বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকট এখন শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা নয়, বরং শিল্প, বিনিয়োগ, রপ্তানি এবং সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যয়বহুল আমদানিনির্ভরতার ওপর নির্ভর করে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। দেশের ভেতরেই নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উত্তোলনের গতি বাড়াতে হবে, পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানির ব্যবহারও সম্প্রসারণ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়েক বছর ধরে চলা গ্যাসের ঘাটতির কারণে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না। এর ফলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, রপ্তানি প্রতিযোগিতা দুর্বল হচ্ছে এবং নতুন বিনিয়োগের পরিবেশও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। শুধু নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ নয়, বর্তমানে চালু থাকা শিল্পকারখানাগুলো টিকিয়ে রাখাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
নীতিগত গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ভাসমান গ্যাস গ্রহণ ও রূপান্তর কেন্দ্রের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। কেন্দ্রটি পুনরায় চালু হলেও আগের ঘাটতির অবস্থায় ফিরে যাওয়া সম্ভব হবে, কিন্তু মূল সংকটের সমাধান হবে না।
তার মতে, কেবল আমদানি করা তরলীকৃত গ্যাসের পরিমাণ বাড়িয়ে দেশের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। সরকারকে গ্যাস সংকটকে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে দেশীয় অনুসন্ধান ত্বরান্বিত করতে হবে। একই সঙ্গে জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্যময় করার দিকেও নজর দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বিশ্ববাজারে দুর্বল চাহিদা, রপ্তানির ধীরগতি এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ব্যবসায়িক পরিবেশ এমনিতেই চাপের মধ্যে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন বিনিয়োগের চেয়ে বিদ্যমান শিল্পকারখানাগুলো সচল রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে আর্থিক সংকটে থাকা কিন্তু উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রণোদনা দিলে অর্থনীতিতে তার ইতিবাচক প্রভাব বেশি পড়বে।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও ধীরে ধীরে গ্যাসনির্ভরতা কমাতে হবে। বিদ্যুৎভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা, জ্বালানি সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে জ্বালানির ব্যবহার ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
অন্যদিকে, নীতিগত গবেষণা প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, স্থলভাগ ও সমুদ্রে পর্যাপ্ত গ্যাস অনুসন্ধান না হওয়ায় বাংলাদেশ ক্রমেই আমদানিকৃত তরলীকৃত গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ বিঘ্ন বা দামের ওঠানামার প্রভাব সরাসরি দেশের জ্বালানি খাতে পড়ছে।
তিনি বলেন, গ্যাস আমদানির অবকাঠামোও এখনো সীমিত। ফলে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না। এতে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে কম সক্ষমতায় উৎপাদন চালাচ্ছে।
তার তথ্য অনুযায়ী, তৈরি পোশাক, বস্ত্র, ইস্পাত এবং মৃৎশিল্পসহ বিভিন্ন খাতে গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। একই সঙ্গে জ্বালানি ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় ক্ষুদ্র শিল্প ও সেবাভিত্তিক ব্যবসাও ক্ষতির মুখে পড়েছে। এই অনিশ্চয়তা দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নতুন বিনিয়োগ কিংবা ব্যবসা সম্প্রসারণে নিরুৎসাহিত করছে।
তিনি মনে করেন, স্বল্পমেয়াদে দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস আমদানি চুক্তি নিশ্চিত করে সরবরাহ স্থিতিশীল করা প্রয়োজন। পাশাপাশি আমদানির জন্য পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার সংস্থান নিশ্চিত করতে হবে। তবে মধ্যমেয়াদে স্থলভাগ ও সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান দ্রুত বাড়ানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রকল্প বাস্তবায়নেও গতি আনতে হবে।
উন্নয়নবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বলেন, বাংলাদেশ এখন কেবল সাময়িক শিল্প মন্দার মুখোমুখি নয়; বরং বিনিয়োগ ও উৎপাদনের একটি গভীর সংকটের মধ্যে রয়েছে। তার মতে, জ্বালানি সংকট, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, উচ্চ ঋণ ব্যয়, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং ব্যবসায়ীদের আস্থার ঘাটতি—সব মিলিয়ে অর্থনীতির ওপর একযোগে চাপ সৃষ্টি করছে।
তিনি বলেন, গ্যাসের অভাবে অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, পণ্য সরবরাহে বিলম্ব হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যাচ্ছে। নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
তার মতে, একদিকে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে ব্যয়বহুল আমদানিনির্ভরতা বাড়ছে। এর সঙ্গে পর্যাপ্ত সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামোর ঘাটতি যুক্ত হওয়ায় শিল্পায়নের বর্তমান কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের অভিমত, গ্যাস সংকটের স্থায়ী সমাধান শুধু আমদানির ওপর নির্ভর করে সম্ভব নয়। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, অবকাঠামো উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং শিল্পে জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে। বহু বছর ধরে এসব বিষয়ে নানা সুপারিশ দেওয়া হলেও বাস্তবায়নের গতি খুব ধীর। তাই এখন নতুন পরিকল্পনার চেয়ে কার্যকর বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। কারণ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে শিল্পায়ন, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জন আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

