দেশে আলুর উৎপাদন বাড়লেও প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ায় চাপে পড়েছে হিমাগার খাত। আলুর বাজারদর কমে যাওয়ায় বিপুল পরিমাণ আলু দীর্ঘদিন হিমাগারে অবিক্রীত থাকছে। এতে সংরক্ষণ ভাড়া থেকে আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি বাড়তি বিদ্যুৎ ব্যয় ও পরিচালন খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন হিমাগার মালিকেরা। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারের কাছে একাধিক দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন।
শনিবার (১ আগস্ট) রাজধানীর পল্টনে সংগঠনের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে হিমাগার মালিকেরা বিদ্যুৎ বিলে ২০ শতাংশ ছাড় অথবা বাড়তি বিদ্যুৎ বিল প্রত্যাহারের দাবি জানান। একই সঙ্গে আলু রপ্তানিতে বর্তমানে দেওয়া ১০ শতাংশ নগদ প্রণোদনা বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করার আহ্বান জানান তারা।
সংগঠনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে হিমাগার শিল্প টিকিয়ে রাখতে সরকারি সহায়তার বিকল্প নেই। তাঁর মতে, বিদ্যুৎ ব্যয় দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় সংরক্ষণ খরচও বেড়েছে। তাই বিদ্যুৎ বিলে ছাড় দেওয়া না হলে এই খাত আরও বড় সংকটে পড়তে পারে।
হিমাগার মালিকদের দাবি, মূল্যস্ফীতি ও পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে আলু সংরক্ষণের বর্তমান ভাড়া পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি আলু সংরক্ষণে ৬ টাকা ৭৫ পয়সা ভাড়া নেওয়া হলেও এতে ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছেও বিশেষ সহায়তার আবেদন জানানো হয়। সংগঠনটি চায়, হিমাগার শিল্পকে কৃষি খাতের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হোক এবং ৬ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন বা বিশেষ সহায়তা তহবিল গঠন করা হোক। সেই তহবিল থেকে ৫ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার প্রস্তাবও তারা দিয়েছে।
সংগঠনটির মতে, আলুর রপ্তানি বাড়াতে বর্তমান প্রণোদনা যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এবং রপ্তানি উৎসাহিত করতে ৩০ শতাংশ নগদ প্রণোদনা প্রয়োজন বলে তারা মনে করছে।
এ ছাড়া কৃষকদের জন্য চালু থাকা কৃষক কার্ড কর্মসূচির আওতায় আলুচাষিদের অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। এতে উৎপাদন থেকে সংরক্ষণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় কৃষকেরা আরও বেশি সহায়তা পাবেন বলে মনে করছে সংগঠনটি।
হিমাগার মালিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দুই লাখ টনের বেশি আলু হিমাগারে অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে ছিল। বাজারদর কম থাকায় অনেক মালিক আলু বাজারে ছাড়েননি। এর ফলে একদিকে সংরক্ষণ ভাড়া থেকে আয় কমেছে, অন্যদিকে দীর্ঘ সময় আলু সংরক্ষণের অতিরিক্ত ব্যয়ও বহন করতে হয়েছে।
সংগঠনটি আরও বলেছে, বাজারে আলুর ব্যবহার বাড়াতে সরকারের ওপেন মার্কেট সেল ও রেশনিং কর্মসূচিতে আলু অন্তর্ভুক্ত করা হলে কৃষক, ব্যবসায়ী ও হিমাগার—সব পক্ষই উপকৃত হবে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ১ কোটি ১২ লাখ টনের বেশি আলু উৎপাদিত হয়েছে। চলতি বছরে উৎপাদন বেড়ে প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে। তবে উৎপাদন বাড়লেও বাজারে চাহিদা ও বিপণনের সীমাবদ্ধতার কারণে কৃষক এবং হিমাগার মালিক—উভয়েই আর্থিক চাপের মুখে রয়েছেন।
বর্তমানে খামার পর্যায়ে আলুর দাম প্রতি কেজি ৫ থেকে ৯ টাকা, হিমাগার থেকে বিক্রি হচ্ছে ১২ থেকে ১৮ টাকা, আর খুচরা বাজারে একই আলু বিক্রি হচ্ছে ১৮ থেকে ৩০ টাকা দরে। উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত দামের এই বড় ব্যবধান বাজার ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ শৃঙ্খলা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। বিশ্লেষকদের মতে, উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও যদি সংরক্ষণ, বিপণন ও রপ্তানি ব্যবস্থার উন্নয়ন না হয়, তাহলে ভবিষ্যতেও আলুর বাজারে একই ধরনের সংকট বারবার দেখা দিতে পারে।

