নতুন অর্থবছরের প্রথম মাসেই বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ে কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছে। বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং উৎপাদন খাতের বিভিন্ন সমস্যার প্রভাবে ২০২৬ সালের জুলাই মাসে দেশের পণ্য রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় সামান্য কমেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জুলাই মাসে বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৪৭২ কোটি ৭৪ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলারের। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৪৭৭ কোটি ৯ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় কমেছে শূন্য দশমিক ৯০ শতাংশ।
তবে এই পতনকে বড় ধরনের সংকট হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। কারণ, মাসভিত্তিক হিসাবে পরিস্থিতি কিছুটা ইতিবাচক। চলতি বছরের জুন মাসে যেখানে দেশের রপ্তানি আয় ছিল ৪২০ কোটি ২৬ লাখ ৯০ হাজার ডলার, সেখানে জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭২ কোটি ৭৪ লাখ ৫০ হাজার ডলারে। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে রপ্তানি বেড়েছে ১২ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই মাসের সামান্য নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির পেছনে মূল কারণ হলো আগের বছরের তুলনামূলক বেশি রপ্তানি। গত বছরের জুলাইয়ে রপ্তানির পরিমাণ বেশি থাকায় এবার বার্ষিক হিসাবের তুলনায় সামান্য পতন দেখা গেছে।
এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তাও বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে কিছুটা প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে বৈশ্বিক ক্রেতারা বর্তমানে নতুন অর্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রে আগের তুলনায় বেশি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান ভিত্তি তৈরি পোশাক খাতেও জুলাই মাসে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে তৈরি পোশাক খাত থেকে রপ্তানি হয়েছে ৩৮৮ কোটি ৬৭ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলার।
গত বছরের জুলাইয়ের তুলনায় এ খাতে রপ্তানি কমেছে ১ দশমিক ৯২ শতাংশ। তবে জুন মাসের তুলনায় পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ১৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় জুলাইয়ের এই ফলাফল খুব বেশি হতাশাজনক নয়। বরং গ্যাস সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক অস্থিরতার মধ্যেও এই খাত এখনো তুলনামূলক স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, গত বছরের তুলনায় চলতি বছরের জুলাইয়ে পোশাক রপ্তানি ১ দশমিক ৯২ শতাংশ কমেছে ঠিকই, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এটিকে বড় নেতিবাচক বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তবে তিনি ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা সতর্কতার কথাও জানিয়েছেন। তাঁর মতে, পোশাক খাতের উৎপাদন সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশনের পরিমাণ ২ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে। এর ফলে আগামী কয়েক মাসে রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে কিছুটা চাপ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ নিট পোশাক রপ্তানিকারক ও ব্যবসায়ীদের সংগঠনের নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, ইসরায়েল-ইরান সংঘাত এবং এতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব বাংলাদেশের রপ্তানিতেও পড়েছে।
বিশ্বের বড় বড় ক্রেতারা এখন অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে ক্রয় পরিকল্পনা নির্ধারণ করছে। ফলে বাংলাদেশের মতো রপ্তানিনির্ভর দেশের জন্য বৈশ্বিক বাজারের স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের উৎসব মৌসুমের জন্য নতুন অর্ডারের প্রবাহ বাংলাদেশের রপ্তানি পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ধারণ করবে। যদি ক্রেতাদের অর্ডার প্রত্যাশামতো আসে এবং দেশে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকে, তাহলে পোশাক খাত আবারও প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে পারে।
বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। তবে আশার বিষয় হলো, পোশাকের বাইরে কয়েকটি খাত সাম্প্রতিক সময়ে ভালো করছে।
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, প্রকৌশল পণ্য এবং ওষুধশিল্পে রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বাংলাদেশের রপ্তানি আয়কে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল করতে হলে এসব সম্ভাবনাময় খাতকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।
অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শুধু তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যতে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হবে।
তিনি মনে করেন, চামড়া, ওষুধ, কৃষিপ্রক্রিয়াজাত পণ্য এবং প্রকৌশল খাতকে আরও বিকশিত করতে হবে। পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় কমানো, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, বন্দর ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং কাস্টমস কার্যক্রম আরও দ্রুত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
তাঁর মতে, নতুন বাজার খুঁজে বের করা এবং বিদ্যমান বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের উপস্থিতি বাড়ানোও এখন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
রপ্তানি বাজার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র এখনো বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি গন্তব্য। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে দেশটিতে বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে ৯১ কোটি ৮৭ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলারের পণ্য।
প্রধান বাজারগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জার্মানি এবং তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাজ্য।
তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বড় বাজারগুলোর মধ্যে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। পাশাপাশি সৌদি আরবেও রপ্তানি বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের মতো আঞ্চলিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং অন্যান্য উদীয়মান বাজারে পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে পারলে রপ্তানি খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
নতুন অর্থবছরের শুরুতে রপ্তানি আয়ে যে সামান্য পতন দেখা দিয়েছে, তা বাংলাদেশের জন্য একটি সতর্ক সংকেত হলেও বড় ধরনের বিপদের ইঙ্গিত নয়। বরং এটি দেশের রপ্তানি কাঠামোর দুর্বলতাগুলো নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রপ্তানি সাফল্য নির্ভর করবে শুধু তৈরি পোশাক খাতের ওপর নয়, বরং নতুন শিল্প খাত তৈরি, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানোর ওপর।
জ্বালানি নিরাপত্তা, অবকাঠামো উন্নয়ন, নীতিগত সহায়তা এবং পণ্যের বৈচিত্র্য নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত আবারও শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

