মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পেও। আন্তর্জাতিক বাজারে দীর্ঘদিন ধরে চীনের বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছিল বাংলাদেশ। কিন্তু জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকায় অনেক পশ্চিমা ক্রেতা এখন সেই সিদ্ধান্ত নতুন করে পর্যালোচনা করছেন। ফলে যেসব ব্র্যান্ড ও ক্রেতা আগে উৎপাদনের একটি অংশ চীন থেকে বাংলাদেশে সরিয়ে এনেছিল, তাদের কেউ কেউ আবারও চীনের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছেন।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গুণগত মান যাচাই ও সরবরাহব্যবস্থা মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠান কিউআইএমএ তাদের ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকের প্রতিবেদনে বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দেখিয়ে দিয়েছে যে শুধু উৎপাদন কেন্দ্র বদলালেই ঝুঁকি কমে না। অনেক দেশ উৎপাদনের জন্য চীনের বিকল্প হলেও জ্বালানির ক্ষেত্রে তারা একই উৎসের ওপর নির্ভরশীল। ফলে জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা দেখা দিলে উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গত কয়েক বছরে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বাণিজ্য বিরোধ এবং মহামারির অভিজ্ঞতার কারণে বহু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান উৎপাদনের একটি বড় অংশ বাংলাদেশ, ভিয়েতনামসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সরিয়ে নেয়। কিন্তু উৎপাদন স্থানান্তরের সময় জ্বালানি নিরাপত্তাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এসব দেশের শিল্পকারখানার বড় অংশ এখনও মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলেই উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার পর জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়। এর প্রভাব দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন উৎপাদন কেন্দ্রে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অনেক কারখানাকে উৎপাদন কমাতে হয়, আবার কোথাও কোথাও সরবরাহের সময়সূচি ব্যাহত হয়। এতে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে চীনের শিল্পখাত তুলনামূলকভাবে এই সংকট সামাল দিতে সক্ষম হয়েছে। কারণ দেশটির উৎপাদন ব্যবস্থা অনেকাংশে নিজস্ব কয়লা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংকটের ধাক্কা তুলনামূলক কম লেগেছে। এই বাস্তবতায় অনেক ক্রেতা ঝুঁকি কমাতে আবারও চীনের সরবরাহব্যবস্থার ওপর আস্থা দেখাতে শুরু করেছেন।
কিউআইএমএর তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে উত্তর আমেরিকার ক্রেতাদের পরিদর্শন ও সরবরাহকারী মূল্যায়নের ৩৫ শতাংশই চীনে হয়েছে, যা ২০২৪ সালের পর সর্বোচ্চ। একই সময়ে ইউরোপীয় ক্রেতাদের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সরবরাহকারী মূল্যায়নের প্রবৃদ্ধি এপ্রিল মাসে ১৪ শতাংশ থাকলেও জুনে তা ৫ শতাংশ ঋণাত্মক অবস্থায় নেমে আসে। বিপরীতে চীনে একই ধরনের কার্যক্রমের প্রবৃদ্ধি বেড়ে ১০ শতাংশে পৌঁছায়।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন শুধু কম খরচে উৎপাদন নয়, বরং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, জ্বালানি নিরাপত্তা, সময়মতো সরবরাহ এবং ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতাকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হলে দেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সাবেক সভাপতি ফজলুল হক মনে করেন, সাম্প্রতিক পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশ কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এটি স্থায়ী নয়। তার মতে, সরকার যদি দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে পারে, তাহলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা পুনরুদ্ধার সম্ভব। তিনি আরও বলেন, বড় পরিসরে অর্ডার অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়াও সহজ নয়, কারণ বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং প্রতিযোগিতামূলক মূল্য এখনও বড় শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণও একই ধরনের। তাদের মতে, এটি বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার একটি সাময়িক সমন্বয় মাত্র। উচ্চ শুল্ক এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত বাস্তবতার কারণে উৎপাদন বৈচিত্র্যকরণের প্রয়োজন ভবিষ্যতেও থাকবে। তাই ‘চীনের পাশাপাশি অন্য দেশে উৎপাদন’ কৌশল পুরোপুরি বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তবে বাংলাদেশকে এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্যময় করা, পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুতের সক্ষমতা গড়ে তোলা এবং শিল্পখাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
সাম্প্রতিক রপ্তানি পরিসংখ্যানও কিছুটা উদ্বেগের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইউরোপীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ কমে ৭ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ইউরোতে নেমে এসেছে। আগের বছর একই সময়ে এই রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৮ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ইউরো। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ৮ দশমিক ০৮ শতাংশ কমে ৩ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছর ছিল ৩ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট রপ্তানি আয় ছিল ৪৮ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ৩৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার এসেছে শুধু তৈরি পোশাক খাত থেকে। অর্থাৎ দেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ এখনও এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য আস্থাহীনতাও জাতীয় অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, শুধু সস্তা শ্রম বা উৎপাদন সক্ষমতা দিয়ে ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি, শক্তিশালী অবকাঠামো, উন্নত মান নিয়ন্ত্রণ, বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার এবং কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাই আগামী দিনের বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় সফল হওয়ার মূল শর্ত। বাংলাদেশ যদি এখন থেকেই এসব খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে পারে, তাহলে সাময়িক এই সংকট কাটিয়ে আবারও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করা সম্ভব হবে।

