বাংলাদেশের রপ্তানি খাত নতুন অর্থবছরের শুরুতেই একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। সদ্য সমাপ্ত জুলাই মাসে দেশ গত এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পণ্য রপ্তানি আয় করেছে। তবে এই অর্জনের মধ্যেও পুরোপুরি স্বস্তি নেই। কারণ, গত বছরের একই মাসের তুলনায় রপ্তানি আয় প্রায় ১ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পকে ঘিরে জ্বালানি সংকট, বৈশ্বিক চাহিদার ধীরগতি এবং বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে অর্থ পরিশোধসংক্রান্ত জটিলতা আগামী কয়েক মাসের জন্য নতুন অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে বাংলাদেশ ৪ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছে। এটি গত ১২ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ মাসিক রপ্তানি আয়। তবে গত বছরের জুলাই মাসের তুলনায় এই আয় ০ দশমিক ৯ শতাংশ কম। যদিও জুন মাসের তুলনায় জুলাইয়ে রপ্তানি আয় ১২ শতাংশের বেশি বেড়েছে, যা নতুন অর্থবছরের শুরুতে কিছুটা আশাবাদ তৈরি করেছে।
রপ্তানিকারকদের ভাষ্য, জুলাই মাসে তুলনামূলক বেশি রপ্তানি হওয়া নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রতিবছরই শীতকালীন মৌসুমের পোশাক বিদেশে পাঠানোর বড় অংশ এই সময় সম্পন্ন হয়। ফলে জুলাই মাসে রপ্তানি আয়ের উল্লম্ফন একটি নিয়মিত মৌসুমি প্রবণতা।
তবে এই ইতিবাচক প্রবণতার আড়ালে রয়েছে বেশ কিছু বড় উদ্বেগ। ব্যবসায়ীদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে তৈরি পোশাকের চাহিদা প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। একই সঙ্গে দেশের গ্যাস সংকট উৎপাদন ব্যাহত করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইউরোপের পোল্যান্ডভিত্তিক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান এলপিপি-এর সঙ্গে অর্থ পরিশোধসংক্রান্ত জটিলতা, যা আগামী মাসগুলোতে নতুন ক্রয়াদেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
পরিসংখ্যান বলছে, গত ১২ মাসে বাংলাদেশ চারবার ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি রপ্তানি করেছে। এর আগে সর্বোচ্চ রপ্তানি ছিল ৪ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলার। তবে গত বছরের জুলাই মাসেই রপ্তানি হয়েছিল ৪ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার, যা এখনো তুলনামূলকভাবে বেশি।
বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। ফলে এই খাতের সামান্য ওঠানামাও দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়ে বড় প্রভাব ফেলে।
অন্যদিকে পোশাক খাতের বাইরে বেশ কয়েকটি খাত ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। জুলাই মাসে প্লাস্টিক পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে ১ দশমিক ৯৮ শতাংশ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে ২ দশমিক ৮১ শতাংশ, পাট ও পাটজাত পণ্যে উল্লেখযোগ্য ৫৪ শতাংশ, গৃহস্থালি বস্ত্রপণ্যে ১৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ, অন্যান্য পাদুকায় ৫ দশমিক ৫২ শতাংশ এবং বিশেষায়িত বস্ত্রপণ্যে ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব খাতের ধারাবাহিক উন্নতি ভবিষ্যতে রপ্তানি বহুমুখীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
রপ্তানিকারকদের মতে, বর্তমান সাফল্য ধরে রাখা সহজ হবে না। তাদের আশঙ্কা, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারবে না। এর ফলে সময়মতো পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হলে বিদেশি ক্রেতারা বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকতে পারেন।
বিশ্লেষকদের মতে, চলতি বছরের জুলাইয়ের প্রবৃদ্ধি কিছুটা কম দেখানোর পেছনেও একটি বিশেষ কারণ রয়েছে। গত বছরের জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য নতুন শুল্ক কার্যকর হওয়ার আশঙ্কায় অনেক ক্রেতা আগেভাগেই বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি করেছিলেন। ফলে সেই সময়ের রপ্তানি অস্বাভাবিকভাবে বেশি ছিল। এ কারণে চলতি বছরের জুলাইয়ে রপ্তানি উচ্চ পর্যায়ে থাকলেও প্রবৃদ্ধির হার নেতিবাচক দেখা যাচ্ছে।
তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৩ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের ৩ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার থেকে ১ দশমিক ৯২ শতাংশ কম। তবে সংগঠনটির মতে, গত বছরের জুলাই ছিল দেশের পোশাক রপ্তানির ইতিহাসে একক মাসে সর্বোচ্চ আয়ের সময়। সেই বিবেচনায় চলতি বছরের ফলাফলও খারাপ নয় এবং এটিকে নতুন অর্থবছরের একটি ইতিবাচক সূচনা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
সংগঠনটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গ্যাস সংকট এবং আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা চাপের মুখে থাকলেও বাংলাদেশের পোশাক শিল্প এখনো প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
তবে আগামী কয়েক মাস নিয়ে আশাবাদী নন অনেক উদ্যোক্তা। তাদের ধারণা, অন্তত ডিসেম্বর পর্যন্ত রপ্তানিতে বড় ধরনের উল্লম্ফনের সম্ভাবনা কম। কারণ উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে বিদেশি ক্রেতাদের উদ্বেগ এখনো কাটেনি।
এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে এলপিপি-এর অর্থ পরিশোধসংক্রান্ত জটিলতা। জানা গেছে, এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাশিয়ার ক্রেতাদের কাছে রপ্তানি করা প্রায় ৪০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্যের অর্থ এখনো আটকে রয়েছে। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ থেকে নতুন ক্রয়াদেশ কমিয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে, যা পোশাক শিল্পের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখা এবং জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল করা। পাশাপাশি নতুন বাজার সৃষ্টি ও পোশাকের বাইরে অন্যান্য রপ্তানি খাতকে আরও শক্তিশালী করতে না পারলে ভবিষ্যতে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
সব মিলিয়ে জুলাই মাসের রপ্তানি পরিসংখ্যান একদিকে যেমন আশার আলো দেখিয়েছে, অন্যদিকে সামনে অপেক্ষা করছে কঠিন বাস্তবতা। জ্বালানি সংকট, বৈশ্বিক চাহিদার ধীরগতি এবং বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারলে এই ইতিবাচক সূচনা টেকসই প্রবৃদ্ধিতে রূপ নিতে পারে। অন্যথায় বছরের সবচেয়ে ভালো মাসের অর্জনও দীর্ঘমেয়াদে ম্লান হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে যাবে।

