চলমান গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে দেশের শিল্পকারখানা। গ্যাসের অভাবে অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, কোথাও কমেছে উৎপাদনের সময়, আবার কোথাও পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হচ্ছে যন্ত্রপাতি। এমন পরিস্থিতিতে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে একসঙ্গে কয়েকটি বিকল্প পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
এর মধ্যে রয়েছে সিএনজি স্টেশনে গ্যাস সরবরাহ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমিত করা, বকেয়া পরিশোধ করে তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে আবার পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো এবং ভোলার গ্যাস বেসরকারি উদ্যোগে সিলিন্ডারে করে ঢাকায় এনে শিল্পকারখানায় ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা।
জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তা ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সাম্প্রতিক কয়েকটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী প্রায় প্রতিদিনই পর্যালোচনা করছেন এবং সংকট সামাল দিতে বিকল্প উৎস ব্যবহারের বিষয়ে সরাসরি নির্দেশনা দিচ্ছেন।
জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব ও মুখপাত্র মনির চৌধুরী জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দেশে গ্যাস সরবরাহ নেমে গিয়েছিল দৈনিক ২ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুটে। মঙ্গলবার তা কিছুটা বেড়ে ২ হাজার ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে। এই গ্যাসের মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট ব্যবহার করছে। নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহার করছে আরও প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বাকি গ্যাস ভাগ হয়ে যাচ্ছে শিল্প, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক গ্রাহকদের মধ্যে।
ফলে শিল্পকারখানার জন্য বাড়তি গ্যাস বের করতে হলে অন্য খাতের ব্যবহার কমানো ছাড়া আপাতত সহজ কোনো পথ নেই। সরকারের পরিকল্পনায় সিএনজি খাত থেকে গ্যাসের একটি অংশ সরিয়ে শিল্পে দেওয়ার বিষয়টি তাই গুরুত্ব পেয়েছে।
সিএনজি স্টেশনগুলোতে সরবরাহ করা গ্যাস নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমিত করার একটি প্রস্তাব এখন পর্যালোচনা করছে জ্বালানি বিভাগ। অর্থাৎ সারা দিন নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্যাস না দিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সরবরাহ চালু রাখা হতে পারে। ওই সময়সূচির বাইরে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে বা বন্ধ রেখে শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর চিন্তা করা হচ্ছে।
তবে এই সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়ন করা হয়নি। সিএনজি স্টেশনে সরবরাহ কমানো বা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্ধ রাখলে পরিবহন খাতে কী ধরনের প্রভাব পড়বে, সেটিও বিবেচনা করছে সরকার। কারণ পরিবহন খাতে গ্যাসের ব্যবহার কমালে একদিকে শিল্পে গ্যাস বাড়ানো সম্ভব হবে, অন্যদিকে গণপরিবহন ও ব্যক্তিগত যানবাহনের জ্বালানি ব্যবস্থায় নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
গ্যাস সংকট মোকাবিলায় সরকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ভোলার গ্যাসকে কাজে লাগানো। বেসরকারি উদ্যোক্তারা চাইলে ভোলার গ্যাসক্ষেত্র থেকে উত্তোলিত গ্যাস সিলিন্ডারে রূপান্তর করে ট্রাকে করে ঢাকাসহ শিল্পাঞ্চলে নিয়ে যেতে পারবেন। এ জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
১ আগস্ট বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকের আলোচ্য নথিতে বিষয়টি উঠে এসেছে। ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে গ্যাসের ঘাটতি কমাতে সিএনজি স্টেশন থেকে গ্যাস সরবরাহের সময় নির্ধারণ এবং ভোলার গ্যাস পরিবহনের অনুমতি দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছিল।
জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে আনার জন্য পাইপলাইন স্থাপনের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। এই পাইপলাইন নির্মাণে আনুমানিক ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে এবং এটি নির্মাণে প্রায় দুই বছর সময় লাগবে।
কিন্তু পাইপলাইন নির্মাণ শেষ হতে সময় লাগায় শিল্পে দ্রুত গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর জন্য ট্রাকে করে গ্যাস পরিবহনের সুযোগটি খোলা রাখা হচ্ছে। এতে অবকাঠামো নির্মাণের জন্য দুই বছর অপেক্ষা না করেই ভোলার গ্যাসের একটি অংশ শিল্পে ব্যবহারের সম্ভাবনা তৈরি হবে।
তবে এখন পর্যন্ত কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ভোলার গ্যাসকে সিএনজিতে রূপান্তর করে ট্রাকে পরিবহনের জন্য আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেয়নি। ব্যবসায়ীদের মতে, বিষয়টি নতুন নয়। আগের আওয়ামী লীগ সরকার ও পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও এ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু তখন ব্যবসায়ীরা এটিকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক মনে না করায় আগ্রহ দেখাননি।
শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর সবচেয়ে বড় সুযোগ অবশ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের খাতেই দেখছে সরকার। বর্তমানে গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বিপুল পরিমাণ গ্যাস ব্যবহার করছে। সেই গ্যাসের একটি অংশ যদি তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র ব্যবহার করে, তাহলে শিল্পকারখানার জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাস ছাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এই লক্ষ্যেই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে সর্বোচ্চ সক্ষমতায় চালানোর পাশাপাশি ফার্নেস তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে সরকারের ভর্তুকির ব্যয় বাড়বে, কিন্তু বিনিময়ে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে বলে মনে করছে সরকার।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান এর আগে সরকারের কাছে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, গ্যাসচালিত কেন্দ্রের পরিবর্তে তেলচালিত কেন্দ্র থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হোক। এতে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সাশ্রয় হবে এবং সেই গ্যাস শিল্পকারখানায় দেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।
তবে তেলচালিত কেন্দ্রগুলোকে আবার সচল করতে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারের বকেয়া। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে সরকারের মোট বকেয়া প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা পরিশোধের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বেসরকারি ফার্নেস তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া বিল পরিশোধের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
দেশের ফার্নেস তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সম্মিলিত দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৬ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু বর্তমানে এসব কেন্দ্র থেকে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট। অর্থাৎ বিপুল সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কেন্দ্রগুলো পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ স্বতন্ত্র বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী সমিতির সভাপতি ডেভিড হাসনাতের মতে, সরকারের কাছে বিল বকেয়া থাকায় অধিকাংশ তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র গত ৬ থেকে ৭ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। কেন্দ্রগুলোর মালিকদের ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ এবং অন্যান্য খরচ চালাতে নিজেদের ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ ধার করতে হচ্ছে।
তার প্রস্তাব হলো, সরকার বকেয়া বিলের একটি বড় অংশ পরিশোধ করুক এবং একই সঙ্গে ৪৫ দিনের সমপরিমাণ বকেয়া রেখে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু করার ব্যবস্থা করা হোক। এতে কেন্দ্রগুলো ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করতে পারবে, নতুন করে ফার্নেস তেল আমদানি করতে পারবে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন আবার বাড়াতে পারবে।
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে অতিরিক্ত প্রায় ২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হতে পারে। আর এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রতিদিন সাশ্রয় করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা।
শিল্পকারখানায় সেই গ্যাস সরবরাহ করা গেলে বর্তমান সংকট অনেকটাই কমতে পারে। বিশেষ করে গ্যাসনির্ভর পোশাক, বস্ত্র, সিরামিক, ইস্পাত, কাচ ও অন্যান্য শিল্পে উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
তবে সরকারের এই পরিকল্পনার সামনে বেশ কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে। সিএনজি খাতে সরবরাহ কমালে পরিবহন ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে। আবার তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র চালালে গ্যাসের ব্যবহার কমলেও জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়বে। একই সঙ্গে সরকারকে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পুরোনো বকেয়া পরিশোধের জন্য বিপুল অর্থের সংস্থান করতে হবে।
অন্যদিকে ভোলার গ্যাস দ্রুত শিল্পে পৌঁছানোর পরিকল্পনাটিও নির্ভর করছে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের আগ্রহের ওপর। অতীতে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক না হওয়ায় উদ্যোক্তারা পিছিয়ে গেলেও বর্তমান গ্যাস সংকটের কারণে পরিস্থিতি কিছুটা বদলাতে পারে।
সব মিলিয়ে সরকারের বর্তমান কৌশলটি মূলত নতুন গ্যাস উৎপাদনের চেয়ে বিদ্যমান গ্যাসকে কোথায় ব্যবহার করা হবে, সেই অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাসের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। পরিবহন খাত থেকে কিছু গ্যাস সরিয়ে শিল্পে দেওয়া, বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের পরিবর্তে তেল ব্যবহার করা এবং ভোলার গ্যাস দ্রুত শিল্পাঞ্চলে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদে সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে, সেটি নির্ভর করবে নতুন গ্যাস অনুসন্ধান, জাতীয় গ্রিডের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের ওপর। কারণ সিএনজি সরবরাহ কমানো কিংবা তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করা মূল সংকটের স্থায়ী সমাধান নয়। এগুলো মূলত সীমিত গ্যাসকে এক খাত থেকে অন্য খাতে সরিয়ে নেওয়ার উপায়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তাই শুধু শিল্পে কিছুটা বাড়তি গ্যাস পৌঁছে দেওয়া নয়; বরং এমন একটি জ্বালানি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে শিল্প, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও আবাসিক খাতের চাহিদার মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ভারসাম্য তৈরি করা যায়। শিল্প উৎপাদন সচল রাখতে জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন, কিন্তু সেই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তার স্থায়ী ভিত্তি তৈরি না হলে একই ধরনের সংকট আবারও ফিরে আসার আশঙ্কা থেকেই যাবে।

