রাজনৈতিক অস্থিরতা, শ্রম অসন্তোষ, জ্বালানি সংকট এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্নে টানা দুই বছর ধরে চাপে থাকা দেশের পোশাক ও বস্ত্রশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঋণ কর্মসূচির আওতায় সহায়তা পাওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে মোট ৩৭০টি বন্ধ ও আর্থিক সংকটে থাকা কারখানার তালিকা জমা দিয়েছে দেশের তিনটি শীর্ষ শিল্প সংগঠন।
জানা গেছে, তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সংগঠন ১৪০টি পোশাক কারখানার নাম সুপারিশ করেছে। বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন ১৩০টি সুতা, বয়ন, রং, ফিনিশিং ও ছাপাখানা-সংক্রান্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের তালিকা দিয়েছে। অন্যদিকে নিট পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন আরও ১০০টি কারখানার নাম অন্তর্ভুক্ত করেছে। সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তারা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে প্রায় ৭০০টি পোশাক ও বস্ত্র কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে অথবা গুরুতর আর্থিক সংকটে পড়েছে। নতুন করে সুপারিশ করা ৩৭০টি কারখানা সেই ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের অর্ধেকেরও বেশি। এসব কারখানা দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকা, আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়া, ঋণ পুনঃতফসিলের প্রয়োজনীয়তা এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমে স্থবিরতার মতো বিভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে নির্বাচন করা হয়েছে।
শিল্প সংগঠনগুলোর দাবি, তালিকা তৈরির আগে স্বাধীনভাবে যাচাইয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে যাতে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোই এই তহবিলের আওতায় আসতে পারে। তাদের মতে, যাচাই-বাছাই ছাড়া তহবিল বিতরণ করা হলে প্রকৃত উদ্যোক্তারা বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকি থাকত।
পোশাক ও বস্ত্র খাতের সংকটের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় এবং পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রম অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও ভালুকার মতো শিল্পাঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দেশের মোট পোশাক ও বস্ত্র কারখানার ৬০ শতাংশেরও বেশি এসব এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।
শিল্প মালিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সেই সময়ে কয়েকটি কারখানা এবং চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্দেশ্যে যাওয়া পণ্যবাহী ট্রাকেও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এতে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। সময়মতো চালান পাঠাতে না পারায় অনেক রপ্তানিকারককে মূল্যছাড় দিতে হয়েছে, ব্যয়বহুল আকাশপথে পণ্য পাঠাতে হয়েছে, এমনকি কিছু রপ্তানি আদেশও বাতিল হয়েছে। এসব ক্ষতি থেকে অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।
এর পাশাপাশি দীর্ঘদিনের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট শিল্প উৎপাদনে নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে। উদ্যোক্তাদের মতে, প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ না থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে রাশিয়া ও ইরানকে ঘিরে বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থাকেও দুর্বল করেছে, যার প্রভাব বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পে স্পষ্টভাবে পড়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে গত ২৩ মে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা ঋণ কর্মসূচি ঘোষণা করে। এর উদ্দেশ্য হলো সংকটে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া, নতুন বিনিয়োগে উৎসাহ সৃষ্টি করা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে গতি আনা।
এই তহবিলের মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত তারল্য থাকা ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে অন্তত তিন বছরের আমানতের ভিত্তিতে ১০ শতাংশ সুদে সংগ্রহ করা হবে। বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে সরকারী নিশ্চয়তার আওতায় প্রদান করা হবে।
পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচির আওতায় বন্ধ কারখানার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য রাখা হয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা। ক্ষুদ্র, কুটির, অতি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য বরাদ্দ ৫ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং উত্তরাঞ্চলের কৃষিভিত্তিক শিল্প উন্নয়নের জন্য পৃথকভাবে ৩ হাজার কোটি টাকা করে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
শিল্প সংগঠনগুলোর প্রত্যয়ন পাওয়া কারখানাগুলো তাদের ঋণদাতা ব্যাংকের মাধ্যমে আবেদন করতে পারবে। পরে ব্যাংকগুলো প্রয়োজনীয় যাচাই শেষে আবেদন বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠাবে।
তবে উদ্যোক্তাদের মতে, এই তহবিল কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বিশেষ করে খেলাপি ঋণসংক্রান্ত কঠোর শর্তের কারণে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত কারখানা এই সুবিধা থেকে বাদ পড়ে যেতে পারে। যেসব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন আর্থিক সংকটে রয়েছে, তাদের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যেই ঋণখেলাপির তালিকায় চলে গেছে। ফলে সবচেয়ে বেশি সহায়তার প্রয়োজন যাদের, তারাই হয়তো ঋণ পাওয়ার সুযোগ হারাতে পারে।
বস্ত্রশিল্প উদ্যোক্তারা আরও মনে করছেন, শুধু আর্থিক সহায়তা দিয়ে শিল্পকে টেকসইভাবে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে না। পর্যাপ্ত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত না হলে উৎপাদন স্বাভাবিক করা কঠিন হবে। অন্যদিকে নিট পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের মতে, এই তহবিল বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোর জন্য স্বস্তি বয়ে আনতে পারে। এর মাধ্যমে অনেক প্রতিষ্ঠান বকেয়া ব্যাংক ঋণ পরিশোধের সুযোগ পাবে এবং ধীরে ধীরে উৎপাদন কার্যক্রমে ফিরতে পারবে।
সব মিলিয়ে ৬০ হাজার কোটি টাকার এই প্রণোদনা কর্মসূচি দেশের রপ্তানিমুখী শিল্প খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এই উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে অর্থায়নের পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহ, নীতিগত স্থিতিশীলতা, ব্যাংকিং খাতের সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখার সক্ষমতার ওপর। এসব বিষয় একসঙ্গে সমাধান করা গেলে দেশের পোশাক ও বস্ত্রশিল্প আবারও প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে পারে।

