বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচারের অভিযোগে বিদেশে গড়ে ওঠা সম্পদের অনুসন্ধানকে আরও কার্যকরভাবে এগিয়ে নিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে একটি বিশেষ তদন্ত দল পাঠানোর প্রস্তুতি নিয়েছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তবে কমিশনের নেতৃত্বে পরিবর্তন এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে চলা বহুল আলোচিত এই অনুসন্ধান গুরুত্বপূর্ণ এক পর্যায়ে এসে থমকে আছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, দেশের ভেতরের তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি বিদেশে সরেজমিন অনুসন্ধান ছাড়া এই তদন্তের পূর্ণাঙ্গ সত্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব নয়।
দুদকের অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচার করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের গোল্ডেন ভিসা কর্মসূচির মাধ্যমে দুবাইয়ে সম্পদ কেনার অভিযোগ। তদন্তে উঠে এসেছে, ৪৫৯ জন বাংলাদেশির নামে সেখানে মোট ৯৭২টি সম্পদ রয়েছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে প্রায় তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে প্রথম ধাপে ৭০ জনকে শনাক্ত করা হয়। পরে আরও ২০ থেকে ২৫ জনের বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়। সব মিলিয়ে প্রায় ১০০ জনের নথি যাচাইয়ের প্রস্তুতি নেয় দুদক।
অনুসন্ধান এগিয়ে নিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট এবং অন্যান্য সরকারি সংস্থার কাছ থেকে কর-সংক্রান্ত তথ্য, ব্যাংকিং লেনদেন, বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের রেকর্ড এবং সম্পদের বিভিন্ন নথি সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব তথ্য যাচাইয়ের পর পারস্পরিক আইনি সহায়তার আওতায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় দুবাইয়ে সরেজমিন অনুসন্ধানের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পদত্যাগের পর সেই প্রক্রিয়া থেমে যায়। যদিও দুদকের আরেকটি সূত্রের দাবি, ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতার কারণেও নির্ধারিত সময়ে তদন্ত দলটি বিদেশে যেতে পারেনি। নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর আবারও সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হবে বলে জানা গেছে।
দুদকের কর্মকর্তাদের মতে, অর্থপাচারের মতো জটিল অভিযোগের তদন্ত শুধু দেশের নথিপত্রের ওপর নির্ভর করে শেষ করা সম্ভব নয়। প্রকৃত মালিকানা, প্রকৃত উপকারভোগী, সম্পদের ক্রয়মূল্য, অর্থের উৎস, গোল্ডেন ভিসার আবেদনপত্র, দুবাইয়ের ভূমি কর্তৃপক্ষের নথি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকিং তথ্য যাচাই না করলে অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা নিশ্চিত করা কঠিন। এ কারণেই বিদেশে গিয়ে সরাসরি তথ্য সংগ্রহকে তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
দুদকের জনসংযোগ বিভাগের উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম জানিয়েছেন, গোল্ডেন ভিসার মাধ্যমে বিদেশে সম্পদ অর্জনের অভিযোগে সাড়ে চার শতাধিক বাংলাদেশির বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পেতে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে চিঠি পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে গত বছর শনাক্ত হওয়া ৭০ জনের কর-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছেও চিঠি দেওয়া হয়েছিল এবং বর্তমানে সেসব তথ্য যাচাই-বাছাই চলছে।
২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে দুদক জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে গোল্ডেন ভিসায় বিনিয়োগকারী ৭০ জনের কর শনাক্তকরণ নম্বরসহ প্রয়োজনীয় নথি চেয়ে চিঠি পাঠায়। সেই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, বিভিন্ন বিদেশি ব্যাংক, এমনকি সুইস ব্যাংকের মাধ্যমেও পাচার করা অর্থ ব্যবহার করে দুবাইয়ে এসব সম্পদ কেনা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানের স্বার্থে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের পেশাগত পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড ডিফেন্স স্টাডিজ এবং ইউরোপীয় ইইউ ট্যাক্স অবজারভেটরির তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল পর্যন্ত ৪৫৯ জন বাংলাদেশির নামে দুবাইয়ে কেনা সম্পদের কাগজে-কলমে মূল্য ৩১ কোটি ৩০ লাখ ডলার। তবে তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা, প্রকৃত বিনিয়োগের পরিমাণ সরকারি নথিতে উল্লেখিত মূল্যের চেয়ে আরও বেশি হতে পারে।
এই অভিযোগের অনুসন্ধানে ২০২৩ সালের ১০ এপ্রিল তিন সদস্যের একটি তদন্ত দল গঠন করে দুদক। এর আগে ২০২৩ সালের ১৬ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট দুবাইয়ে অবস্থানরত ৪৫৯ বাংলাদেশি নাগরিকের সম্পদ কেনার অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দেয়। পরে ২০২৩ সালের ১৬ এপ্রিল বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছেও প্রয়োজনীয় তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়।
তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশিদের মালিকানায় দুবাইয়ে ৯৭২টি সম্পদ রয়েছে, যার কাগজে-কলমে মূল্য ৩১৫ মিলিয়ন ডলার। এসব সম্পদের মধ্যে ৬৪টি দুবাই মেরিনায় এবং ১৯টি পাম জুমেইরাহ এলাকায় অবস্থিত। সেখানে বাংলাদেশিদের মালিকানায় অন্তত ১০০টি ভিলা এবং কমপক্ষে ৫টি ভবন রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, মাত্র চার থেকে পাঁচজন বাংলাদেশি প্রায় ৪৪ মিলিয়ন ডলারের সম্পদের মালিক হলেও তাদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
অনুসন্ধানসংশ্লিষ্টদের মতে, গত দুই বছরে দুবাইয়ে বাংলাদেশিদের সম্পদ কেনার প্রবণতা আরও বেড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেকেই দেশে এসব বিনিয়োগের তথ্য গোপন রেখেছেন। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও দুবাইয়ের আবাসন খাতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাংলাদেশিদের অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় উঠে এসেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, অর্থপাচার শুধু বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করে না, এটি রাষ্ট্রের রাজস্ব ব্যবস্থা, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং আর্থিক স্বচ্ছতার ওপরও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই বিদেশে অর্জিত সম্পদের প্রকৃত উৎস ও বৈধতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় আর্থিক শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর যদি দুদকের পরিকল্পিত বিদেশ সফর বাস্তবায়িত হয়, তাহলে বহুদিন ধরে আলোচনায় থাকা এই অর্থপাচার অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের আশা।

