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় গরমে অপেক্ষার পর বাকি সময়ে স্বাভাবিক দক্ষতায় গাড়ি চালানো কঠিন হতে পারে।
এভাবে তাপপ্রবাহ ও গ্যাস সংকট একসঙ্গে দেশের শ্রম উৎপাদনশীলতার ওপর দ্বিগুণ চাপ তৈরি করছে।
সংকট কত দিন চলতে পারে
পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস টার্মিনালের যান্ত্রিক ত্রুটি মেরামতে দেশি ও বিদেশি বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন। মেরামত শেষ হলে সরবরাহ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে টার্মিনাল পুরোপুরি সচল না হওয়া পর্যন্ত সংকট পুরোপুরি কাটার সম্ভাবনা কম।
একটি টার্মিনালের সমস্যায় যদি দেশের গ্যাস সরবরাহে এত বড় ঘাটতি তৈরি হয়, তাহলে জ্বালানি অবকাঠামোর স্থায়িত্ব ও বিকল্প ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
জরুরি পরিস্থিতিতে বিকল্প সরবরাহের ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত, কোথায় মজুত ক্ষমতা রয়েছে এবং কোন খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন।
শুধু সাময়িক মেরামত যথেষ্ট নয়
বর্তমান সংকট সমাধানে ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল দ্রুত সচল করা জরুরি। কিন্তু শুধু একটি যান্ত্রিক ত্রুটি মেরামত করলেই দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো, সরবরাহব্যবস্থার অপচয় কমানো, পুরোনো পাইপলাইন সংস্কার এবং অবৈধ সংযোগ বন্ধ করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে যানবাহনের জন্য গ্যাসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমাতে হবে। বিদ্যুৎচালিত গণপরিবহন, দক্ষ বাসব্যবস্থা এবং বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকটের প্রভাব কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।
গ্যাস ভরার কেন্দ্রগুলোতে সরবরাহের নির্দিষ্ট সময়সূচি প্রকাশ করা এবং কোন কেন্দ্রে কতটুকু গ্যাস রয়েছে, তা নাগরিকদের জানানোও জরুরি। এতে চালকেরা এক কেন্দ্র থেকে অন্য কেন্দ্রে অযথা ঘুরে সময় ও জ্বালানি নষ্ট করবেন না।
জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং সঠিক অগ্রাধিকারও গুরুত্বপূর্ণ। সীমিত গ্যাস কোন খাতে কতটুকু দেওয়া হচ্ছে, তার পরিষ্কার তথ্য প্রকাশ করা হলে অনিশ্চয়তা ও গুজব কমবে।
গ্যাস সংকটকে শুধু চুলায় আগুন না থাকা বা গাড়িতে জ্বালানি না পাওয়ার সমস্যা হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত অর্থনৈতিক ক্ষতি বোঝা যাবে না।
প্রতিদিন হাজার হাজার চালকের তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা লাইনে নষ্ট হচ্ছে। এক লাখ চালকের হিসাবে একদিনে প্রায় ৩ লাখ এবং দুই লাখ চালকের হিসাবে প্রায় ৬ লাখ কর্মঘণ্টা হারিয়ে যাচ্ছে।
এই সময়ের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে কম যাত্রা, কম আয়, বাড়তি যাত্রীভাড়া, পণ্য পরিবহনে বিলম্ব, শিল্প উৎপাদন হ্রাস এবং ব্যবসার ব্যয় বৃদ্ধি।
হারিয়ে যাওয়া কর্মসময় পরের দিন অতিরিক্ত কাজ করে পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। নির্ধারিত সময়ে যে যাত্রী পরিবহন করা যায়নি, যে পণ্য উৎপাদন করা হয়নি বা যে রপ্তানি চালান প্রস্তুত করা যায়নি, তার ক্ষতি অর্থনীতির মধ্যে থেকেই যায়।
তাই গ্যাসের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা যানবাহনের সারি শুধু একটি জ্বালানি সংকটের ছবি নয়। এটি দেশের উৎপাদনশীলতা, আয় এবং অর্থনৈতিক দক্ষতার নীরব ক্ষয়ের দৃশ্য।
সংকট যত দীর্ঘ হবে, এর বোঝা তত বেশি পড়বে নিম্ন আয়ের চালক, সাধারণ যাত্রী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শিল্পশ্রমিক এবং ভোক্তাদের ওপর। জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থেই দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি, বিকল্পনির্ভর ও সুশাসিত জ্বালানি পরিকল্পনা গ্রহণ করা এখন জরুরি।

