বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো হলে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি ফিরতে পারে, তবে এর ফলে মূল্যস্ফীতি বা সুদের হারে উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা কম—এমনই ইঙ্গিত দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি নতুন বিশ্লেষণ। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্য সামনে রেখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার ঋণ সহায়তা কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন এই গবেষণাকে নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদের ইউনিটের যুগ্ম পরিচালক ড. সাইদুল ইসলামের প্রস্তুত করা গবেষণাপত্রে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের ওপর অতিরিক্ত ঋণপ্রবাহের সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় মতামত দিয়েছেন গবেষণা বিভাগের পরিচালক ড. সালিম আল মামুন। এতে বলা হয়েছে, সাময়িকভাবে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো গেলে উৎপাদন বৃদ্ধি, ব্যবসায়িক কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং অর্থনীতিতে চাহিদা সৃষ্টিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
গবেষণাটি এমন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে, যখন গত কয়েক অর্থবছর ধরে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমেছে এবং একই সঙ্গে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধিতেও ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, প্রথমেই নির্ধারণ করা জরুরি যে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার মূল কারণ কী। যদি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়ে থাকে, তাহলে শুধু ব্যাংকগুলোকে বেশি ঋণ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল মিলবে না। আবার যদি ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে ঋণ বিতরণ কমে থাকে, তাহলে সেই সমস্যার সমাধান করাই হবে প্রধান অগ্রাধিকার।
এই বিশ্লেষণে ২০১৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিক থেকে ২০২৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিক পর্যন্ত ত্রৈমাসিক তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। উৎপাদন প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, অর্থবাজারের সুদের হার, ঋণের সুদের হার এবং বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবৃদ্ধির মধ্যে সম্পর্ক মূল্যায়নের মাধ্যমে সম্ভাব্য প্রভাব নির্ণয় করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকার ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার ঋণ সহায়তা কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে, তারও পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, এই সহায়তার পরিমাণ বর্তমানে বিদ্যমান বেসরকারি খাতের মোট ঋণের প্রায় ৩ দশমিক ১৫ শতাংশের সমান।
গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, অতিরিক্ত ঋণপ্রবাহের কারণে উৎপাদন প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাসের স্বাভাবিক গতিপথের তুলনায় দীর্ঘ সময় ধরে বেশি থাকতে পারে। অর্থাৎ শিল্প ও উৎপাদনমুখী খাতে নতুন বিনিয়োগ এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উৎপাদন বৃদ্ধির সুযোগও তৈরি হতে পারে।
মূল্যস্ফীতির বিষয়ে গবেষণার পর্যবেক্ষণ তুলনামূলকভাবে আশাব্যঞ্জক। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই ঋণ সম্প্রসারণ মূল্যস্ফীতিতে অতিরিক্ত বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে না। পূর্বাভাস অনুযায়ী মূল্যস্ফীতির গতিপথ প্রায় আগের অবস্থানেই থাকবে। একইভাবে অর্থবাজারের সুদের হার এবং ঋণের সুদের হারেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখা যায়নি। ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনতে ঋণ সহায়তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারলেও আর্থিক বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা সীমিত।
তবে গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, যদি ব্যবসায়ীরা অনিশ্চয়তার কারণে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী না হন, তাহলে শুধু ঋণের জোগান বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক গতি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। অর্থাৎ ঋণ সহায়তার পাশাপাশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, নীতিগত স্থিতিশীলতা, ব্যাংকিং খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং উদ্যোক্তাদের আস্থা পুনরুদ্ধার সমানভাবে প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণ ইঙ্গিত দিচ্ছে, পরিকল্পিত ও সীমিত সময়ের জন্য বেসরকারি খাতে ঋণ সহায়তা বাড়ানো হলে দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে এই উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে ঋণ যথাযথ খাতে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, বিনিয়োগকারীরা নতুন উদ্যোগে কতটা আগ্রহ দেখাচ্ছেন এবং অর্থনীতির সামগ্রিক পরিবেশ কতটা স্থিতিশীল থাকে—এসব বিষয়ের ওপর।

