বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, জ্বালানি সংকট, শ্রমিক অসন্তোষ, ব্যাংকিং খাতের জটিলতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক নিয়ে উদ্বেগ—সব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তৈরি পোশাক রপ্তানিতে টানা পঞ্চমবারের মতো বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশের অবস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। তবে এই অর্জনের পাশাপাশি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, দ্রুত এগিয়ে আসা প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর কারণে ভবিষ্যতে এই অবস্থান ধরে রাখা সহজ হবে না।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ওয়ার্ল্ড ট্রেড স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিভিউ ২০২৫ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বাংলাদেশ ৩৮ দশমিক ৮২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। এই আয় নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনামের তুলনায় প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার বেশি। ফলে ধারাবাহিকভাবে পঞ্চমবারের মতো বিশ্ব পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় অবস্থান নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ।
তবে পরিসংখ্যানের আরেকটি দিকও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের রপ্তানি বছর ব্যবধানে প্রায় ১ শতাংশ বেড়েছে, অথচ একই সময়ে ভিয়েতনামের প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১১ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশ এখনো এগিয়ে থাকলেও ভিয়েতনাম অনেক দ্রুত গতিতে ব্যবধান কমিয়ে আনছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান অবস্থান ধরে রাখতে শুধু উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ালেই হবে না; উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তি ব্যবহার, দক্ষ জনবল এবং দ্রুত সরবরাহ সক্ষমতাও সমানভাবে বাড়াতে হবে।
পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, বাংলাদেশ এখনো শ্রমনির্ভর উৎপাদনে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির ঘাটতি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা অনেক বিদেশি ক্রেতার মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করছে।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, বিশ্ব পোশাক বাজারে চীনের অংশীদারিত্ব এখনো এতটাই বড় যে অন্য দেশগুলোর পক্ষে দ্রুত সেই জায়গা দখল করা সম্ভব হয়নি। এ কারণেই বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। তবে তিনি মনে করেন, প্রথম স্থানে থাকা চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবধান এখনো অনেক বেশি।
অর্থনীতিবিদ মাহফুজ কবিরের মতে, ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকা। তার মতে, ভিয়েতনাম ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এবং কম্বোডিয়া নিজেদের সক্ষমতা দ্রুত বাড়াচ্ছে। ফলে শুধু কম খরচে উৎপাদনের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। শিল্পে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে উৎপাদনশীলতা ও মান উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আধুনিক যন্ত্রপাতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থাপনা, দক্ষ মানবসম্পদ এবং পরিবেশবান্ধব কারখানায় বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে পারবে।
মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের বাইরে বিশ্ব পোশাক বাজারের সবচেয়ে বড় অংশ এখনো চীনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা মূলত শ্রমনির্ভর উৎপাদন এবং দ্রুত সরবরাহ সক্ষমতাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হবে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, রপ্তানি কিছুটা কমলেও তৈরি পোশাক রপ্তানিতে এখনো শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে চীন। দ্বিতীয় স্থানে বাংলাদেশ, তৃতীয় স্থানে ভিয়েতনাম, চতুর্থ স্থানে ভারত এবং পঞ্চম স্থানে রয়েছে তুরস্ক।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের জন্য এই দ্বিতীয় অবস্থান নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। তবে এটিকে স্থায়ী সাফল্যে পরিণত করতে হলে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, ব্যাংকিং খাতের জটিলতা কমানো, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়নের গতি বাড়ানো জরুরি। অন্যথায় দ্রুত এগিয়ে আসা প্রতিযোগী দেশগুলোর চাপের মুখে আগামী বছরগুলোতে এই অবস্থান ধরে রাখা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

