কয়েক দশক ধরে বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশের পরিচয়ের সঙ্গে তৈরি পোশাকশিল্পের নাম প্রায় অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। এই খাতই একসময় বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল একটি দেশকে বড় রপ্তানিকারক অর্থনীতিতে রূপান্তরিত করেছে। তৈরি পোশাক বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়, কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন এবং আন্তর্জাতিক পরিচয়ের প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠেছে।
কিন্তু কোনো একটি শিল্পের সাফল্য চিরস্থায়ী নিশ্চয়তা দেয় না। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা দ্রুত বদলায়, প্রযুক্তি পরিবর্তিত হয় এবং ক্রেতারা নতুন সক্ষমতা ও উচ্চমানের পণ্য দাবি করেন। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প এখনো অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলেও এই খাতকে ঘিরে দীর্ঘদিনের স্বস্তি ধীরে ধীরে চাপের মুখে পড়ছে।
চীনের পর বাংলাদেশকে দীর্ঘদিন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভিয়েতনামের প্রতিযোগিতা শক্তিশালী হয়েছে। সর্বশেষ বাণিজ্যতথ্য এবং রপ্তানি পণ্য শ্রেণিবিন্যাসের ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশ সত্যিই তৃতীয় অবস্থানে নেমে গেছে কি না, তা স্পষ্ট হবে। তবে সতর্কবার্তাটি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
ভিয়েতনাম উন্নত বন্দর ও পরিবহনব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তিতে বিস্তৃত অংশগ্রহণ, উচ্চমূল্যের উৎপাদন এবং বহুমুখী শিল্পভিত্তি গড়ে নিজের অবস্থান শক্ত করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ এখনো তুলনামূলক কম মূল্যের সুতি পোশাকের ওপর বেশি নির্ভরশীল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানির উচ্চ ব্যয়, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের ক্রমবর্ধমান কঠোর শর্ত।
বিশ্ববাজারের একটি অবস্থান হারালেই যে দেশের অর্থনীতিতে সংকট নেমে আসবে, তা নয়। তৈরি পোশাকশিল্প বাংলাদেশের জন্য এখনো অপরিহার্য। কিন্তু এটি মনে করিয়ে দেয়, কোনো তুলনামূলক সুবিধাই অনন্তকাল স্থায়ী হয় না।
যে দেশ কয়েক দশক ধরে একটি প্রধান রপ্তানি খাতের ওপর নির্ভর করেছে, তাকে এখন পরবর্তী প্রবৃদ্ধির উৎস নিয়ে বাস্তবভাবে চিন্তা করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মনে করছেন, বাংলাদেশের পরবর্তী বড় অর্থনৈতিক শক্তি হতে পারে অর্ধপরিবাহী চিপ শিল্প।
কেন অর্ধপরিবাহী শিল্প নিয়ে এত আগ্রহ
আধুনিক বিশ্বের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির কেন্দ্রে রয়েছে অর্ধপরিবাহী চিপ। মুঠোফোন, কম্পিউটার, গাড়ি, চিকিৎসা সরঞ্জাম, বিদ্যুৎব্যবস্থা, সৌরশক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যোগাযোগব্যবস্থা এবং আধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি—সব ক্ষেত্রেই এই ক্ষুদ্র উপাদানের প্রয়োজন হয়।
চিপ ছাড়া আজকের ডিজিটাল অর্থনীতি প্রায় অচল। যে দেশ বা প্রতিষ্ঠান চিপ নকশা, উৎপাদন অথবা সরবরাহব্যবস্থায় শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারে, সে শুধু অর্থনৈতিক লাভই পায় না; প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত প্রভাবও অর্জন করে।
এ কারণেই বিশ্বের বড় বড় দেশ অর্ধপরিবাহী শিল্পে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে। কেউ নিজস্ব উৎপাদন বাড়াচ্ছে, কেউ বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে কর ছাড় ও আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে, আবার কেউ দক্ষ প্রকৌশলী ও গবেষক তৈরিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করছে।
জাতীয় অর্ধপরিবাহী সম্মেলন এবং ২০২৬ সালের বিয়ার শীর্ষ বৈঠকে বাংলাদেশ সরকার এই শিল্পকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছে। সরকার প্রয়োজনীয় প্রণোদনা, অবকাঠামো এবং নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক অর্ধপরিবাহী সরবরাহব্যবস্থায় যুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
লক্ষ্যটি আকর্ষণীয়। কিন্তু বড় প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি সত্যিই এখন চিপ তৈরির জন্য প্রস্তুত, নাকি দেশের বর্তমান সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অন্য কোনো ধাপ থেকে যাত্রা শুরু করা উচিত?
চিপশিল্প মানেই শুধু কারখানা নয়
অর্ধপরিবাহী শিল্প নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই একটি ভুল ধারণা দেখা যায়। অনেকে মনে করেন, এই শিল্পে প্রবেশ করা মানেই দেশের ভেতরে বিশাল চিপ উৎপাদন কারখানা নির্মাণ করা।
বাস্তবে অর্ধপরিবাহী শিল্পের সরবরাহব্যবস্থা সাধারণভাবে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে বিভক্ত। প্রথম ধাপ হলো চিপের নকশা ও কার্যকারিতা যাচাই। দ্বিতীয় ধাপ পাতলা সিলিকন চাকতির ওপর চিপ উৎপাদন। তৃতীয় ধাপ তৈরি চিপের সংযোজন, পরীক্ষা এবং মোড়কায়ন।
এই তিনটি ধাপের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ, দক্ষতা, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো এক নয়।
চিপের নকশা তৈরিতে উচ্চমানের প্রকৌশলী, বিশেষায়িত সফটওয়্যার, গবেষণাগার এবং কঠোর মাননিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন হয়। এখানে মূল সম্পদ হলো দক্ষ মানবসম্পদ ও বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা।
অন্যদিকে পাতলা সিলিকন চাকতির ওপর চিপ উৎপাদন করতে কয়েকশ কোটি থেকে কয়েক হাজার কোটি মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে। সেখানে অতিশুদ্ধ পানি, নির্দিষ্ট মানের রাসায়নিক পদার্থ, অত্যন্ত সংবেদনশীল যন্ত্রপাতি, ধুলামুক্ত পরিবেশ, নিরবচ্ছিন্ন ও স্থিতিশীল বিদ্যুৎ এবং বহু বছরের শিল্প অভিজ্ঞতা প্রয়োজন।
চিপ সংযোজন, পরীক্ষা ও মোড়কায়নের জন্যও উন্নত অবকাঠামো ও নির্ভুল মান নিয়ন্ত্রণ দরকার। তবে পূর্ণাঙ্গ চিপ উৎপাদন কারখানার তুলনায় কিছু ক্ষেত্রে এর বিনিয়োগ তুলনামূলক কম হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ভুল হবে এই তিনটি ধাপের পার্থক্য না বুঝে সরাসরি অত্যন্ত ব্যয়বহুল উৎপাদন কারখানা নির্মাণের স্বপ্নে ঝাঁপিয়ে পড়া।
বাংলাদেশ একেবারে শূন্য থেকে শুরু করছে না
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৭০০ জনের বেশি চিপ নকশাবিদ রয়েছেন। প্রতিবছর কম্পিউটার ও তড়িৎ প্রকৌশল বিষয়ে ২০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী স্নাতক সম্পন্ন করছেন। ২০২৪ সালে অর্ধপরিবাহী খাত থেকে দেশের রপ্তানি আয় ছিল ৮০ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি।
বিশ্ব অর্ধপরিবাহী বাজারের তুলনায় এই সংখ্যাগুলো খুবই ছোট। তবে এগুলো দেখায় যে বাংলাদেশ একেবারে শূন্য অবস্থান থেকে শুরু করছে না।
দেশের কিছু প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে বিদেশি গ্রাহকদের জন্য চিপের নকশা, যাচাই, অন্তর্নির্মিত প্রযুক্তিব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল সেবা দিচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন অর্ধপরিবাহী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বাংলাদেশি প্রকৌশলীর সংখ্যাও বাড়ছে।
এই প্রবাসী দক্ষ জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হতে পারে। তারা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত মান, কাজের ধরন, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের নিরাপত্তা এবং গ্রাহকের প্রত্যাশা সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা রাখেন।
সঠিক পরিবেশ তৈরি করা গেলে তাদের কেউ দেশে ফিরে কাজ করতে পারেন, কেউ দূর থেকে প্রশিক্ষণ ও বিনিয়োগে যুক্ত হতে পারেন, আবার কেউ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করতে ভূমিকা রাখতে পারেন।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বাস্তব সুযোগ কোথায়
বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী সুযোগ পূর্ণাঙ্গ চিপ উৎপাদন কারখানা নির্মাণে নয়। বরং চিপ নকশা, কার্যকারিতা যাচাই, ভৌত নকশা, অন্তর্নির্মিত সফটওয়্যার এবং পণ্য প্রকৌশলের প্রতিযোগিতামূলক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের জন্য বেশি বাস্তবসম্মত।
এসব কাজে দক্ষ প্রকৌশলী প্রয়োজন হলেও বিশাল শিল্পকারখানা, অতিশুদ্ধ পানির বিপুল সরবরাহ বা কয়েক হাজার কোটি ডলারের উৎপাদন অবকাঠামো দরকার হয় না।
ভারত ও তাইওয়ানের মতো প্রতিষ্ঠিত কেন্দ্রের বাইরে বিকল্প প্রকৌশল দল গড়তে আগ্রহী বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে দক্ষ ও তুলনামূলক কম ব্যয়ের বাংলাদেশি প্রকৌশলীরা আকর্ষণীয় হতে পারেন।
তবে শুধু কম বেতনে প্রকৌশলী পাওয়া গেলেই অর্ধপরিবাহী শিল্প তৈরি হয় না। তা হলে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থাকা প্রতিটি উন্নয়নশীল দেশই এত দিনে চিপ নকশার বড় কেন্দ্রে পরিণত হতো।
এই শিল্পে কাজ করতে হলে প্রকৌশলীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদের পাশাপাশি বাস্তব প্রকল্পে কাজ করার দক্ষতা থাকতে হবে। চিপ নকশার স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার, যাচাই পদ্ধতি, যন্ত্রাংশের নিরাপত্তা, সময় বিশ্লেষণ, বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানো এবং কঠোর প্রকৌশল নথি তৈরিতে দক্ষ হতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তাই শুধু তাত্ত্বিক পাঠদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। শিক্ষার্থীদের বাস্তব চিপ নকশা, পরীক্ষা ও ভুল সংশোধনের সুযোগ দিতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বড় পরিবর্তন প্রয়োজন
অর্ধপরিবাহী শিল্প গড়ে তুলতে হলে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক আরও গভীর করতে হবে।
অনেক শিক্ষার্থী তড়িৎ, ইলেকট্রনিকস বা কম্পিউটার প্রকৌশলে ডিগ্রি অর্জন করলেও শিল্পে ব্যবহৃত আধুনিক নকশা সফটওয়্যার, যাচাই পদ্ধতি এবং বাস্তব প্রকল্পের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান না।
বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসম্মত নকশা গবেষণাগার স্থাপন করতে হবে। আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহৃত বাণিজ্যিক সফটওয়্যারে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এই সফটওয়্যারের মূল্য অনেক বেশি হওয়ায় পৃথক বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে তা বহন করা কঠিন হতে পারে। সরকার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং সফটওয়্যার নির্মাতা সংস্থার যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন।
অভিজ্ঞ শিক্ষক ও প্রশিক্ষকেরও ঘাটতি রয়েছে। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞদের স্বল্পমেয়াদি শিক্ষকতা, অনলাইন প্রশিক্ষণ এবং যৌথ গবেষণা প্রকল্পে যুক্ত করা যেতে পারে।
শিক্ষার্থীদের এমন বাস্তব প্রকল্পে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে, যেখানে তারা একটি ক্ষুদ্র চিপ নকশা করে বিদেশি কারখানায় উৎপাদনের জন্য পাঠাতে পারবেন। পরে তৈরি নমুনা পরীক্ষা করে নকশার ত্রুটি ও কার্যকারিতা যাচাই করতে পারবেন।
এই হাতে-কলমে অভিজ্ঞতা ছাড়া শুধু প্রশিক্ষণ সনদ দিয়ে আন্তর্জাতিক অর্ধপরিবাহী প্রতিষ্ঠানের আস্থা অর্জন করা কঠিন হবে।
প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি বিশ্বাস জরুরি
চিপ নকশা বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান ও সংবেদনশীল বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের মধ্যে পড়ে। একটি প্রতিষ্ঠানের নতুন চিপের নকশার পেছনে কয়েকশ কোটি মার্কিন ডলারের গবেষণা, সময় ও ব্যবসায়িক পরিকল্পনা থাকতে পারে।
আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশি প্রকৌশলীদের দক্ষতা যাচাই করার পাশাপাশি দেখবে, তাদের গোপন নকশা ও তথ্য এখানে কতটা নিরাপদ থাকবে।
এ কারণে বাংলাদেশের তথ্যনিরাপত্তা, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের সুরক্ষা, চুক্তি কার্যকর করার ক্ষমতা, বিচারব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা এবং নীতির ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কোনো একটি বড় প্রতিষ্ঠানের নকশা চুরি হয়ে গেলে, গ্রাহকের তথ্য ফাঁস হলে অথবা কর্মচারী অবৈধভাবে গোপন তথ্য সরিয়ে নিলে শুধু একটি প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। বাংলাদেশের পুরো প্রযুক্তি খাতের প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থা নষ্ট হতে পারে।
বিশ্বমানের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এমন দেশে সংবেদনশীল কাজ দিতে চায়, যেখানে তথ্য চুরি হলে দ্রুত তদন্ত হবে, আদালতে কার্যকর প্রতিকার পাওয়া যাবে এবং অপরাধীর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তাই অর্ধপরিবাহী শিল্প গড়ার নীতি শুধু প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বা বিনিয়োগ সংস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এর সঙ্গে আইন, বিচার, তথ্যনিরাপত্তা, শিক্ষা, বাণিজ্য এবং কূটনৈতিক সম্পর্কও যুক্ত।
বিদ্যুৎ ও অবকাঠামোর দুর্বলতা বড় বাধা
চিপ নকশার প্রতিষ্ঠান কিছু সময় বিদ্যুৎ না থাকলে বিকল্প ব্যবস্থায় কাজ চালাতে পারে। কিন্তু পরীক্ষা, মোড়কায়ন এবং ভবিষ্যতের যেকোনো উৎপাদন কার্যক্রমে বিদ্যুতের সামান্য ওঠানামাও বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
অর্ধপরিবাহী প্রতিষ্ঠানের জন্য শুধু বিদ্যুৎ পাওয়া যথেষ্ট নয়; বিদ্যুৎকে অত্যন্ত স্থিতিশীল ও নিরবচ্ছিন্ন হতে হয়।
বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহে দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তা রয়েছে। গ্যাসের ঘাটতি, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং শিল্পাঞ্চলে সরবরাহের ওঠানামা প্রযুক্তিনির্ভর বিনিয়োগের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে।
দ্রুত শুল্ক ছাড় এবং দক্ষ আমদানি প্রক্রিয়াও প্রয়োজন। অর্ধপরিবাহী নকশা ও পরীক্ষার কাজে বিশেষ যন্ত্র, নমুনা এবং ক্ষুদ্র উপাদান নিয়মিত সীমান্ত পার হয়। একটি নমুনা কয়েক সপ্তাহ শুল্ক দপ্তরে আটকে থাকলে পুরো প্রকল্পের সময়সূচি ব্যাহত হতে পারে।
আন্তর্জাতিক মানের দ্রুতগতির তথ্য সংযোগ, নিরাপদ তথ্যকেন্দ্র এবং বিশেষায়িত প্রযুক্তি অঞ্চলও গড়ে তুলতে হবে। শুধু একটি জমিকে প্রযুক্তি উদ্যান ঘোষণা করলেই বিশ্বমানের প্রযুক্তি অঞ্চল তৈরি হয় না। সেখানে বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা, যোগাযোগ, দক্ষ কর্মী, বাসস্থান এবং দ্রুত সরকারি সেবা নিশ্চিত করতে হয়।
২০৩০ সালের এক বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য কতটা বাস্তব
সরকারের লক্ষ্য ২০২৪ সালের ৮০ লাখ মার্কিন ডলারের অর্ধপরিবাহী রপ্তানিকে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ কোটি মার্কিন ডলারে উন্নীত করা।
এর অর্থ প্রায় ছয় বছরের মধ্যে রপ্তানি আয় ১২৫ গুণ বৃদ্ধি করতে হবে।
এটি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য। এক বা একাধিক বড় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য প্রকৌশলকেন্দ্র স্থাপন করলে এমন প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। কিন্তু দেশের বর্তমান ক্ষুদ্র শিল্পের স্বাভাবিক বৃদ্ধির মাধ্যমে এত অল্প সময়ে এই লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন।
অতিরিক্ত আশাবাদী লক্ষ্য নির্ধারণের একটি ঝুঁকি হলো, প্রকৃত সক্ষমতার বদলে প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন, প্রশিক্ষণ সনদ, সম্মেলন এবং ঘোষণাকে সাফল্য হিসেবে দেখানো শুরু হতে পারে।
অর্ধপরিবাহী শিল্প কয়েকটি বড় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তৈরি হয় না। এটি বহু বছরের দক্ষতা, বিশ্বাসযোগ্যতা, সফল প্রকল্প এবং আন্তর্জাতিক গ্রাহকের সন্তুষ্টির ওপর গড়ে ওঠে।
এ কারণে শুধু রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা নয়, আরও বাস্তব কিছু সূচক নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কতজন প্রকৌশলী বাস্তব প্রকল্পে কাজ করছেন, কতটি স্থানীয় নকশা বিদেশে উৎপাদিত হয়েছে, কতটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান প্রকৌশলকেন্দ্র স্থাপন করেছে, কতটি পেটেন্ট বা নিজস্ব নকশা তৈরি হয়েছে এবং কতজন শিক্ষার্থী শিল্পমানের প্রশিক্ষণ পেয়েছেন—এসব সূচক বেশি অর্থবহ হতে পারে।
ধাপে ধাপে এগোনোর বিকল্প নেই
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বাস্তব কৌশল হবে কয়েকটি ধাপে অর্ধপরিবাহী সক্ষমতা গড়ে তোলা।
প্রথম কয়েক বছরে চিপ নকশা, যাচাই, অন্তর্নির্মিত প্রযুক্তিব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট কারিগরি শিক্ষায় মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ে নকশা গবেষণাগার, বাণিজ্যিক সফটওয়্যার ব্যবহারের সুযোগ এবং বাস্তব প্রকল্প চালু করতে হবে।
দেশে নকশা করা ক্ষুদ্র চিপ বিদেশি কারখানায় উৎপাদনের জন্য পাঠাতে সরকারি সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। কারণ অনেক ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয় নকশা করতে পারলেও বিদেশে নমুনা উৎপাদনের ব্যয় বহন করতে পারে না।
একই সময়ে আন্তর্জাতিক অর্ধপরিবাহী প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশে প্রকৌশলকেন্দ্র স্থাপনে উৎসাহিত করতে হবে। তাদের জন্য শুধু কর ছাড় নয়, দ্রুত অনুমোদন, দক্ষ কর্মী, নিরাপদ তথ্যব্যবস্থা এবং চুক্তির নিশ্চয়তা দিতে হবে।
অভিজ্ঞতা ও আস্থা বাড়লে বাংলাদেশ স্বাধীন পরীক্ষাগার, পণ্যের মান যাচাই এবং উন্নত মোড়কায়নের দিকে যেতে পারে।
বিদ্যুৎ, পানি, রাসায়নিক ব্যবস্থাপনা, দক্ষ শ্রম এবং নিশ্চিত গ্রাহক তৈরি হওয়ার পরই দেশে কোনো ধরনের পাতলা সিলিকন চাকতি উৎপাদনের বিষয় বিবেচনা করা উচিত।
তখনও বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক চিপের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার চেষ্টা বাস্তবসম্মত হবে না। শিল্পযন্ত্র, সেন্সর, বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণ, গৃহস্থালি বৈদ্যুতিক পণ্য এবং পরিণত প্রযুক্তিনির্ভর চিপ হতে পারে বেশি বাস্তব লক্ষ্য।
নিজস্ব সমস্যার জন্য নিজস্ব চিপ নকশা
বাংলাদেশ দেশের ভেতরে চিপ উৎপাদন না করেও বড় অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করতে পারে। বিশ্বের বহু সফল প্রতিষ্ঠান নিজেরা কারখানা পরিচালনা না করে শুধু চিপের নকশা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ তৈরি করে।
বাংলাদেশ কৃষি, জলবায়ু, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় প্রয়োজনের জন্য বিশেষ চিপ ও প্রযুক্তিপণ্য তৈরি করতে পারে।
মাটির আর্দ্রতা মাপার কৃষি সেন্সর, বন্যার পানি পর্যবেক্ষণ যন্ত্র, স্মার্ট বিদ্যুৎ মিটার, স্বল্পমূল্যের চিকিৎসা সরঞ্জাম, সৌরবিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং ঘূর্ণিঝড় সতর্কীকরণ যন্ত্রের জন্য নিজস্ব নকশা তৈরি করা যেতে পারে।
এসব নকশা বাংলাদেশে তৈরি করে প্রতিষ্ঠিত বিদেশি কারখানায় উৎপাদন করানো সম্ভব। এতে বিশাল কারখানা নির্মাণের ঝুঁকি ছাড়াই বাংলাদেশ মূল্যবান বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের মালিক হতে পারে।
স্থানীয় সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি এসব পণ্য দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা এবং অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের বাজারেও রপ্তানি করা যেতে পারে।
তৈরি পোশাকশিল্পের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের সাফল্য একদিনে আসেনি। কয়েক দশকের শ্রম, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, আন্তর্জাতিক বাজারে সংযোগ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সরবরাহব্যবস্থা তৈরির মাধ্যমে এই শিল্প বর্তমান অবস্থানে পৌঁছেছে।
অর্ধপরিবাহী শিল্পের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ধৈর্য প্রয়োজন হবে। তবে এখানে প্রতিযোগিতা আরও প্রযুক্তিনির্ভর এবং ভুলের মূল্যও অনেক বেশি।
তৈরি পোশাকশিল্পে তুলনামূলক কম দক্ষ শ্রম দিয়ে যাত্রা শুরু করা সম্ভব হয়েছিল। অর্ধপরিবাহী শিল্পে শুরু থেকেই উচ্চ দক্ষতা, নির্ভুলতা এবং আন্তর্জাতিক মান প্রয়োজন।
সরকার যদি দ্রুত ফল দেখানোর জন্য অযাচিত ভর্তুকি, অপরিকল্পিত অবকাঠামো বা বাস্তবতাবিহীন কারখানা প্রকল্পে অর্থ ব্যয় করে, তাহলে বিপুল সরকারি সম্পদ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
আবার অতিরিক্ত সতর্কতার কারণে কিছুই শুরু না করলেও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি সুযোগ হারাবে।
তাই প্রয়োজন এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল, যেখানে উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকবে, কিন্তু সিদ্ধান্ত বাস্তব সক্ষমতা ও প্রমাণের ভিত্তিতে নেওয়া হবে।
শুধু ঘোষণা দিয়ে শিল্প গড়ে না
অর্ধপরিবাহী শিল্প নিয়ে সরকারের উদ্যোগ সমর্থনের যোগ্য। তৈরি পোশাকের বাইরে রপ্তানি বহুমুখী হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি আরও সহনশীল হবে। উচ্চ দক্ষতার কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং দেশের প্রকৌশলীরা আন্তর্জাতিক মানের কাজে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন।
কিন্তু শুধু সম্মেলন আয়োজন, প্রযুক্তি উদ্যানের নাম পরিবর্তন অথবা উচ্চাভিলাষী রপ্তানি লক্ষ্য ঘোষণা করে এই শিল্প গড়ে উঠবে না।
বাংলাদেশকে এমন একটি দেশে পরিণত হতে হবে, যেখানে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান দক্ষ প্রকৌশলী পাবে, তথ্য নিরাপদ থাকবে, আইন কার্যকর হবে, বিদ্যুৎ স্থিতিশীল থাকবে এবং সরকারি সিদ্ধান্ত হঠাৎ পরিবর্তিত হবে না।
দেশের প্রকৌশলীদেরও শুধু কম ব্যয়ের শ্রমশক্তি হিসেবে নয়, বিশ্বমানের সমস্যা সমাধানকারী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
একটি দেশ তখনই অর্ধপরিবাহী শিল্পে টেকসই অবস্থান তৈরি করতে পারে, যখন তার বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, সরকার এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা থাকে।
বাংলাদেশ কি এখনই চিপ তৈরি করতে প্রস্তুত
প্রশ্নটির উত্তর নির্ভর করে চিপ তৈরি বলতে কী বোঝানো হচ্ছে তার ওপর।
যদি এর অর্থ হয় বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক কারখানার মতো বাংলাদেশে কয়েক হাজার কোটি ডলারের উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপন, তাহলে দেশ এখনো প্রস্তুত নয়।
নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, অতিশুদ্ধ পানি, বিশেষ রাসায়নিক সরবরাহ, অত্যন্ত দক্ষ কর্মী, দ্রুত শুল্কব্যবস্থা এবং বহু বছরের অভিজ্ঞতা ছাড়া এমন কারখানা টেকসই হবে না।
কিন্তু যদি চিপশিল্পে অংশগ্রহণ বলতে নকশা, যাচাই, অন্তর্নির্মিত সফটওয়্যার, পণ্য প্রকৌশল এবং ধীরে ধীরে পরীক্ষা ও মোড়কায়নের সক্ষমতা তৈরি বোঝায়, তাহলে বাংলাদেশের সামনে বাস্তব সুযোগ রয়েছে।
দেশে প্রকৌশলী আছেন, প্রাথমিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং প্রবাসী বিশেষজ্ঞদের একটি বড় জনগোষ্ঠীও আছে। প্রয়োজন এই বিচ্ছিন্ন সক্ষমতাগুলোকে পরিকল্পিতভাবে একত্র করা।
অর্ধপরিবাহী চিপ আকারে ক্ষুদ্র হলেও এর শিল্প গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ বিশাল।
বাংলাদেশের সামনে সুযোগ রয়েছে তৈরি পোশাকের বাইরে একটি নতুন উচ্চমূল্যের রপ্তানি খাত গড়ে তোলার। তবে সেই সুযোগকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে উচ্চাভিলাষী ঘোষণা নয়, দীর্ঘমেয়াদি শৃঙ্খলা ও বাস্তব পরিকল্পনা প্রয়োজন।
২০২৪ সালের ৮০ লাখ মার্কিন ডলারের রপ্তানিকে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ কোটি মার্কিন ডলারে নেওয়ার লক্ষ্য অনুপ্রেরণাদায়ক হলেও এর জন্য প্রায় ১২৫ গুণ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। বড় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ছাড়া এত দ্রুত অগ্রগতি অর্জন কঠিন হবে।
বাংলাদেশের উচিত প্রথমে চিপ নকশা, যাচাই, অন্তর্নির্মিত প্রযুক্তি, শিক্ষা এবং তথ্যনিরাপত্তায় শক্ত অবস্থান তৈরি করা। এরপর ধীরে ধীরে পরীক্ষা, মান যাচাই ও মোড়কায়নের দিকে এগোনো।
শিল্পের ভিত্তি তৈরি হওয়ার আগে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন কারখানায় ঝাঁপিয়ে পড়া আর্থিকভাবে বিপজ্জনক হতে পারে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সাফল্য নির্ভর করবে দেশটি কত দ্রুত বড় ঘোষণা দেয় তার ওপর নয়; বরং কতটা ধৈর্য, দক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে নিজের সক্ষমতা গড়ে তোলে তার ওপর।
পোশাকশিল্প বাংলাদেশকে বিশ্বের কারখানায় পরিণত করেছে। অর্ধপরিবাহী শিল্প বাংলাদেশকে বিশ্বের প্রকৌশল ও প্রযুক্তি মানচিত্রে জায়গা দিতে পারে। তবে সেই যাত্রা শুরু করতে হবে বাস্তব জায়গা থেকে, সঠিক ধাপে এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে।

